১১ হাজার যুদ্ধাপরাধীকে কারাগার থেকে মুক্তি দিয়েছিল জিয়াউর রহমান

বিশেষ প্রতিনিধিঃ পাকিস্তান মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত শক্তি। আর আমরা বিজয়ী জাতি। এখন তাদের পছন্দের লোকদের বিচার হচ্ছে। তাই তারা তো অনেক কিছুই বলবে এবং কাঁদবে এটি স্বাভাবিক। তবে তারা কোনো কিছু নিয়ে অযাচিত হস্তক্ষেপ করতে চাইলে আমরা কূটনৈতিকভাবে তার প্রতিবাদ জানাচ্ছি।’

আজ রোববার বিকেলে গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি একথা বলেন। প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা সফর সম্পর্কে অবহিত করতে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে তিনি জাতিসঙ্ঘ অধিবেশনে যোগদান, কানাডা সফর, দু’টি পুরস্কার গ্রহণ, ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের পুরস্কার গ্রহণ অনুষ্ঠানে অংশ নেয়া এবং বিভিন্ন সেমিনারে বক্তব্য দেয়াসহ ১৬ দিনের সফরের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। এ সময় তিনি এ সফরকে অত্যন্ত ফলপ্রসূ বলে মন্তব্য করেন।

লিখিত বক্তব্যের পর সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিয়ে পাকিস্তানের বিভিন্ন মন্তব্যের পর দেশটির সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা করা হবে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘দুটো দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকে। আবার মতভিন্নতাও থাকতে পারে। পাকিস্তান মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত শক্তি, তাই তারা তাদের পেয়ারা বান্দাদের জন্য কাঁদছে। কিন্তু আমরা তো বিচার বন্ধ করিনি। বিচার চলছে। পাকিস্তান মন্তব্য করছে, আমরা এর জবাব দিচ্ছি। দেশটির সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক চলবে আবার ঝগড়াঝাটিও চলবে।’

এ সময় তিনি বিএনপিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করে প্রায় ১১ হাজার যুদ্ধাপরাধীকে কারাগার থেকে মুক্তি দিয়েছিল। তাদের কাউকে আবার মন্ত্রীও বানায়। তার স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও যুদ্ধাপরাধীদের গাড়িতে পতাকা তুলে দেয়। দেশের ভেতরে বসে তারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধের দালালি করেছে। সে জন্য পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার আগে তাদের সাথে আপনারা সম্পর্ক রাখবেন কি না সেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’

বর্তমান পরিস্থিতিতে সার্ক থাকার দরকার আছে কি না এবং পাকিস্তানকে বাদ নিয়ে বিকল্প কিছু করার কোনো চিন্তা বাংলাদেশের আছে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমার এককভাবে বলার কিছু নেই, সেটা উচিতও হবে না। কারণ আমাদের সাথে আরো চারটি দেশ পাকিস্তানে সার্ক শীর্ষ সম্মেলন বর্জন করেছে। এ ছাড়া সার্কের চেয়ারপারসন এখন নেপাল। বাংলাদেশ চেয়ারপারসন নয়। তাই সার্কের কী হবে এ সিদ্ধান্ত সবাই মিলে নিতে হবে।’

নির্বাচন কমিশন গঠনে বিএনপি ভূমিকা রাখতে চায়, আলোচনা চায় সে জন্য নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনে তাদের সাথে পরামর্শ করা হবে কি না এ ব্যাপারে জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিএনপি কী ধরনের নির্বাচন কমিশন চায়। তারা কি এমন কমিশন চায় যারা এক কোটি ৩১ লাখেরও বেশি ভুয়া ভোটার তালিকায় আনবে। বর্তমান কমিশন তো এটি করেনি। সে জন্য তাদের (বিএনপি) পরামর্শ নিলে তো ভুয়া ভোটার তালিকা করে দেবে এমন কমিশন করতে হবে। আর মাগুরা মার্কা নির্বাচন করতে হবে।’

এ সময় অনেক অপকর্ম এবং জেল জুলুম করা হলেও একটি সঠিক ভোটার তালিকা করে দেয়ায় তৎকালীন সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী।

পাকিস্তান-ভারতের মধ্যে সাম্প্রতিক উত্তেজনা সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হলে আমরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবো। তাই আমরা যুদ্ধ চাই না। আমরা চাই দুই দেশ নিজেরাই দ্বিপক্ষীয়ভাবে তাদের সমস্যার সমাধান করুক। কোনো সঙ্ঘাত এ অঞ্চলে কাম্য নয়।’

আওয়ামী লীগের আগামী জাতীয় সম্মেলনে নেতৃত্বে কারা আসছেন জানতে চাইলে দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, ‘দলের কাউন্সিলররা নেতৃত্ব নির্বাচন করেন। তারাই ঠিক করবেন কারা আসবেন। এমনকি সভাপতি পদে কে থাকবে তাও ঠিক করবেন কাউন্সিলররা। আর কাউন্সিলররা অন্য কাউকে সভাপতি নির্বাচিত করলে আমি সবচেয়ে বেশি খুশি হতাম। ৩৫ বছর ধরে এ দায়িত্ব পালন করছি। আর কত! আমি যাই করি মতামত নিয়েই করি।’

তবে প্রধানমন্ত্রী যখন এ বক্তব্য দিচ্ছিলেন তখন সংবাদ সম্মেলনে থাকা কেন্দ্রীয় নেতারা হইচই শুরু করে দেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী আবার বলেন, ‘আমি তো দল ছেড়ে যাচ্ছি না। দলেই থাকব।’

এ সময় সরকারিভাবে একটি খেলার চ্যানেল করা যায় কি না- এমন প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রী নাকচ করে দিয়ে বলেন, সংসদ টেলিভিশনের সময় থেকে কয়েক ঘণ্টা খেলার জন্য বরাদ্দ দেয়া যায় কি না সেটি দেখা যেতে পারে। কারণ সংসদ অধিবেশনের পর চ্যানেলটি অব্যবহৃত থাকে।

সংবাদ সম্মেলনে দলের সাধারণ সম্পাদক ও জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী, স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম উপস্থিত ছিলেন।

সজীব ওয়াজেদ জয়ের আইসিটি অ্যাওয়ার্ড লাভ সম্পর্কে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সজীব ওয়াজেদ জয় দেশের জন্য সম্মান বয়ে এনেছে। তথ্যপ্রযুক্তিতে আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে। আর সে জন্য মা হিসেবে আমি গর্বিত।’

জয়ের জন্মের সময়কার স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘আমার এই ছেলে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে জন্মগ্রহণ করে। তখন আমাদের বড় দুঃখের সময়। একটি একতলা বাড়িতে আমাদের বন্দী করে রাখা হয়েছিল, তারই একটি দিনে ওর জন্ম। তার পর আল্লাহ তাকে এত বড় করেছে। সে বাংলাদেশকে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে এগিয়ে নিতে পারছে, এটিই অনেক বড় কথা। তার জন্য আমি সবার কাছে দোয়া চাই।’

এর আগে লিখিত বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী জানান, তিনি জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেয়া বক্তৃতায় সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের মদদদাতাদের খুঁজে বের করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলেছেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিবারের মতো এবারো আমি বাংলায় বক্তব্য দেই। বক্তৃতায় অভিবাসী ও শরণার্থী ইস্যুটিকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার অনুরোধ করি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আমি সন্ত্রাসী ও জঙ্গিদের পরামর্শদাতা, মূল পরিকল্পনাকারী, মদদদাতা, পৃষ্ঠপোষক, অর্থ ও অস্ত্র সরবরাহকারী এবং প্রশিক্ষকদের খুঁজে বের করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানাই।

বক্তৃতায় শেখ হাসিনা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের জন্য বিশ্বজুড়ে শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন বলেও জানান।

তিনি কানাডা সফরের কথা উল্লেখ করে বলেন, কানাডায় গ্লোবাল ফান্ড সম্মেলনের ফাঁকে জাস্টিন ট্রুডোর সাথে বৈঠক করি। বঠকে জাস্টিন দুই দেশের বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরো সুসংহত করার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেন। একই সাথে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের অবস্থানেরও প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, বৈঠকে বঙ্গবন্ধুর পলাতক খুনি নূর চৌধুরীকে দেশে ফেরানোর বিষয়ে আলোচনা হয়। তিনি এ নিয়ে সে দেশের আইনি বাধার কথা উল্লেখ করেন। তবে ন্যায়বিচার নিশ্চিতপূর্বক কিভাবে স্পর্শকাতর ইস্যুটির সুরাহা করা যায়, তার উপায় খুঁজতে দুই দেশের উপযুক্ত প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনা শুরুর পক্ষে মত দেন।

প্রধানমন্ত্রী জানান, তিনি জাস্টিন ট্রুুডোকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান এবং ট্রুডো তা সানন্দে গ্রহণ করেন।

কানাডায় গ্লোবাল ফান্ড সম্মেলন এবং যুক্তরাষ্ট্রে জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে গত ১৪ সেপ্টেম্বর ঢাকা ছাড়েন প্রধানমন্ত্রী। দীর্ঘ ব্যস্ত সফরের পর ৩০ সেপ্টেম্বর বিকেলে দেশে ফেরেন তিনি।

এ সফরে শেখ হাসিনা কানাডার প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও বিশ্বের শীর্ষ নেতাদের সাথে বৈঠক করেন। একই সাথে ভূষিত হন ‘এজেন্ট অব চেঞ্জ অ্যাওয়ার্ড’ পুরস্কার ও ‘প্ল্যানেট ৫০-৫০ চ্যাম্পিয়ন’ খেতাবে।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
admin
সংবাদ প্রতিনিধি

admin

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।