বেনাপোল প্রতিনিধিঃ ইমিগ্রেশনের অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, হয়রানি নিয়ে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর মঙ্গলবার (২১ মার্চ) থেকে বেনাপোল চেকপোস্ট পুলিশ ইমিগ্রেশনের চেহারা পাল্টে গেছে। তবে শত শত যাত্রী সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েছেন।
বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের কষ্টের সীমা নেই। প্রখর রোদের মধ্যে দীর্ঘ লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। ইমিগ্রেশনের কাজ দ্রুত সম্পন্ন হলেও স্থানীয় সোনালী ব্যাংকের বুথে জনবল না থাকায় যাত্রীদের ভ্রমণকর পরিশোধ করতে অনেক সময় যাচ্ছে।
যাত্রী হয়রানি ও ইমিগ্রেশনকে দালালমুক্ত করতে না পারায় চেকপোস্ট ওসি ইকবাল হোসেনকে খুলনা ডিআইজি অফিসে ক্লোজ করা হয়েছে।
ইমিগ্রেশন সূত্রে জানা গেছে, আগের তুলনায় এ পথে যাত্রীর সঙ্গে রাজস্বও বাড়ছে। এখন দিনে এ পথে গড়ে প্রায় সাত হাজার লোক ভারত-বাংলাদেশ আসা-যাওয়া করছেন। রাজস্ব আদায় হচ্ছে প্রতিদিন ১৫ থেকে ১৮ লাখ টাকা।
বেনাপোল আন্তর্জাতিক চেকপোস্ট দিয়ে যাতায়াতে ইমিগ্রেশনের অব্যবস্থাপনা ও যাত্রী হয়রানির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ইমিগ্রেশন পুলিশ ও দালালরা জোটবদ্ধ হয়ে যাত্রীদের নানাভাবে হয়রানি করে বলে অভিযোগ। সম্প্রতি একাধিক গণমাধ্যমে এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এর পর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ইমিগ্রেশনকে যাত্রী হয়রানিমুক্ত করার পদক্ষেপ নেয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, দালালমুক্ত পরিবেশে যাত্রীদের সুশৃংখলভাবে পাসপোর্টের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করায় গত এক সপ্তাহে রাজস্ব আয় বেড়েছে ব্যাপক হারে। আগে ভ্রমণকর না দিয়ে কোনো কোনো যাত্রী ইমিগ্রেশন পার হয়ে গেলেও এখন তা সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। প্রতিদিন ইমিগ্রেশন পুলিশের পাশাপাশি পোর্ট থানা পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে দালাল আটকে। গত তিন দিনে দশ ‘দালাল’ আটক হয়েছেন।
ইমিগ্রেশনে দালালের দৌরাত্ম্য বন্ধ হলেও যাত্রী ভোগান্তি কিন্তু কমেনি। বেনাপোল চেকপোস্ট সোনালী ব্যাংক বুথে প্রয়োজনীয় সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী না থাকায় ভারতগামী পাসপোর্ট যাত্রীদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ভ্রমণকর জমা দিতে হচ্ছে। আর অতিরিক্ত সময় ক্ষেপণ হওয়ায় রোদে দাঁড়িয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন বলে একাধিক যাত্রী অভিযোগ করেন।
বৃহস্পতিবার দুপুরে সরেজমিনে বেনাপোল চেকপোস্ট এলাকায় দেখা যায়, ইমিগ্রেশন কাস্টমস ভবনের সামনে প্রধান সড়কের প্রায় এক কিলোমিটার জুড়ে পড়ে গেছে ভ্রমণকর দিতে দীর্ঘ লাইন। আর ভ্রমণকর দিয়ে এসে পাসপোর্টের কার্যাদি সারতে পাসপোর্টদের দীর্ঘ লাইন। এই লাইন ইমিগ্রেশন থেকে প্রধান সড়ক হয়ে সাদীপুর গ্রামের মধ্যে চলে গেছে। রোদে দাঁড়িয়ে থেকে ক্লান্ত হওয়ায় তাদের চোখে-মুখে কষ্টের ছাপ। কখন তারা ভারত যেতে পারবেন এই দুশ্চিন্তায় রয়েছে পরিবারের লোক নিয়ে।
ভারতগামী যাত্রী ঢাকার মইনুল ইসলাম, আরমান হোসেন, খুলনার মোমিন উদ্দিন, নিরুপমা রায় বলেন, ‘আমরা ইমিগ্রেশনের স্বচ্ছতায় খুশি। তারা আমাদের পাসপোর্টের কাজ সরাসরি ডেক্সে দাঁড়িয়ে ছবি তুলে ছেড়ে দিচ্ছে পাসপোর্টে সিল মেরে। সেখানে কোনো প্রকার সময় ক্ষেপণ হচ্ছে না। কিন্তু সোনালী ব্যাংকের বুথে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে প্রায় দুই ঘণ্টা পর কর জমা দিতে পেরেছি।’
সোনালী ব্যাংকের কার্যক্রমে মোটেও সন্তুষ্ট নন পাসপোর্টধারী যাত্রী যশোরের শাহজাহান মিয়া। তিনি বলেন, ‘সোনালী ব্যাংকে মাত্র দুইজন ভ্রমণ ট্যাক্স কাটে। এতে মানুষ হয়রানি হচ্ছে বেশি। এখানে লোকবল বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।’
যাত্রীদের রোদে দাঁড়িয়ে থেকে ক্লান্ত হওয়ায় তাদের অবস্থা বুঝতে পেরে বেনাপোল বন্দরের সিনিয়র পরিচালক (ট্রাফিক) আমিনুল ইসলাম সড়ক থেকে যাত্রীদের ডেকে বন্দরের নিজস্ব আনসার দিয়ে চেকপোস্ট বন্দরের আন্তর্জাতিক প্যাসেনজার টারমিনালের ছায়ায় দাঁড়িয়ে লাইনের ব্যবস্থা করে দেওয়ায় যাত্রীরা অনেকটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেন। বন্দরের বাথরুমও যাত্রীদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে।
চেকপোস্ট ইমিগ্রেশনের দায়িত্বে থাকা সেকেন্ড অফিসার এসআই ফজলুর রহমান বলেন, ‘চেকপোস্টে যাত্রী হয়রানি যাতে না হয় সে জন্য দালাল-ছিনতাইকারীদের উৎখাতের জন্য সব রকমের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। স্বচ্ছতার সাথে যাত্রীরা যাতে এ পথে পারাপার হতে পারে সে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।’
বেনাপোল পোর্ট থানার ওসি অপূর্ব হাসান বলেন, ‘কোনো রকম দালালের মাধ্যমে যাতে যাত্রীরা হয়রানির শিকার না হয়, সে ব্যাপারে ইমিগ্রেশনকে সার্বিক সহযোগিতা করা হচ্ছে।’
চেকপোস্ট কাস্টম হাউজের ডেপুটি কমিশনার নিতীশ বিশ্বাস বলেন, ‘কাস্টমস ইতিমধ্যে সোনালী ব্যাংককে অবহিত করেছে যাতে তারা আরো দুই-একজন কর্মী চেকপোস্ট বুথে নিয়োগ দেন। যাতে দ্রুত ব্যাংকের ভ্রমণকর কাটতে পারে এবং যাত্রীরাও অপেক্ষা না করে দ্রুত আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে চলে যেতে পারে।’