৩-৫ বছরে শিশুকে স্কুলে দেয়া উচিত? দিলে কি হয় আর না দিলে কি হয়?

৩-৫ বছরে শিশুকে স্কুলে দেয়া উচিত? দিলে কি হয় আর না দিলে কি হয়?

রাই- কিশোরীঃ  চার থেকে ছয় বছর বয়সের বাচ্চাদের জন্য আসলে কি স্কুল লাগে? এই স্কুল গুলোর সিলেবাসে কী থাকে ? ‘অ’আ‘ক’খ প্রত্যেকটা বর্ণ ও তা দিয়ে দুটি বা চারটি করে শব্দ লিখা। আপনি পড়াচ্ছেন অ তে অজগর, ক তে কাক। ব-তে বাঘ ইত্যাদি। ইংরেজিতে পড়াচ্ছেন A-Z একি রকম করে। অ্যাপেল,ম্যাংগো, লায়ন,জু ইত্যাদি। গল্প পড়াচ্ছেন ঘুঘু ও পিঁপড়ের বা পরী ও কাঠুরে ইত্যাদি। এসবের উদ্দেশ্য হলো বাচ্চাদেরকে কিছু শব্দ শেখানো ও রিডিং মজবুদ করা।

গল্পের মধ্য দিয়ে নৈতিকতা জাগ্রতর বিষয়টিও থাকে। কোমলমতি এই শিশুদের জন্য মাসিক ৫০০ থেকে ৫০০০ টাকা বেতন দিয়ে স্কুল গুলোতে পড়ানোর প্রয়োজনীয়তা আছে? আপনি যদি আপনার বাচ্চাকে নিয়ে চিঁড়িয়াখানায় যান তখন সে আনন্দ আর বিস্ময়ের ভেতর দিয়ে কিছু পশুর নাম শিখবে। যা সে আগে শিখেনি। শিশুকে নিয়ে পাহাড়ে ঘুরতে গেলে সে স্বচক্ষে পাহাড় দেখবে, বিস্মিত হবে, উঠতে চাইবে। সাগর পাড়ে গেলে অবাক হয়ে সাগড়ের দিকে তাকিয়ে থাকবে, সাগরের কলকল শব্দ শুনবে । ঝর্নায় গেলে আনন্দ পাবে আর পানির উৎস নিয়ে ভাববে। গ্রামে ঘুরতে নিয়ে গেলে গ্রাম্য চিত্রটা সে দেখতে পাবে। ধান কাটার দৃশ্য দেখবে, মাছ ধরার দৃশ্য দেখবে ইত্যাদি। আর এসব বিষয় গুলোই স্কুলের বইতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে তাকে পড়তে দেওয়া হয় । সত্য হলো ঘুরে ঘুরে শিশু যে অভিজ্ঞতা আর জ্ঞান অর্জন করবে তা হাজার বছর কেজি স্কুল গুলোতে পড়েও পাবে বলে অন্তত আমার মনে হয় না।

একটা শিশু ধীরে ধীরে মানুষের রুচিবোধ, মানুষের অভিপ্রায় ইত্যাদির ভেতর দিয়ে নিজেকে গড়ে তুলতে থাকে। এক থেকে তিন বছর বয়সে যখন কেউ তাকে ধমকাত তখন সে কাঁদতে শুরু করতো। এ সময় সে দুরন্ত হয়ে ওঠে। মাঝে মাঝে নিজের অতীত গল্প করতে গিয়ে বলে ওঠবে ‘আমি যখন ছোট ছিলাম’ অর্থাৎ সে এখন নিজেকে বড় ভাবতে শুরু করেছে। এ সময়টা অত্যন্ত জটিল এবং গুরুত্বপূর্ণ । বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শিশু মায়ের কাছে সামাজিকতার শিক্ষা, বাবার কাছে উদারতার শিক্ষা গ্রহণ করে। বাবা শিশুর কাছে দৃঢ়তার মূর্তপ্রতীক হয়ে ওঠে। তার বাবার নামে কেউ সমালোচনা করলে সমালোচক শিশুটিকে যতোই আদর করুক শিশু তার প্রতিবাদ করতে চেষ্টা করে। সে সময় গুলোতে শিশু ভিক্ষুক ও অসহায় মানুষের দিকে তীক্ষ্ণ নজরে তাকায়। সে প্রত্যাশা করে তার বাবা অথবা মা অসহায় মানুষটিকে কিছু সাহায্য করুক। যখন তারা অসহায় মানুষের জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় তখন শিশু তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে এবং নিজের জন্য উদারতার বীজ সংগ্রহ করে নেয়। পিতা-মাতা যদি নিজের হাতে দান না করে শিশুর হাতে করাতে পারেন তবে তা শিশুমনে সবচেয়ে বড় ধরনের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। এভাবে প্রত্যেকটি কাজ সে পর্যবেক্ষণ করে। তাই পিতা মাতা ও বড়দেরকে অবশ্যই শিশুর সামনে বেশি বেশি ইতিবাচক কাজ করতে হবে। এতে করে তার নৈতিকদিক গুলো জাগ্রত হতে থাকে। যা কখনো স্কুল থেকে পাওয়া যাবে না।

স্কুলে আমরা শিশুদের কেনো পাঠাই ? বর্তমানে কেজি,নার্সারি স্কুল গুলোর আসলে প্রয়োজনীয়তা কতোটুকু? এই দুটো প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা দরকার। প্রথম প্রশ্নের উত্তর যদি আমরা ঢালাও ভাবে দিয়ে থাকি তবে উত্তর হবে শেখার জন্য। তিন থেকে চার বছরের বাচ্চা গুলোকে কী শেখার জন্য আমরা স্কুলে পাঠাচ্ছি ? এক্ষেত্রে শিক্ষিত মা-বাবা ও অল্প শিক্ষিত বা অশিক্ষিত মা-বাবার উত্তর ভিন্ন হয়। শিক্ষিত মা বাবা বলবেন স্কুলে যাওয়া আসার একটা অভ্যেস হবে, পেন্সিল ধরতে শিখবে, একটু আধটু লিখবে। কিছু শব্দ শিখবে। সবচেয়ে বড় কথা ডিসিপ্লিন শিখবে ইত্যাদি। অশিক্ষিত বা কম শিক্ষিত মা-বাবা বলবেন কেজি নার্সারিতে পড়লে বাচ্চা গোড়া থেকে শক্ত হয়ে ওঠবে। অথবা পাশের বাসার ভাবি তার বাচ্চাকে দিয়েছেন তাই আমরাও দিলাম যেহেতু ওরা একই বয়সী। শ্রদ্ধেয় অভিভাবকরা একটু ভেবে দেখুনতো এই যে উত্তর গুলো তা কি বাসায় সমাধান করা সম্ভব নয় ? আপনি চাইলে বাচ্চাকে কোলে বসিয়ে বসিয়ে পেন্সিল ধরা,অক্ষর চেনানোর কাজটা সেরে ফেলতে পারেন।এর জন্য স্কুলের প্রয়োজন পড়ে না। তিন থেকে ছয় বছরের বাচ্চার জন্য কী কী ডিসিপ্লিন হতে পারে তা কি ভেবে দেখেছেন ? আর ঐ সকল ডিসিপ্লিন কি শিশু তার মায়ের কাছে বা বাবার কাছে শিখতে পারে না? শিশুদেরকে কেজি ও নার্সারি স্কুলে গুলোতে যে সকল উদ্দেশ্যে পাঠাচ্ছেন তা কি সে সঠিক ভাবে পাচ্ছে ? এর উত্তর অভিভাবকরাই ভালো জানেন। হয়তো বলতে পারেন পাচ্ছে।

আপনার বাচ্চা হোমওয়ার্ক কেনো করছে ? কেনো চোখে ঝিমুনি নিয়েও বই ধরে বসিয়ে রাখতে হচ্ছে ? হোমওয়ার্ক কি সে খুশীতে করছে নাকি চাপে পড়ে? ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে সে কেনো স্কুলের পড়া মুখস্ত করছে? চাপে পড়ে নাকি খুশিতে? সে যখন পড়া রেখে খেলার দিকে মনোযোগ দিতে চায় তখন কোন বিষয়টি তার স্বাধীনতা খর্ব করে? উত্তর অভিভাবকরাই দেবেন। সামাধান তাদের কাছে।  তিন চার বছরের শিশুর সাথে স্কুল, শিক্ষক, ডিসিপ্লিন ইত্যাদি শব্দ গুলো কতটুকু মানায়? মা বাবা-ই এ সময় শিশুর সবচেয়ে বড় শিক্ষক এবং সর্বোচ্চ স্কুল। এ সময় শিশু কারো কাছে নিজেকে নিরাপদ মনে করে না। মা-বাবা শিশুকে রেখে কোথাও গেলে তখন বিষয়টি স্পষ্ট বোঝে। তখন শিশু দাদা-দাদি বা অন্য কোনো নিকটাত্মীয়কেও নিরাপদ মনে করে না। অঝোরে কাঁদে । মা বাবার অবর্তমানে যেখানে দাদা-দাদিকে সে গ্রহণ করে না সেখানে তার জন্য স্কুল কতোটুকু উপযুক্ত!

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
Kishori
সংবাদ প্রতিনিধি

Kishori

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।