‘আজাদী না গোলামী’ থেকে ‘ইনকিলাব জিন্দালাশ’: দুই বছরে প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার হিসাব কোথায়?

‘আজাদী না গোলামী’ থেকে ‘ইনকিলাব জিন্দালাশ’: দুই বছরে প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার হিসাব কোথায়?
আজাদী না গোলামী’ থেকে ‘ইনকিলাব জিন্দালাশ

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ‘আজাদী না গোলামী’, ‘দিল্লি না ঢাকা’ এবং ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ স্লোগান ঘিরে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। ভারতবিরোধী অবস্থান, পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের নেতৃত্ব এবং অর্থনৈতিক মুক্তির নানা প্রতিশ্রুতি তখন আলোচনার কেন্দ্রে ছিল।

কিন্তু রাজনৈতিক পরিবর্তনের দুই বছরের বেশি সময় পর প্রশ্ন উঠছে—সেই প্রতিশ্রুতিগুলোর কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে? যে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, তার সুফল সাধারণ মানুষ কতটা পেয়েছে? আর যে রাজনৈতিক শক্তিগুলো ভারতীয় আধিপত্যের বিরোধিতা করে রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করেছিল, রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবতায় তাদের পররাষ্ট্রনীতি কতটা বদলেছে?

‘দিল্লি না ঢাকা’ স্লোগান, কিন্তু পররাষ্ট্রনীতির বাস্তবতা কী?

২০২৪ সালের আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে একটি রাজনৈতিক বক্তব্য বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে—বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে ঢাকায়, দিল্লিতে নয়। দেশের সার্বভৌমত্ব, সীমান্ত নিরাপত্তা, পানির ন্যায্য হিস্যা এবং বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষার দাবিতে ভারতবিরোধী বক্তব্যও জোরালো হয়।

আন্দোলনের সময় অনেকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর ভারতের সঙ্গে অসম চুক্তি বাতিল করা হবে। তিস্তার পানিবণ্টন সমস্যার সমাধান, সীমান্ত হত্যা বন্ধ এবং বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নতুন পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করা হবে।

কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক কোনো স্লোগানের বিষয় নয়। এখানে প্রয়োজন শক্তিশালী কূটনীতি, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে দর-কষাকষি।

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে হত্যাকাণ্ড এখনো উদ্বেগজনক। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য উদ্ধৃত করে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ২০২৫ সালে বিএসএফের গুলিতে ও নির্যাতনে ৩৪ বাংলাদেশি নিহত হন। ২০২৬ সালেও সীমান্তে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।

তাহলে সীমান্ত হত্যা বন্ধের প্রতিশ্রুতির অগ্রগতি কোথায়? শুধু রাজনৈতিক বক্তৃতা নয়, প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় কার্যকর কূটনৈতিক প্রতিবাদ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।

আরাকান, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও আঞ্চলিক নেতৃত্বের স্বপ্ন

একসময় রাজনৈতিক বক্তব্যে আরাকানের রোহিঙ্গাদের জন্য স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং বাংলাদেশের নেতৃত্বে আঞ্চলিক ভূরাজনীতির নতুন অধ্যায় রচনার কথাও বলা হয়েছিল।

কেউ কেউ এমন প্রত্যাশাও তৈরি করেছিলেন, বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটলে রোহিঙ্গারা দ্রুত নিজেদের মাতৃভূমিতে ফিরে যেতে পারবেন।

কিন্তু রোহিঙ্গা সংকট এখনো বাংলাদেশের জন্য বড় মানবিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জ। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সংঘাত, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা এবং সীমান্তের অস্থিতিশীলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ঝুঁকিও দূর হয়নি। সীমান্তে জেলে ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।

স্বাধীন আরাকান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মতো বিষয় বাংলাদেশের একক সিদ্ধান্তে সম্ভব নয়। এর জন্য আন্তর্জাতিক কূটনীতি, আঞ্চলিক ঐকমত্য এবং সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর মতামত প্রয়োজন। কিন্তু রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য কার্যকর অগ্রগতি কতটুকু হয়েছে, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।

পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, কিন্তু ইতিহাসের দায় কি শেষ হয়েছে?

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ক নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়। দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ, বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক বাড়ানোর উদ্যোগ দেখা যায়।

কিন্তু ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কি এত সহজে ভুলে যাওয়ার বিষয়?

পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর গণহত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ ও ধ্বংসযজ্ঞের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছে। সেই ইতিহাসের দায় এখনো অমীমাংসিত।

পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু সম্পর্ক উন্নয়নের আগে ১৯৭১ সালের গণহত্যার জন্য আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনা, সম্পদের হিস্যা এবং অন্যান্য অমীমাংসিত বিষয় নিয়ে পাকিস্তানের দায়িত্বশীল অবস্থান প্রত্যাশিত।

অন্যদিকে পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্র, সামরিক শক্তি কিংবা ভূরাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের বিকল্প হিসেবে তুলে ধরার কোনো যৌক্তিকতা নেই।

বাংলাদেশের উন্নয়নের মডেল হওয়া উচিত শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, শিল্পায়ন, দক্ষ মানবসম্পদ এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান।

২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচারের অভিযোগ, রিজার্ভের বাস্তবতা কী?

রাজনৈতিক পরিবর্তনের আগে-পরে শেখ হাসিনার শাসনামলে বিপুল অর্থ পাচারের অভিযোগ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচারের মতো অঙ্কও রাজনৈতিক বক্তব্যে উঠে এসেছে। তবে এই পরিমাণকে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত অর্থ পাচার হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক নয়।

একইভাবে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর রাষ্ট্রীয় রিজার্ভে বিপুল অর্থ জমা হওয়ার প্রত্যাশাও তৈরি হয়েছিল।

কিন্তু অর্থনীতির বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, আমদানি ব্যয়, রপ্তানি আয়, প্রবাসী আয়, বৈদেশিক ঋণ এবং ঋণ পরিশোধের হিসাব আলাদা করে দেখতে হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল প্রায় ৩৬.০১ বিলিয়ন ডলার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের BPM6 পদ্ধতিতে একই সময়ে রিজার্ভ ছিল প্রায় ৩১.২০ বিলিয়ন ডলার।

অর্থাৎ রিজার্ভের উন্নতি বা অবনতি নিয়ে রাজনৈতিক প্রচারণার পরিবর্তে নির্দিষ্ট পদ্ধতি ও সময়ের তথ্য দিয়ে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

অন্যদিকে বিশ্বব্যাংকের ৬ অক্টোবর ২০২৬ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি ৩.৪ শতাংশ হতে পারে বলে সংস্থাটি পূর্বাভাস দিয়েছে। বিনিয়োগে দুর্বলতা, জ্বালানি খাতের সমস্যা, আর্থিক খাতের দুর্বলতা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এগুলো নিঃসন্দেহে সরকারের জন্য বড় সতর্কবার্তা।

রপ্তানি ও বিনিয়োগ: অর্থনীতির প্রকৃত চিত্র কী বলছে?

বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে হতাশা প্রকাশের যথেষ্ট কারণ থাকলেও সব সূচককে একইভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি আয় ছিল প্রায় ৪৮.২৮ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে প্রায় ৪৮.০০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ রপ্তানিতে বড় ধরনের অগ্রগতি হয়নি; বরং সামান্য পতন ঘটেছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে নিট সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআই ২০২৪ সালের তুলনায় ৩৯.৩৬ শতাংশ বেড়ে ১.৭৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।

তাই বিনিয়োগ ৬২ শতাংশ কমে গেছে—এমন দাবি সামগ্রিক বার্ষিক নিট এফডিআইয়ের তথ্যের সঙ্গে মেলে না।

তবে বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে বিনিয়োগ পরিবেশ, ব্যবসায়িক আস্থা, জ্বালানি সরবরাহ এবং আর্থিক খাতের দুর্বলতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, বিনিয়োগ বাড়াতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে? নতুন শিল্পকারখানা, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণে কী অগ্রগতি হয়েছে?

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি: জাতীয় স্বার্থের হিসাব কোথায়?

ভারতের সঙ্গে অসম চুক্তি বাতিল এবং বিদেশি আধিপত্যের বিরুদ্ধে অবস্থানের কথা বলা হলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কেও নতুন সমঝোতা হয়েছে।

২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শিল্প ও কৃষিপণ্যকে বাংলাদেশের বাজারে অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কহার ১৯ শতাংশ নির্ধারণ এবং নির্দিষ্ট শর্তে কিছু পোশাক ও বস্ত্রপণ্যে শূন্য শুল্কের সুযোগ তৈরির কথা বলা হয়েছে।

এখানে প্রশ্ন হচ্ছে, চুক্তিটি বাংলাদেশের জন্য কতটা লাভজনক? দেশীয় শিল্প, কৃষক, ব্যবসায়ী এবং রপ্তানিকারকদের স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত হয়েছে?

বিদেশি বিনিয়োগ বা বাণিজ্য চুক্তি নিজেই কোনো গোলামির প্রমাণ নয়। তবে চুক্তির শর্ত, পারস্পরিক সুবিধা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রভাব জনগণের সামনে স্বচ্ছভাবে তুলে ধরা সরকারের দায়িত্ব।

তিস্তা ও গঙ্গার পানি: প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবতার ব্যবধান

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষের জন্য তিস্তার পানিবণ্টন একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা। একইভাবে ১৯৯৬ সালের গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা থাকায় নতুন চুক্তি বা নবায়ন নিয়ে আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় তিস্তা নিয়ে নতুন উদ্যোগ এবং ভারতের সঙ্গে পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু কেবল রাজনৈতিক নেতৃত্ব পরিবর্তন হলেই আন্তর্জাতিক নদীর পানিবণ্টন সমস্যার সমাধান হয় না। প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক আলোচনা, যৌথ নদী কমিশনের কার্যকর ভূমিকা, কূটনৈতিক চাপ এবং দীর্ঘমেয়াদি পানি ব্যবস্থাপনা।

বাংলাদেশের কৃষি, পরিবেশ ও খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে এই প্রশ্ন সরাসরি জড়িত।

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ক্ষমতা: বাংলাদেশের জন্য নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে এবং শুভেন্দু অধিকারী মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।

বাংলাদেশের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তন। কারণ পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক, ভাষাগত, বাণিজ্যিক ও ভৌগোলিক সম্পর্ক রয়েছে।

তবে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিবর্তনকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য যুদ্ধ বা আক্রমণের পূর্বাভাস হিসেবে দেখার কোনো ভিত্তি নেই।

বরং বাংলাদেশের উচিত ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাস্তববাদী অবস্থান নেওয়া।

সীমান্ত নিরাপত্তা, অভিবাসন, নদীর পানি, বাণিজ্য এবং সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে দায়িত্বশীল আলোচনা প্রয়োজন।

ভারত ও বাংলাদেশের সক্ষমতা: আবেগ নয়, বাস্তবতা বুঝতে হবে

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে অর্থনৈতিক, সামরিক, প্রযুক্তিগত ও মহাকাশ গবেষণার সক্ষমতায় উল্লেখযোগ্য ব্যবধান রয়েছে।

ভারত বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি। তাদের নিজস্ব মহাকাশ গবেষণা সংস্থা, পারমাণবিক সক্ষমতা, উন্নত সামরিক প্রযুক্তি, বৃহৎ শিল্পভিত্তি এবং বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার রয়েছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রধান শক্তি হলো কৃষি, তৈরি পোশাক শিল্প, প্রবাসী আয়, তরুণ জনশক্তি এবং দক্ষিণ এশিয়ায় কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান।

বাংলাদেশের পক্ষে ভারতের সঙ্গে যুদ্ধের স্বপ্ন দেখানো যেমন দায়িত্বজ্ঞানহীন, তেমনি প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে অসম সম্পর্ক মেনে নেওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়।

প্রকৃত জাতীয়তাবাদ মানে অন্য দেশ দখলের স্বপ্ন দেখা নয়; বরং নিজের দেশকে শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও প্রতিরক্ষায় শক্তিশালী করা।

সংবিধান, জাতীয় সংগীত ও জাতীয় পতাকা পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি কোথায়?

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সংবিধান সংস্কার, রাষ্ট্রীয় কাঠামো পরিবর্তন এবং জাতীয় পরিচয়ের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

কিন্তু রাষ্ট্রের সংবিধান, জাতীয় সংগীত ও পতাকা পরিবর্তনের মতো বিষয় আবেগ বা রাজনৈতিক স্লোগানের ভিত্তিতে নির্ধারিত হতে পারে না। এগুলো জনগণের মতামত, সাংবিধানিক প্রক্রিয়া এবং জাতীয় ঐকমত্যের সঙ্গে সম্পর্কিত।

রাজনৈতিক পরিবর্তনের নামে রাষ্ট্রের মৌলিক পরিচয় নিয়ে বিভাজন তৈরি না করে গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মানবাধিকার এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়বে, নাকি নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়াবে?

বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি, শিল্পায়ন, শিক্ষা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বিনিয়োগ পরিবেশ।

দেশের সার কারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও কৃষি উৎপাদন সচল রাখা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের জীবনে।

অন্যদিকে শিশুদের বিজ্ঞান, গণিত, প্রযুক্তি, ইতিহাস, ভাষা, মানবিক মূল্যবোধ এবং মুক্তচিন্তার শিক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। শুধু ধর্মীয় পরিচয় কিংবা রাজনৈতিক মতাদর্শ দিয়ে আধুনিক রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব নয়।

শেষ প্রশ্ন: আজাদী কি শুধু স্লোগান, নাকি মানুষের জীবনে পরিবর্তন?

‘আজাদী না গোলামী’ কিংবা ‘দিল্লি না ঢাকা’—যে স্লোগানই দেওয়া হোক না কেন, স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ মানুষের জীবনে তার প্রতিফলন।

স্বাধীনতা মানে শুধু একটি সরকারের বিদায় নয়। স্বাধীনতা মানে নাগরিকের নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের অধিকার, ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, কর্মসংস্থান, শিক্ষা এবং রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহি দাবি করার অধিকার।

বাংলাদেশের মানুষ পাকিস্তানের সামরিক শাসন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। তাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পাকিস্তান, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা অন্য কোনো বিদেশি শক্তির রাজনৈতিক স্বপ্নের ওপর নির্ভরশীল হতে পারে না।

যারা রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তাদের কাছে এখন জনগণের প্রশ্ন থাকা স্বাভাবিক—সীমান্ত হত্যা বন্ধে কী অর্জন হয়েছে? রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কতটা অগ্রগতি হয়েছে? বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান কতটা বেড়েছে? দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে কী সাফল্য এসেছে? পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে? আর জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে চুক্তিগুলো কতটা স্বচ্ছ?

স্লোগান দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করা যায় না। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজন যোগ্যতা, পরিকল্পনা, বিজ্ঞানমনস্কতা, অর্থনৈতিক দূরদর্শিতা এবং জনগণের কাছে জবাবদিহি।

আজ বাংলাদেশের মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আরেকটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়; প্রয়োজন একটি কার্যকর, আত্মমর্যাদাশীল, গণতান্ত্রিক, উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
সংবাদ প্রতিনিধি

নিজস্ব প্রতিবেদক

এই সংবাদটি The News-এর সংবাদ প্রতিনিধি পাঠিয়েছেন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।