বীর বিপ্লবী রামকৃষ্ণ রায়ের জন্মদিন আজ

বীর বিপ্লবী রামকৃষ্ণ রায়ের জন্মদিন আজ

স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন বীর বিপ্লবী রামকৃষ্ণ রায়ের জন্মদিন আজ ।  ১৯১২ সালের ৯ জানুয়ারি পশ্চিম বঙ্গে মেদিনীপুর জেলার খড়্গপুর থানার জকপুরের বিখ্যাত রায় বংশে পিতা কেনারাম রায় ও মাতা ভাবতারিণী দেবী জন্ম গ্রহণ তিনি।

রামকৃষ্ণ মেদিনীপুর টাউন স্কুলে ১৯২২ সালে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হন । ওই ক্লাসেই তাঁর পরবর্তীকালের সহকর্মী ব্রজকিশোর চক্রবর্ত্তী , অমর চট্টোপাধ্যায়, ফণি দাস প্রমুখ ভর্তি হয়েছিলেন । ছোটবেলা থেকে রামকৃষ্ণ মনদিয়ে শরীরচর্চা করতেন । ছুটে যেতেন মানুষের বিপদে আপদে । নিজেকে সবসময় মানুষের সেবায় নিয়জত রাখতেন। ১৯২৪ সালে মেদিনীপুরে গান্ধীজি এসেছিলেন তখন বালক রামকৃষ্ণ স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীতে যোগ দিলেন এবং সারাদিন সেখানেই ব্যাস্ত থাকতেন । ১৯২৬ সালে পুরসভার নির্বাচনে বীরেন্দ্রনাথ শাসমলের হয়ে রামকৃষ্ণ ভোট সংগ্রহ করেছিলেন । ১৯২৮ সালে সুভাষচন্দ্র বসু মেদিনীপুর এসেছিলেন, রামকৃষ্ণ তখন নেতাজিকে পেয়ে আরো অনুপ্রাণিত হয়ে পড়েন এবং নেতাজীর সাথে বেশ কিছু দিন স্বেচ্ছাসেবকের কাজও করেছিলেন । এই সময়েই মেদিনীপুরে এসেছিলেন বিপ্লবী দীনেশ গুপ্ত । মেদিনীপুর কলেজে বিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষে ভর্তি হলেন কিন্তু পড়াশুনা করা তার আসল উদেশ্য ছিলো না তার আসল উদেশ্য ছিলো বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সকে শক্তিশালী করা । রামকৃষ্ণ তখন বিবিগঞ্জের ছোট শিবমন্দিরের আব্দুল্লির আখড়ার অন্যতম সদস্য হিসেবে যোগ দেন । তিনি বুঝতে পারছিলেন, মেদিনীপুরে এমন একটা কিছু হচ্ছে যাতে অংশ নিতে পারছেন না তিনি । এদিকে দীনেশের সহকর্মী, ফণি কুণ্ডু খুঁজছেন কয়েকটি তরতাজা উদ্দীপনায় ভরপুর যুবকের সেই সময় আব্দুল্লির আখড়ার কথা জানতে পারলেন তিনি । সকলের আপত্তি অগ্রাহ্য করেই রামকৃষ্ণকে দলে নিলেন তিনি । রামকৃষ্ণ দলে কিছুদিনের মধ্যেই সকলের কাছে খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন । রামকৃষ্ণের প্রেরণাতে একদল তার তাজা যুবক দলে যোগ দিল।

১৯৩০ সাল শোনা গেল, জেলাশাসক পেডি তমলুক থেকে মেদিনীপুর ট্রেনে আসছেন । ফণী কুণ্ডু পেডিকে হত্যার ছক কষলেন । কিন্তু ছুরি ছাড়া কোনও অস্ত্র নেই । রামকৃষ্ণ ছুরি নিয়েই যেতে প্রস্তুত । কলেজ থেকে পটাসিয়াম সায়ানাইড এনে ভেসলিন দিয়ে ছুরিতে লাগানো হল । ঠিক হল খড়্গপুর স্টেশনে ছুরি দিয়ে রামকৃষ্ণ পেডিকে আক্রমণ করবে তার পর আত্মহত্যা করবে । নিদৃষ্ট দিনে রামকৃষ্ণ বেরিয়ে গেলেন ভালবাসার টানে দলের নেতা ফণী নিয়ম ভেঙে তাঁর পিছু নিলেন । খড়্গপুর স্টেশনে ট্রেন থেমেছে দরজা বন্ধ চারদিকে পুলিশে ছয়লাপ । কিছুতেই পেডির কামরায় যাওয়া যাচ্ছে না তবুও রামকৃষ্ণ ট্রেনের জানলার ফাঁক দিয়ে পেডিকে মারার জন্য এগিয়ে চললেন । হঠাৎ পিছন থেকে ডাক পড়ল, ফণী নিষেধের ডাক দিলেন রামকৃষ্ণকে, নেতার নির্দেশ মানতেই হবে । রামকৃষ্ণ এই আক্ষেপে কেঁদে ফেলেছিলেন । পরে ঠিক হল, মেদিনীপুর স্টেশনে আবার চেষ্টা হবে । মেদিনীপুরে ট্রেনের কাছে ঘেঁষতে পারলেন না রামকৃষ্ণ । পেডি কে হাতের কাছে পেয়ে না মারতে পারার কারণে বেশ কিছুদিন বিমর্ষ হয়েছিলেন তিনি । বেশ কিছুদিন পরে হত্যা করা হল পেডিকে। ফণী কুণ্ডু রামকৃষ্ণকে সেই অভিযানে সঙ্গে নেননি । দলের অনেক নেতা ধরা পড়লেন ঠিক হল কিছুদিন গা ঢাকা দিয়ে থাকতে হবে তাদের। ফণী কুণ্ডু তখন জেলে, দীনেশ গুপ্তর ফাঁসি হয়ে গিয়েছে । ঠিক হল, রামকৃষ্ণ ও ব্রজকিশোর আড়ালে থাকবেন । ধীর স্থির ব্রজকিশোর পরিস্থিতির চাপে মেনে নিলেন । পূজারী সেজে বাড়ি বাড়ি পুজো করতেন আর ছেলে জোগাড় করতেন । পুলিশ ভাবল, পেডি হত্যা মামলায় খালাস পেয়ে ব্রজকিশোর ভয় পেয়েছেন । পুলিশ তার পিছু নেওয়া ছাড়ল । রামকৃষ্ণ অস্থির চিত্ত মাণিক নন্দীর পুকুর পাড়ে একটা কুড়ে ঘরে থাকতেন । ব্রজেকিশোরের মতো দলের নির্দেশ তিনি মেনে নিতে পারেননি । রাতের অন্ধকারে প্রায়ই সহকর্মীদের কাছে গিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেন । অনুরোধ করেন, তাঁকে বাদ দিয়ে যেন অন্য কেউ আত্মবলিদানের সুযোগ না পান । এদিকে আরেক জেলাশাসক ডগলাসকে হত্যার সিদ্ধান্ত হয়েছে । রামকৃষ্ণকে কিছুই বলা হয়নি কারন সে জানতে পারলে তাঁকে আটকানো যাবে না । ঠিক হল, ডগলাস হত্যার পরে ব্রজকিশোর ও রামকৃষ্ণকে সামনে আনা হবে । ডগলাস খুন হলেন খবর পেয়ে রামকৃষ্ণ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন তাকে না জানানোর জন্যে। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী, দলের দায়িত্বে ব্রজকিশোর ও রামকৃষ্ণর । জেলাশাসক বার্জকে হত্যা করতে হবে কিন্তু পুলিশ সজাগ তাই এবারে সাফল্য এল না। ১৯৩৩ সালের ২ রা সেপ্টেম্বর । বিকেল সাড়ে ৫ টার সময় অনাথবন্ধু পাঁজা ও মৃগেন দত্তর গুলিতে বার্জ মারা গেলেন খেলার মাঠে । অনাথ ও মৃগেন পুলিশের গুলিতে প্রাণ দিলেন। মেদিনীপুরের অগণিত যুবক-সহ ধরা পড়লেন রামকৃষ্ণ ও ব্রজকিশোর । তাঁদের উপর অত্যাচার চলল । কিন্তু রামকৃষ্ণ ও ব্রজকিশোর মুখ খুললেন না । ১৯৩৪ সালে রামকৃষ্ণ, ব্রজকিশোর ও নির্মলজীবন ঘোষের ফাঁসির আদেশ দেওয়া হল । অন্যদের সাজা হলো দ্বীপান্তর । ১৯৩৪ সালের ৮ ই অক্টোবর রামকৃষ্ণের বড়দা নরেশকৃষ্ণের কাছে জেল সুপারের চিঠি এল । ১০ অক্টোবর নরেশকৃষ্ণ জেলের গেটে দেখা করলেন । প্রসন্ন মুখ, বলিষ্ঠ দেহ দাদাকে নমস্কার করে বললেন, ‘ দাদা চললাম, মাকে দেখো, আমি আবার আসব ’ । নিজের হাতে মাকে এক খানি চিঠি লিখেছিলেন চিঠিটি দাদার হাতে দিলেন মাকে দেওয়ার জন্যে । চিঠিটি পড়লে শিউরে উঠবে দেহ……. শ্রীচরণেষু মা , “ বহুদিন হোলো আপনার কোন কুশল সংবাদ পাই নাই , আশা করি কুশলে আছেন । মা আজ আমার . সুখ অনুভব করিতেছি তাহা আমি নিজেই বুঝিতে পারিতেছি না । কে যেন আলো দেখিয়ে বলছে আয় , আয় , ফিরে আয় , ওখানে তোর স্থান হবে না , এই অন্তরের কোলে তোর স্থান । তাঁর ডাকে আত্মহারা হয়ে ছুটে চলেছি । কোথায় চলেছি ও কেন চলেছি তাহা কিছুই জানি না । মাগো , তোমায় ছেড়ে যাচ্ছি বলে তুমি দুঃখ কোরো না কারণ এখানে যাহারাই আসিয়াছে , তাহাদিগকে ফিরিয়া যাইতে হইবে । এই পৃথিবী ঠিক যেন একটি বাজার স্বরূপ বাজার করুক বা না করুক ফিরিয়া যাইতেই হইবে । যাঁহার ইচ্ছাতেই এই পৃথিবী চলিতেছে সেই অনন্ত পুরুষ যাঁহার অঙ্গুলি হেলনে সমস্ত দুনিয়া ওলোট পালোট হয়ে যেতে পারে তাঁহার ডাক আসিলে সকলকেই চলিয়া যাইতে হইবে ।” “ তাঁরই ইচ্ছা হবেই পূর্ণ সকল জীবন মাঝে ”। “ মাগো , আমি আপনার হতভাগ্য সন্তান । পৃথিবীতে এসে কেবল আপনাকে দুঃখ এবং অশান্তিই দিয়ে গেলাম । আপনার প্রতি আমি কোন কর্তব্যই করিতে পারিলাম না । তাহার জন্য আমায় ক্ষমা করিবেন । বহু তপস্যা ও আরাধনার পর আমি আপনার মোট মা পেয়েছিলাম কিন্তু বিধাতা আমায় বেশী দিন আপনার চরণে স্থান দিলে না । মা আজ পর্যন্ত দুঃখ ও কষ্ট দিয়েই গেলাম । শুধু এই আসা নিয়ে গেলাম আপনার মত মা জন্ম জন্ম যেন পাই । মাগো আমার শুধু মনে হয় যে আপনি আমার জন্য চিন্তা করিয়া পাছে শরীর নষ্ট করেন , তাহা যেন না হয় । তাহলে আমি শান্তি পাবো না । গনা , ভুজঙ্গ , খোকন , ডলি ও মেজদার খোকা এদেরকে দেখে আমাকে ভুলতে চেষ্টা করবেন এই আমার অনুরোধ । আপনি আমার শতকোটি ভুমিষ্ট প্রণাম গ্রহণ করিবেন । আমি তবে এবারের মত আসি মা । তোমার কোল হতে চির বিদায় নিয়ে চল্লাম । গীতাটি দিয়ে গেলাম ।” প্ৰণত আপনার স্নেহের – রামকৃষ্ণ রাত তখন শেষ প্রহর ঝনঝন করে লোহার দরজা খুলে গেল । ভিতরে ঢুকল একজন অফিসার ও সশস্ত্র পুলিশ । ‘প্রস্তুত ’ উত্তর এল ‘সম্পূর্ণ প্রস্তুত’ । মাথা উঁচু করে এগিয়ে চলল একটি কিশোর । সঙ্গে সশস্ত্র প্রহরীরা । প্রহরীদের মধ্যেও কেউ কেউ সকলের অগোচরে চোখের জল মুছল । ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে গিয়ে তুলল, ধর্মের নামে অভিনয় হল! তারপর একটি শব্দ ‘খট’। ‘মা-মাগো’ শেষ কথা । ২৫ অক্টোবর বৃহস্পতিবার ১৯৩৪ সাল, ভোর ৫টা ।

মেদিনীপুর সেন্ট্রাল জেলের উত্তর-পশ্চিম দিকে বাগানের মধ্যে জ্বলে উঠল চিতা । বিপ্লবী রামকৃষ্ণ রায়ের নশ্বর দেহ আগুনে ছাই হয়ে গেল । কিন্তু তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনে নিজের জীবন উৎসর্গ করে ইতিহাসের পাতায় নিজেকে অমর করে গেলেন । ১৯৩৪ সালে ২৫ শে অক্টোবর মেদিনীপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসি হল রামকৃষ্ণ ও ব্রজকিশোরের । পরের দিন ফাঁসি হল নির্মলজীবন ঘোষের । রামকৃষ্ণের মা ফাঁসির খবর পেয়ে একটি মাত্র কথা বলেছিলেন – “এই তিন জনকে মেরেও ইংরেজ তোমাদের রাজত্ব থাকবে না ”।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
Brinda Chowdhury
সংবাদ প্রতিনিধি

Brinda Chowdhury

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।