ডেস্ক রিপোর্ট: একাত্তর সালের এইদিনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম নৌবহর বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. হেনরি কিসিঞ্জারের পরামর্শে এই নৌবহর প্রেরণ।
ইয়াহিয়া খান ও তাদের পশ্চিমা মিত্ররা ভেবেছিল এই সপ্তম নৌবহর আসার কথা শুনে যৌথবাহিনীর মনোবল ভেঙ্গে যাবে। সেই সুযোগে একবারে শেষ লগ্নে চরম আঘাত হেনে বাঙালির মুক্তি সংগ্রামকে তছনছ করে দেওয়া যাবে। কিন্তু ঘটনা হয়ে যায় উল্টোটি। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে এই কথা জেনে মুক্তিযোদ্ধারা আরো প্রবলভাবে বিপুল উৎসাহে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েন।
সেদিন বাংলাদেশের পক্ষে তৎকালীন পৃথিবীর অন্যতম পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন আমেরিকার সপ্তম নৌবহর পাঠানোর সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানায় এবং এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের হুমকি দেয়। ফলে সপ্তম নৌবহরের যাত্রা শুরু হওয়ার পরই থেমে যায়।
এদিনে জাতিসংঘের অধিবেশনে প্রতিনিধিত্বকারী পাকিস্তানী দলের নেতা মাহমুদ আলী দেশে ফিরে এসে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সঙ্গে দেখা করেন। পরে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, সোভিয়েত ইউনিয়নের উচিত বিশ্ব শান্তির প্রতি গুরুত্ব দিয়ে ভারতের পাশ থেকে সরে দাঁড়ানো। অপরদিকে চীন ও আমেরিকার সমর্থনের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বলেন, `পাকিস্তান তাদের নির্ভীক ও ঐতিহাসিক সমর্থনের জন্য অত্যন্ত কৃতজ্ঞ।`
এদিকে মুক্তাঞ্চলের সংখ্যা আরও বাড়তে থাকে। এই দিন মুক্ত হয় কুমিল্লার দাউদকান্দি। এরপর শুরু হয় মেঘনা তীরের অঞ্চলগুলো মুক্তির প্রক্রিয়া। দিন না পার হতেই শত্রুমুক্ত হয় মেঘনার পুরো পূর্বাঞ্চলসহ বিস্তীর্ণ এলাকা। একই দিনে স্বাধীন দেশের পতাকা ওড়ে গাইবান্ধা, গাজীপুরের শ্রীপুর, ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ ও নেত্রকোনায়।
সেদিন এ সময় দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কার্যত বন্ধই ছিল। তারপরও এক সরকারি ঘোষণায় বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজসহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভারতীয় হামলার অজুহাত দেখিয়ে বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
৯ ডিসেম্বর সকালে নেত্রকোনা সরকারি কৃষি খামার এলাকায় দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মুখ যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। এর আগে ৮ ডিসেম্বর রাতে ক্যাপ্টেন চৌহানের নেতৃত্বাধীন ভারতীয় মিত্রবাহিনীর এক প্লাটুন সৈন্য নেত্রকোনা শহর ঘিরে ফেলে। ৯ ডিসেম্বর রাত প্রায় নয়টায় একদল মুক্তিযোদ্ধা কৃষি খামারের ভিতরে অবস্থান নেয় এবং মুক্তারপাড়া সেতু এলাকায় টহলরত পাকিস্তান বাহিনীকে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ শুরু করে। ঘটনা রূপ নেয় পাল্টাপাল্টি যুদ্ধে। একঘন্টা তুমুল যুদ্ধের পর হার মানে পাকিস্তান বাহিনী। পরাজিত হানাদাররা নেত্রকোনা থেকে ময়মনসিংহের দিকে পালিয়ে যায়।
১৯৭১ সালের ৯ ডিসেম্বর ঢাকায় অবিরাম বৃষ্টি হচ্ছিল, ভারতীয় সেনাবাহিনীর চিফ অব জেনারেল স্টাফ জেনারেল এস এ এম মানেকশ অল ইন্ডিয়া রেডিও এবং লিফলেটের মাধ্যমে বাংলাদেশ দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর প্রতি আধাঘন্টা পর পর আত্মসমর্পণের অনুরোধ জানান। প্রাথমিকভাবে পাকিস্তানি বাহিনীও পরিনামের চিন্তায় একবার যুদ্ধবিরতির কথা ভেবেছিল। ঢাকাস্থ আমেরিকান কনস্যুলেটের মাধ্যমে বার্তাটি দেয়া হয়।
অপরদিকে, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান পাকিস্তানে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত জোসেফ ফারল্যান্ডকে জানান, পাকিস্তানি সেনারা আত্মসমর্পণ করার জন্য প্রস্তুত কিন্তু তারা একটি যুদ্ধবিরতির পক্ষে।





