পৃথিবী থেকে সনাতনীদের হ্রাস পাওয়ার একমাত্র কারন ‘বেদ’ থেকে বিচ‍্যুতি

দেবাশীষ মুখার্জী (কূটনৈতিক প্রতিবেদক): একসময় পৃথিবীর কমপক্ষে ৮০% মানুষ সনাতন ধর্মাবলম্বী ছিল। আজ সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা বিশ্ব জনসংখ্যার মাত্র ১৪.৫% – এ নেমে এসেছে।সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা এত আশংকাজনক ভাবে হ্রাস পেল কেন ? শতাধিক রাষ্ট্রে একসময় সমস্ত মানুষ সনাতন ধর্মাবলম্বী ছিল, সেই সব রাষ্ট্রে, আজ একজনও সনাতন ধর্মাবলম্বী অবশিষ্ট নেই। এমনকি এক সহস্রাব্দ বছর আগেও ২৩ টি রাষ্ট্র ছিল নিরঙ্কুশ হিন্দু সংখ‍্যাগরিষ্ঠ। আজ নেপাল ও ভারত ছাড়া, পৃথিবীতে আর কোন  হিন্দু সংখ‍্যাগরিষ্ঠ দেশ নেই। মরিশাসের হিন্দু জনসংখ্যা বিগত দশ বছরে ৫১% থেকে ৪৮.৬%-এ নেমে এসেছে।

দেশে দেশে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের এই শোচনীয় পরিনতির কারণ উদঘাটন করতে আমি দীর্ঘদিন তথ‍্যানুসন্ধান করেছি। আমার কাছে মনে হয়েছে, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের এই বিপর্যয়ের প্রধান কারণ হচ্ছে, তাদের মূল ধর্মগ্রন্থ ‘বেদ’ – থেকে বিচ‍্যুতি। ‘বেদ’ – শব্দের অর্থ জ্ঞান ― ব্রহ্মার মুখ নির্গত অমোঘ জ্ঞান। ‘বেদ’ – এর ব‍্যখ‍্যায় ঋষি ও ঋষিকাগণ বিভিন্ন ধর্মশাস্ত্র সৃষ্টি করেছেন। ব্রহ্মা সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করে – প্রাণিকুল যাতে পৃথিবীতে টিকে থাকতে পারে, তার জন্য প্রতিটি প্রাণির মস্তিষ্কে জ্ঞান দান করেছেন। বেদমন্ত্রদ্রষ্টা  ঋষি ও ঋষিকাগণ সৃষ্টি পরিচালনার জন্য যে ‘ব্রহ্মজ্ঞান’ তথা  সৃষ্টি সম্পর্কিত যাবতীয় জ্ঞান উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন – সেই ‘ব্রহ্মজ্ঞান’ হচ্ছে আধুনিক বিজ্ঞান-প্রযুক্তি-রাজনীতি-অর্থনীতি-চিকিৎসাবিদ‍্যাসহ জগত পরিচালনার সমস্ত জ্ঞানের ভিত্তি। কিন্তু দুর্ভাগ‍্যবশত সনাতন ধর্মাবলম্বীরা বহুকাল পূর্বে ‘বেদ-জ্ঞান’ – বিচ‍্যুত হয়ে, কতিপয় কল্পকাহিনীকে ধর্মগ্রন্থ ভ্রম করে, সীমাহীন অজ্ঞানতা,অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারে নিমজ্জিত হয়েছে। ফলশ্রুতিতে সমাজের ক্ষমতাধর লোভী নরাধমরা ধর্মচ‍্যুত হয়ে, দুর্বল মানুষকে পদানত করতে গিয়ে,আত্মঘাতী জাতিভেদ প্রথা সৃষ্টি করেছে। এই দুষ্টচক্র নারীদের সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত করে, জীবন্ত অবস্থায় মৃত স্বামীর চিতায় পুড়িয়ে মারতো। অথচ বৈদিক যুগে কোন জাতিভেদ ছিল না, সবাই ব্রাহ্মণ ছিল এবং নারী-পুরুষ সমানাধিকার ভোগ করতো।
অত‍্যাচারিত-অপমানিত সনাতন ধর্মাবলম্বীরা ধর্মান্তরিত হয়ে,আক্রমণকারী বিদেশি শত্রু শিবিরে চলে যাওয়ার ফলে, দেশে দেশে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিপর্যয় ঘটেছে। যেতে যেতে সবাই গেছে। অন্ধের যষ্টি সরূপ শেষ ভরসা ভারত রাষ্ট্রটি শুধু আছে। তাও বৃটিশ না এলে,হিন্দুদের পক্ষে ভারতে টিকে থাকা কঠিন হতো। যেমন এক সময়ের শতভাগ হিন্দু অধ‍্যুসিত আফগানিস্তানে বৃটিশরা যায় নি ; সেখান থেকে হিন্দুরা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।
যারা প্রচার করছে, হিন্দুদের রাজনৈতিক চিন্তার দরকার নেই,ভগবান সনাতন ধর্মকে রক্ষা করবেন। তাদের ভাবতে বলছি, এক সময়ের ১০০% হিন্দু অধ‍্যুসিত পাকিস্তান, বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি দেশ থেকে হিন্দুরা কেন মুছে যাচ্ছে ? ভগবান কেন ঐ সব দেশের হিন্দুদের রক্ষা করছেন না ? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মহানুভবতায় স্বাধীনতা পাওয়া ভারত রাষ্ট্রে, হিন্দু জনসংখ্যা হার, দিনকে দিন কমে যাচ্ছে। ভারতে হিন্দু জনসংখ্যা হার যদি ৫০% – এর নিচে নেমে আসে, তাহলে আফগানিস্তান-পাকিস্তানের মতো ভারতভূমি দ্রুত হিন্দুশূন্য হয়ে যাবে। তথাকথিত বংশগৌরবে মদমত্ত হয়ে, যে সব বর্ণবাদী সেক‍্যুলার-কুলাঙ্গার, অস্পৃশ‍্য-অবহেলিত মানুষকে অন‍্যধর্মে ঠেলে পাঠাচ্ছে,তারা প্রকারান্তরে নিজেদের কফিন বাক্সে পেরেক ঠুকিয়ে চলেছে। এরা ভেবে দেখছে না, সমাজের সংখ‍্যাগরিষ্ঠ অংশকে অন্য ধর্মে ঠেলে দিয়ে, নিজেদের সংখ‍্যলঘুতে পরিনত করলে – তাদের কি ভায়াবহ পরিনতি হবে। তখন হিন্দুর মধ্যে বিভেদ-বিদ্বেষ সৃষ্টি করা ধর্মনিরপেক্ষতা তত্ত্ব, সেক‍্যুলার বর্ণবাদীদের রক্ষা করতে  পারবে না। সিরিয়া-ইরাক-আফগানিস্তান প্রভৃতি দেশে শান্তি স্থাপনের দৃষ্টান্ত থেকে, এই আহাম্মক সেক‍্যুলার বর্ণবাদীরা কোন শিক্ষা গ্রহণ করছে না। সনাতন ধর্মাবলম্বী অধ‍্যুসিত ইরাক-আফগানিস্তান-সিরিয়া প্রভৃতি রাষ্ট্র যখন বিধর্মী দখলদাররা দখল করে নেয়,তখন স্বজাতির মধ্যে বিভেদ সৃষ্টিকারী সেক‍্যুলার শক্তি, দখলদারদের সহায়তা করেছিল। কিন্তু দখলদারা শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে প্রথমেই  সেক‍্যুলারদের খতম করে দেয়। ভারতে যে সব স্বজাতি-বিদ্বেষী উগ্র বর্ণবাদী সেক‍্যুলার, শত্রুপক্ষকে সুবিধা করে দিতে, জাতিভেদ-বিরোধী হিন্দুত্ববাদী শক্তির পিণ্ডি চটকাচ্ছে এবং তারা যদি ভারতকে সত্যি সত্যিই আফগানিস্তান-ইরাক-সিরিয়ায় পরিনত করতে পারে, তখন কিন্তু তাদের করুন পরিনতি বরন করতে হবে। তাদের মনে রাখতে হবে, স্বজাতির সাথে বেইমানি করা, জ‍্যোতি বসুরা কিন্তু পাকিস্তানে থাকতে পারেন নি।
জাতিকে রক্ষা করার উপায় কি ?
সমাধান সূত্র একটাই,সেটি হচ্ছে  ― অতীতে সমস্ত সনাতন ধর্মাবলম্বী ব্রাহ্মণ ছিল। পরে বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত হয়ে বিভিন্ন বর্ণে বিভক্ত হয়েছে। অর্থাৎ যেহেতু প্রতিটি সনাতন হিন্দুর পূর্বপুরুষ ব্রাহ্মণ ছিল, সুতরাং প্রতিটি সনাতন হিন্দু কোন না কোন ব্রাহ্মণের বংশধর। উল্লেখ্য অদিপিতা মনু ব্রাহ্মণ ছিলেন। ব্রাহ্মণের বংশধর হিসেবে, প্রতিটি সনাতন হিন্দু যদি নিজেকে ব্রাহ্মণ ঘোষণা করে, তাহলে জাতিভেদ থাকবে না। হিন্দুরা জন্মগত সমমর্যাদায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে যদি উৎকৃষ্ট ব্রহ্মজ্ঞান ধারণ করে, তাহলে হিন্দু জাতি বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। আজ অপমানিত অত‍্যাচারিত হয়ে সনাতন ধর্ম ছেড়ে লোক চলে যাচ্ছে, ব্রাহ্মণের মর্যাদা পেলে বাইরে থেকে সনাতন ধর্মে লোক আসবে।
সমস্ত সনাতন হিন্দু যে অতীতে ব্রাহ্মণ ছিল, তার শাস্ত্রীয় প্রমাণ তুলে ধরছি ―
মহাভারতের ‘শান্তি পর্ব’ – এর ‘ভৃগু-ভরদ্বাজ সংবাদ’
ভৃগুরুবাচ। ন বিশেষোঽস্তি বর্ণানাং সর্বং ব্রাহ্মমিদং জগৎ।
ব্রাহ্মণাঃ পূর্বসৃষ্টা হি কর্মভির্বর্ণতাং গতাঃ।।
ভৃগু বললেন,
আসলেই এই জগতে সকল বর্ণের মধ্যে কোন তফাৎ নেই। প্রথমে জগতে সবাই-ই ব্রাহ্মণ ছিল। কিন্তু পরে কর্ম বৃদ্ধি পাওয়ায় সবাই কর্মের ভিত্তিতে বিভিন্ন বর্ণে ভাগ হয়ে গেল।
(১২.১৮১.১০)
ইত্যেতে চতুরো বর্ণা যেষাং ব্রাহ্মী সরস্বতী।
বিহিতা ব্রহ্মণা পূর্বং লোভাত্ৎবজ্ঞানতাং গতাঃ॥
এভাবে চতুর্বর্ণ সবাই প্রথমে ব্রাহ্মণ হিসেবেই সৃষ্টি হয়েছিল এবং ব্রহ্মা, তাঁর বাণী বেদ এদের সবার জন্যেই ব্যাক্ত করেছেন।
(১২.১৮১.১৫)
প্রজা ব্রাহ্মণসংস্কারাঃ স্বকর্মকৃতনিশ্চয়াঃ।
ঋষিভিঃ স্বেন তপসা সৃজ্যন্তে চাপরে পরৈঃ॥
তপস্যাবান ঋষিরা যারা সৃষ্টিকে বর্ধিত করলেন এবং সনাতন ‘বেদ’-এ দেওয়া বিধান অনুসারে মানবজাতিকে শিক্ষা দিলেন।
(১২.১৮১.১৯)
আদিদেবসমুদ্ভূতা ব্রহ্মমূলাক্ষয়াব্যযা।
সা সৃষ্টির্মানসী নাম ধর্মতন্ত্রপরায়ণা॥
তাই এই সৃষ্টি ব্রহ্মা হতেই উদ্ভুত আর ধর্মের উপরেই এর ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত।
(১২.১৮১.২০)
বৃহদারণ‍্যক উপনিষদে আছে –
ব্রহ্ম বা ইদমগ্রে আসীৎ,একমেব তদেকং সৎ  নব‍্যভবেৎ।
তচ্ছ্রেয়োরূপং অত‍্যসৃজত ক্ষত্রং।।
অর্থাৎ, অগ্রে একমাত্র ব্রাহ্মণ ছিলেন। এই জাতি একাকী বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হলো না,সুতরাং এই ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয়কে সৃষ্টি করলেন।
অতীতে ব্রাহ্মণ ভিন্ন কোন বর্ণ ছিল না। ব্রাহ্মণ ঋষিগণ ছিলেন বেদ মন্ত্রের দ্রষ্টা এবং ধর্মশাস্ত্রের ব‍্যখ‍্যাদানকারী।এজন্য সনাতন ধর্মশাস্ত্রকে বলা হয়  ‘ব্রাহ্মণ‍্যবাদ’। ব্রাহ্মণ‍্যবাদের সাথে বর্ণবাদ বা জাতিভেদের কোন সম্পর্ক নেই। তা সত্ত্বেও সেক‍্যুলারচক্রের গুপ্তঘাতকরা, ‘ব্রাহ্মণ‍্যবাদ’ – শব্দটিকে অনবরত আক্রমণ করার মাধ্যমে, সনাতন ধর্মকে ধ্বংস করার চক্রান্ত বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। এই সেক‍্যুলার গুপ্তঘাতকচক্র দিনরাত ‘ব্রাহ্মণ’-বিদ্বেষ প্রচার করে,হিন্দু জাতিকে বিভক্ত করে, হিন্দুত্ববাদী শক্তিকে চিরতরে পঙ্গু করে দিতে চাইছে। এই বিভেদকামী গুপ্তঘাতকরা বহুরূপী। এরা দাবি যে,তারা ডঃ বি আর আম্বেদকরজীর অনুসারী। আমি ডঃ আম্বেদকরের জীবনীগ্রন্থ উদ্বৃত করে দেখিয়েছি যে, তাঁকে বর্ণ হিন্দুরাই কেবল অপমান করে নি,ধোপা, নাপিত,ভুঞ্জমালি এমনকি মুসলমানরা পর্যন্ত অপমান-অত‍্যাচার করেছে। ডঃ আম্বেদকর নিজে বলেছেন, ব্রাহ্মণদের সহায়তা না পেলে, তিনি উচ্চ শিক্ষিত ব‍্যক্তিতে পরিনত হতে পারতেন না। তিনি তাঁর একজন ব্রাহ্মণ শিক্ষক কৃষ্ণ কেশব আম্বেদকরের ‘ব্রাহ্মণ-পদবী’  আজীবন ব‍্যবহার করছেন। বরোদার ব্রাহ্মণ রাজা সায়াজিরাও গায়কোয়ারের আর্থিক অনুদানে ডঃ আম্বেদকর দেশে ও বিদেশে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করেছেন।
এক দিকে অমর্ত্য সেনের নেতৃত্বে বর্ণহিন্দু পদবীধারী সেক‍্যুলার বর্ণবাদীদের ষড়যন্ত্র ; অন‍্যদিকে ডঃ আম্বেদকরের নাম ভাঙ্গিয়ে একদল বিভেদকামীর ব্রাহ্মণ-বিদ্বেষ প্রচার।  সেক‍্যুলার বিভেদ-পন্থীদের দোধারি তলোয়ার মোকাবেলা করতে হচ্ছে, হিন্দুত্ববাদী ঐক‍্যপ্রত‍্যাশীদের। কোন অবস্থাতেই বিভেদকামীদের প্রশ্রয় দিয়ে ১৯৪৭ সালের সেই মারাত্মক ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটতে দেওয়া যাবে না। ঐক্যের কোন বিকল্প নেই। ঐক্যের বিকল্প এটাই, তা হচ্ছে বিলুপ্তি।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
Brinda Chowdhury
লেখক / প্রতিবেদক

Brinda Chowdhury

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।