বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের ২৯ শতাংশ বেকার, যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পান না অর্ধেক

বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের ২৯ শতাংশ বেকার, যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পান না অর্ধেক
রিজিওনাল ইকোনমিক আউটলুক: এশিয়া অ্যান্ড প্যাসিফিক’

বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের একটি বড় অংশ কর্মসংস্থানের বাইরে রয়েছেন। উচ্চশিক্ষিত তরুণদের প্রায় ২৯ শতাংশ বেকার। অন্যদিকে, উচ্চশিক্ষিত কর্মীদের প্রায় অর্ধেক এমন পেশায় কাজ করছেন, যেখানে তাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অর্জিত দক্ষতা যথাযথভাবে কাজে লাগছে না। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ‘রিজিওনাল ইকোনমিক আউটলুক: এশিয়া অ্যান্ড প্যাসিফিক’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের এই চিত্র উঠে এসেছে।

গত বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) প্রকাশিত প্রতিবেদনটিতে ২ অক্টোবর পর্যন্ত পাওয়া তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। এতে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থানের সংকট, দক্ষতার ঘাটতি এবং শ্রমবাজারের কাঠামোগত সমস্যাগুলো তুলে ধরা হয়েছে।

দক্ষতার সঙ্গে চাকরির চাহিদার অমিল

আইএমএফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য স্নাতক হওয়া তরুণদের চাকরির বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে অন্যতম বড় বাধা হলো চাকরিপ্রার্থীদের দক্ষতা ও নিয়োগদাতাদের চাহিদার মধ্যে অসামঞ্জস্য। অনেক শিক্ষার্থীর প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক ও পেশাগত দক্ষতা না থাকায় চাকরি পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। আবার অনেকে কর্মসংস্থানের সুযোগ পেলেও নিজেদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও দক্ষতার তুলনায় নিম্নমানের বা কম দক্ষতানির্ভর কাজে যুক্ত হচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের চাহিদার সমন্বয়ের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। শ্রমবাজারের উপযোগী শিক্ষা, হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়ানো না গেলে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থানের সংকট আরও জটিল হতে পারে।

অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানও বড় চ্যালেঞ্জ

এশিয়ার বহু দেশে কৃষি ও অন্যান্য অনানুষ্ঠানিক খাতে বিপুলসংখ্যক মানুষ কাজ করেন। এসব ক্ষেত্রে অনেক সময় নিয়মিত চাকরির নিশ্চয়তা, আনুষ্ঠানিক নিয়োগচুক্তি, সামাজিক সুরক্ষা এবং পেশাগত উন্নতির সুযোগ সীমিত থাকে।

এ কারণে শুধু বেকারত্বের হার দিয়ে শ্রমবাজারের প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণ করা যায় না বলে প্রতিবেদনে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কর্মরত মানুষের কতজন তাঁদের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ করছেন, কর্মসংস্থানের মান কেমন এবং পেশাগত উন্নতির সুযোগ কতটা রয়েছে—এসব বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

বাড়তে থাকা কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের জন্য সুযোগ

আগামী বছরগুলোতে বাংলাদেশে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা আরও বাড়বে। এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানে যুক্ত করা গেলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এ জন্য উৎপাদন ও সেবা খাতে মানসম্মত কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থাকে শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার প্রয়োজন রয়েছে। কারিগরি ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, পেশাগত প্রশিক্ষণ এবং বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে, শিক্ষিত তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত ও উপযুক্ত কর্মসংস্থান তৈরি করা না গেলে বেকারত্ব ও হতাশা বাড়তে পারে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে উৎপাদনশীলতা, আয় বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর।

চাকরির বাজারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দ্রুত বিস্তার এশিয়ার শ্রমবাজারে নতুন পরিবর্তন আনছে। আইএমএফের প্রতিবেদনে এশিয়ার ১৯টি অর্থনীতির প্রায় চার কোটি অনলাইন চাকরির বিজ্ঞাপন বিশ্লেষণ করে দেখা হয়েছে, এআইয়ের প্রভাব বেশি এমন পেশায় কর্মীর চাহিদা তুলনামূলকভাবে প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে এআই-সম্পর্কিত দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীদের চাহিদা বেড়েছে।

এই প্রবণতা নির্দেশ করছে, প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। যেসব কাজে প্রচলিত পদ্ধতির পরিবর্তে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ বেশি, সেসব পেশায় কর্মসংস্থানের ধরন ও প্রয়োজনীয় যোগ্যতা বদলে যেতে পারে।

আইএমএফের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বর্তমানে এআইয়ের প্রভাব তুলনামূলক কম এমন অর্থনীতিগুলোকেও ভবিষ্যতে এই পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। উৎপাদন ও সেবা খাতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হলেও সেসব কাজের অনেকগুলোই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রভাবে পরিবর্তিত হতে পারে।

বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৩.২ শতাংশ

শ্রমবাজারের চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়েও সতর্ক পূর্বাভাস দিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৩ দশমিক ২ শতাংশ।

অন্যদিকে, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়ানো হয়েছে। প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুবিধা পাওয়া দেশগুলোর প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী হলেও নিম্ন আয়ের অর্থনীতিগুলো উচ্চ জ্বালানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলা করছে।

সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের জন্য উচ্চশিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা, শিক্ষার সঙ্গে চাকরির বাজারের চাহিদার সমন্বয় ঘটানো এবং প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দেশের বাড়তে থাকা কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত করতে পারলে তা অর্থনীতির জন্য বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
সংবাদ প্রতিনিধি

নিজস্ব প্রতিবেদক

এই সংবাদটি The News-এর সংবাদ প্রতিনিধি পাঠিয়েছেন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।