দীপক সরকার, বগুড়া প্রতিনিধি: ৭৫ বছর বয়সী মালেকা বেওয়া। বয়সের ছাপ ফুটে উঠেছে শরীরের পরতে পরতে। বয়সের ভারে ঠিকমতো চলাফেরা করতে পারেন না। চোখে ছানি পড়ায় দৃষ্টি শক্তি কমে গিয়ে ঠিকমত দেখতে পায়না। তবুও থেমে থাকছেনা তার জীবন গাড়ীর চাকা। বেঁচে থাকার তাগিদে ছুটতে হয় প্রতিনিয়ত অসহায় এই নারীকে। শুধু মালেকা নয় হাছনা, মেরিনা, খুকী, মোরশেদা সহ অনেক নারীরই জীবন সংসারের গল্প এমনই।
‘‘প্রজন্ম হোক সমতার, সকল নারীর অধিকার’’ এই শ্লোগানকে সামনে নিয়ে ৮ মার্চ পালিত হয়েছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। অথচ এসব নারীর কেহই জানে না নারী দিবস কি? তারা শুধু জানে তাদের শাক কচু বিক্রি না করলে থেমে যাবে জীবন ।
৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে এসব ভাগ্য বিড়ম্বিত নারীদের খোঁজ নিতে গিয়ে জানা যায় তাদের করুন কাহিনী।
এদের একজন মালেকা বেওয়ার বাড়ী সোনাতলা উপজেলার লোহাগাড়া গ্রামে। তিনি সারাদিন বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে কচু শাক সংগ্রহ করেন। আবার বিকেলের পর থেকে রেল লাইনের পাশে বসে বিক্রি করে এসব শাক কচু এবং সেই টাকায় জোগাড় হয় তার পেটের ভাত। নিজস্ব বাড়ী না থাকায় রেলস্টেশনের প্লাটফর্মেই রাত কেটে যায়।
এসব ভূখানাঙা জীবন সংগ্রামে অবতীর্ণ নারীদের কারোরই স্বামী নেই। তবে ছেলে সন্তান রয়েছে তাদের। কিন্তু তারপরেও ঠাঁই মেলেনি ছেলের সংসারে। শাক-কচু বিক্রি করে জোটে পেটের ভাত। কেউ রাত কাটায় রেলস্টেশনে, আবার বস্তির ঝুপড়ি ঘরে কেউবা থাকেন। এভাবেই বছরের পর বছর কেটে যাচ্ছে হাছনা, মেরিনা, মালেকার মতো খেটে খাওয়া শত শত শ্রমজীবী নারীর জীবন। কোনো দিবসেও কেউ এদের খোঁজ রাখে না। ভাগ্যে জোটে না কোনো সরকারি সুযোগ সুবিধা।
বগুড়া শহরের ফতেহ আলী বাজার গেট, কাঠালতলা এবং ৩নং রেল ঘুমটি সংলগ্ন রেললাইনের পাশ দিয়ে প্রতিদিন বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বিভিন্ন শাক-কচু বিক্রি করে বৃদ্ধ বয়সী বেশ কয়েকজন নারী।
গাবতলী উপজেলার হামিদপুর গ্রামের হাছনা বেগমেরও একই অবস্থা। ১১ বছর আগে স্বামী বেলাল হোসেন ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। জীবন জীবিকার তাগিদে দুই ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে চলে আসেন শহরে, বসবাস শুরু করেন বস্তিতে পেশা হিসেবে বেছে নেন শাক-কচু বিক্রি।
হাছনা বেগম জানান, ছেলে বড় হয়ে বিয়ে করে অন্যত্র চলে গেছে। মেয়েকে বিয়ে দিলেও যৌতুকের দাবিতে জামাইয়ের অত্যাচারে ফিরে এসেছে তার কাছে।
কথা হয় সোনাতলা উপজেলার সুজাইতপুর গ্রামের মেরিনা বেওয়ার সাথে। তার স্বামীও মারা গেছেন ৯ বছর আগে। দুই ছেলে দুই মেয়েকে নিয়ে সংসারের হাল ধরেন তিনি। বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে বিয়ে দিয়েছেন দুই মেয়েকে। ঋণের টাকায় রিকশা কিনে দিয়েছেন ছেলেদেরকে। কিন্তু ছেলেরা বিয়ে করে শ্বশুর বাড়িতে চলে যায়। আর মেরিনা বেওয়া ঠাঁই হয় রেলস্টেশনের প্লাটফর্মে। শাক বিক্রির টাকায় পেটের ভাত জোটানোর পাশাপাশি সপ্তাহে দুইদিন বাড়িতে যান এনজিওর কিস্তি দিতে।
এসব বৃদ্ধ বয়সী এই নারীরা প্রতিদিন সকালে ট্রেন যোগে চলে যান বিভিন্ন এলাকায়। গ্রামের জমিতে কিংবা মানুষের বাড়ির আশপাশে কচুসহ বিভিন্ন প্রজাতির শাক সংগ্রহ করে বিকেলের ট্রেনে ফিরে আসেন শহরে। আর ফতেহ আলী বাজার, রাজাবাজার সহ রেললাইনের পাশে বসে বিকেলের পর থেকে রাত অবদি বিক্রি করেন কুঁড়িয়ে আনা শাক-কচু।
জীবন সংগ্রামে অবতীর্ণ এসব নারীরা তাদের নিজের ভাগ্যের দোষ বলে সাময়িক শান্তনা পেলেও নানা প্রতিকুলতাসহ বিষন্নতার ছাপ তাদের চোখে-মুখে স্পষ্ট। অন্যদিকে বর্তমান সরকার ঘোষিত মুজিববর্ষে অন্যতম অঙ্গীকার সমাজের একটি লোকও যেন গৃহহীন না থাকে ও ভাত বা অর্থাভাবে না থাকে। অথচ এসব নীড়হীন ভূখানাঙ্গা নারীদের জীবনে মুজিববর্ষের অঙ্গীকার কে শোনাবে ও কে করবে তাদের পূর্নবাসনসহ আত্মনির্ভশীলতা জয়গান এমনটাই ভাবছেন সচেতনমহল।


