আমেরিকার ইতিহাসে ভয়াবহতম সন্ত্রাসী হামলার দিন আজ

আমেরিকার ইতিহাসে ভয়াবহতম সন্ত্রাসী হামলার দিন আজ
আমেরিকার ইতিহাসে ভয়াবহতম সন্ত্রাসী হামলার দিন

আজ ১১ সেপ্টেম্বর, আমেরিকার ইতিহাসে ভয়াবহতম সন্ত্রাসী হামলার দিন। ঠিক ২৫ বছর আগে, ২০০১ সালের এই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে ঘটে যায় আধুনিক বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা। স্থানীয় সময় সকালে আল-কায়েদার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ১৯ সন্ত্রাসী চারটি বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ ছিনতাই করে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা চালায়। নিউইয়র্কের বিশ্ব বাণিজ্যকেন্দ্রের ১১০ তলা টুইন টাওয়ারে আঘাত হানার পর কিছুক্ষণের মধ্যেই ধসে পড়ে ভবন দুটি। একই হামলার অংশ হিসেবে তৃতীয় বিমানটি আঘাত করে ভার্জিনিয়ার পেন্টাগনে। চতুর্থ বিমানটি ওয়াশিংটন ডিসির দিকে যাওয়ার সময় যাত্রী ও ক্রুদের প্রতিরোধের মুখে পেনসিলভানিয়ার একটি মাঠে বিধ্বস্ত হয়।

সেই হামলায় অন্তত ২ হাজার ৯৭৭ জন নিহত হন। যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে সন্ত্রাসী হামলায় প্রাণহানির হিসাবে এটি ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা। ৯/১১-এর পর শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও রাজনীতিই বদলে যায়নি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, যুদ্ধনীতি, অভিবাসন, বিমানবন্দর নিরাপত্তা, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং মানবাধিকারের প্রশ্নেও বিশ্বজুড়ে বড় পরিবর্তন আসে।

বদলে যায় আমেরিকার নিরাপত্তা নীতি

হামলার সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ছিলেন জর্জ ডব্লিউ বুশ। হামলার পর তিনি ‘বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের’ ঘোষণা দেন। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে শুরু হওয়া এই অভিযানের লক্ষ্য ছিল সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে ব্যাপক অভিযান পরিচালনা করা। এর প্রভাব দ্রুতই যুক্তরাষ্ট্রের সীমানা ছাড়িয়ে যায়।

আরও পড়ুনঃ বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব দিবস: স্বামী বিবেকানন্দের শিকাগো ভাষণের ঐতিহাসিক বার্তা

২০০২ সালে যুক্তরাষ্ট্র সরকার হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ডিপার্টমেন্ট গঠন করে। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বয় এবং সীমান্ত নিরাপত্তাকে নতুন গুরুত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ব্যক্তি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর নজরদারি এবং আন্তর্জাতিক যাতায়াতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও কঠোর করা হয়।

আফগানিস্তানে শুরু যুদ্ধ

৯/১১ হামলার এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে, ২০০১ সালের ৭ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট তালেবান-শাসিত আফগানিস্তানে অভিযান শুরু করে। লক্ষ্য ছিল আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনসহ সংগঠনটির নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক ধ্বংস করা।

প্রায় দুই দশক ধরে চলা আফগানিস্তান যুদ্ধ শেষ হয় ২০২১ সালে। ৩০ আগস্ট ওই বছর সর্বশেষ মার্কিন সেনা আফগানিস্তান ত্যাগ করে। আপনার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানে মার্কিন বাহিনীর ২ হাজার ৩২৪ সেনা এবং ৩ হাজার ৯১৭ সামরিক ঠিকাদার নিহত হন। মিত্র বাহিনীরও ১ হাজার ১১৪ সেনা নিহত হন।

ইরাকে দ্বিতীয় বড় যুদ্ধ

৯/১১-পরবর্তী ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের’ আরেক বড় অধ্যায় ছিল ইরাক। ২০০৩ সালের মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বাহিনী ইরাকে সামরিক অভিযান শুরু করে। ইরাকের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র থাকার অভিযোগকে অভিযানের অন্যতম প্রধান যুক্তি হিসেবে সামনে আনা হয়েছিল। পরে ইরাকে সেই অস্ত্রের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভুল নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়।

২০০৩ সালে শুরু হওয়া ইরাক যুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে ২০১১ সাল পর্যন্ত চলে। আপনার সরবরাহ করা তথ্যে বলা হয়েছে, এ যুদ্ধে অন্তত ৪ হাজার ৪০০ মার্কিন ও প্রায় ১ লাখ ইরাকি প্রাণ হারান। যুদ্ধের আর্থিক ব্যয়ও ছিল বিপুল।

‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের’ মানবিক মূল্য

৯/১১-এর পর শুরু হওয়া দীর্ঘ সামরিক অভিযানের মানবিক মূল্য নিয়েও ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে। আপনার দেওয়া লেখায় বিভিন্ন সূত্রের তথ্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, আফগানিস্তান, ইরাক, পাকিস্তান ও ইয়েমেনে গত ২৫ বছরে ৪৫ লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং প্রায় ৪ কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ ও সংশ্লিষ্ট অভিযানে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৮ ট্রিলিয়ন ডলার—এমন তথ্যও সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই যুদ্ধের সমালোচকেরা অভিযোগ করেছেন, সন্ত্রাস দমনের নামে নির্বিচারে আটক, জিজ্ঞাসাবাদ, নির্যাতন এবং সন্দেহভিত্তিক হত্যাকাণ্ড আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও আইনের প্রশ্ন তুলেছে। ড্রোন হামলা এবং যুদ্ধক্ষেত্রে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানিও দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কের বিষয়।

৯/১১-এর পর বদলে যায় মুসলিমদের জীবনও

৯/১১ হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম ও দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের প্রতি সন্দেহ ও বৈষম্যের অভিযোগ ব্যাপকভাবে সামনে আসে। আপনার সরবরাহ করা প্রতিবেদনে লেখক রোজিনা আলির অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে—হামলার আগে তাকে মূলত দক্ষিণ এশীয় অভিবাসী হিসেবে দেখা হলেও হামলার পর তার মুসলিম পরিচয়ই প্রধান হয়ে ওঠে।

শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে বহু মানুষকে আটক করার অভিযোগও ওঠে। এর ফলে অনেক মুসলিম পরিবার সামাজিক, পারিবারিক ও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ৯/১১-এর পর যুক্তরাষ্ট্রে যে নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তা একদিকে সন্ত্রাস প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ হলেও অন্যদিকে নাগরিক অধিকার ও ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসে।

২৫ বছর পরও বিতর্কের কেন্দ্রে ৯/১১

৯/১১ হামলার এক-চতুর্থাংশ শতাব্দী পরও এর রাজনৈতিক ও সামাজিক অভিঘাত শেষ হয়নি। বিমানবন্দর থেকে আন্তর্জাতিক সীমান্ত, সরকারি স্থাপনা থেকে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো—বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সন্ত্রাসী হামলা ঠেকাতে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখনো বহাল।

এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে আফগানিস্তান ও ইরাকের যুদ্ধ শেষ হয়েছে, কিন্তু ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ ধারণাটি আন্তর্জাতিক রাজনীতি থেকে পুরোপুরি বিদায় নেয়নি। বরং সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা এবং নাগরিক স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা করা হবে—সেই প্রশ্ন এখনো গুরুত্বপূর্ণ।

জোহরান মামদানি ও নতুন বিতর্ক

৯/১১-এর ২৫ বছর পূর্তির প্রাক্কালে নিউইয়র্কের নবনির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানির স্মরণ অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া নিয়েও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। হামলার সময় তার বয়স ছিল মাত্র ৯ বছর।

আপনার সরবরাহ করা তথ্য অনুযায়ী, মামদানি ৯/১১ হামলায় নিহতদের পাশাপাশি পরবর্তী যুদ্ধগুলোতে নিহত মানুষদেরও স্মরণ করার কথা বলেছেন। এ অবস্থানকে কেউ মানবিক ও যুদ্ধবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ কেউ মনে করছেন এতে ৯/১১-এর সন্ত্রাসী হামলার দায় যথেষ্ট স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়নি।

তবে মামদানি ১১ সেপ্টেম্বরকে ‘স্মরণ ও প্রার্থনা’ দিবস হিসেবে পালনের উদ্যোগ নিয়েছেন। নিহতদের স্মরণের পাশাপাশি উদ্ধারকারী ও জরুরি সেবাকর্মীদের সম্মান এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর প্রতি সহমর্মিতা জানানোর উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

ইতিহাসের এক বিভীষিকাময় দিন

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সকালটি কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস বদলে দিয়েছিল। কিন্তু এর অভিঘাত শুধু আমেরিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। পরবর্তী ২৫ বছরে যুদ্ধ, নিরাপত্তা, অভিবাসন, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির যে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, তার অন্যতম প্রধান সূচনাবিন্দু হয়ে আছে ৯/১১।

আজকের দিনে তাই নিহতদের স্মরণ করার পাশাপাশি গত ২৫ বছরের যুদ্ধ, প্রাণহানি, বাস্তুচ্যুতি, নিরাপত্তা নীতি এবং মানবাধিকারের অভিজ্ঞতাও নতুন করে মূল্যায়নের দাবি রাখে। কারণ ৯/১১ শুধু একটি সন্ত্রাসী হামলার নাম নয়—এটি এমন একটি ঘটনার প্রতীক, যার অভিঘাত একবিংশ শতাব্দীর আন্তর্জাতিক রাজনীতির গতিপথই বদলে দিয়েছে।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
Brinda Chowdhury
লেখক / প্রতিবেদক

Brinda Chowdhury

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।