নিখিল হত্যাকাণ্ড ও অতপর . . . . . .

টাঙ্গাইল প্রতিনিধি: গত ৩০ এপ্রিল, ২০১৬ শনিবার। দুপুরে টাঙ্গাইলের গোপালপুর শহরের ডুবাইল বাজারে নিজের দোকানে কাজ করছিলেন দর্জি নিখিল চন্দ্র জোয়ার্দ্দার। তখন মোটরসাইকেলে এসে তিন দুর্বৃত্ত তাকে ডেকে দোকানের সামনে প্রকাশ্যে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে দ্রুত পালিয়ে যায়।

দুর্বৃত্তরা একটি মোটরসাইকেলে করে পাকুটিয়া-সুতিকালীবাড়ী সড়ক দিয়ে এসে নিখিলকে হত্যা করে সুতিকালীবাড়ী সড়কের দিকে পালিয়ে যায়। তিনজনের মধ্যে একজনের মাথায় হেলমেট ছিল। বাকিরা খালি মাথায় থাকলেও তাদের কাউকে আশপাশের কেউ চিনতে পারেনি। হত্যাকাণ্ডের পর জঙ্গি সংগঠন আইএস এই হত্যার দায় স্বীকার করে।

হত্যাকাণ্ডের পাঁচ মাসের মধ্যে এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে পুলিশ প্রথমে তিনজনকে আটক করে। দিন যাওয়ার সাথে সাথে এই ঘটনার মূল রহস্য উন্মোচিত হতে থাকে। এক পর্যায়ে পুলিশ এ ঘটনায় জড়িত জামায়াতুল মুজাহিদীন (জেএমবি) এর সক্রিয় সদস্য ও হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড মোসলেম উদ্দিন ওরফে সোহেল (২২)কে গ্রেফতার করেন। এতদিন পেরিয়ে গেলেও মামলার অগ্রগতি সম্বন্ধে পুলিশের পক্ষ থেকে নিখিলের পরিবারকে কোন তথ্যই জানানো হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন তারা।

ঘটনার স্থান –
টাঙ্গাইল জেলা সদর থেকে ৪৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ডুবাইল বাজার। বাজারের মোড় থেকে সুতিকালিবাড়ি এলাকার দিকে যাওয়া সড়কের ১০০ গজ দূরেই নিখিলের বাড়ি অবস্থিত। বাড়ির সামনেই নিজ ভিটার মধ্যে তাঁর দর্জির দোকান। সেই দোকানের সামনেই গত ৩০ এপ্রিল শনিবার দুপুর ১২টায় নিখিলকে কুপিয়ে হত্যা করে মোটরসাইকেল নিয়ে চলে যায় তিন দুর্বৃত্ত।

ঘটনার সূত্র (প্রমাণিত হয়নি) –
নিহত দরজি নিখিল জোয়ার্দ্দারের বড় মেয়ে কবিতা রানিদের ধারণা, চার বছর আগে দাড়ি ও ধর্ম নিয়ে কটূক্তির যে অভিযোগ উঠেছিল, সেটার জের ধরেই তাঁর বাবাকে হত্যা করেছে উগ্রপন্থীরা। ২ মে, ২০১৬ সোমবার বিকেলে টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার ডুবাইল গ্রামে নিখিলের বাড়িতে কথা হচ্ছিল কবিতার সঙ্গে। ২০১২ সালে তাঁর বাবার বিরুদ্ধে দাড়ি নিয়ে কটূক্তির যে অভিযোগ উঠেছিল, সেটা ষড়যন্ত্র ছিল বলে দাবি করেন কবিতা। তিনি বলেন, ওসব কিছু বলেন নাই। ষড়যন্ত্র কইরা ওসব কথা প্রচার করেছিল তারা। আর এত দিন পর মাইরা চইলা গেল। পরবর্তীতে এই মামলায় গ্রেফতারকৃত আসামি গোপালপুরের শাখারিয়া গ্রামের মোসলেম উদ্দিন জানান, ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করার কারণেই তারা (জেএমবি) নিখিলকে হত্যা করেছে।

নিখিলের বিরুদ্ধে ধর্ম নিয়ে কটূক্তির যে অভিযোগ ছিল –
এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০১২ সালের ২৯ এপ্রিল চান মিয়ার দোকানের সামনে নিখিল দাড়ি নিয়ে কটূক্তি করেছেন বলে অভিযোগ তোলেন এলাকার মো. সুজন মিয়া, মো. আবদুস ছালাম ও মো. ফেরদৌস। এ কথা ছড়িয়ে পড়লে এলাকাবাসী জড়ো হয়ে নিখিলকে মারধর এবং তাঁর দোকান ও বাড়ি ভাঙচুর করে। পরদিন নিখিলকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। দুই দিন পর ২ মে নিখিলের বিরুদ্ধে মামলা করেন আমিনুল ইসলাম। ওই বছরের ২১ মে নিখিলের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। পরে স্থানীয় লোকজনের হস্তক্ষেপে বাদী মামলাটি প্রত্যাহার করে নেন। ২৪ দিন হাজতে থাকার পর জামিনে বেরিয়ে আসেন নিখিল। তাঁর ভাতিজা টুটন চন্দ্র জোয়ার্দ্দার বলেন, জামিন পাওয়ার পর কাকা ঘাটাইলে তাঁর শ্বশুরবাড়িতে অবস্থান করেন। পরে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে এলাকায় ফিরে আসেন। নিখিলের একাধিক প্রতিবেশী বিভিন্ন গণমাধ্যমকে বলেন, জামিন পাওয়ার কদিন পর নিখিলের দোকানের শাটারে কে বা কারা নীল কালিতে লিখে রাখে, আদালত তোমাকে জামিন দিলেও আমরা তোমাকে জামিন দেব না।

মামলার এফআইআর –
ঘটনার পরের দিন দর্জি নিখিলের স্ত্রী আরতি রাণী জোয়ার্দ্দার বাদী হয়ে অজ্ঞাত তিনজনকে আসামি করে গোপালপুর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। বিস্ফোরক দ্রব্য বহন ও প্রয়োগ সংক্রান্ত আরেকটি মামলা দায়ের করে গোপালপুর থানার এসআই মোকছেদুল আলম। দুটি মামলাই তদন্ত করছে টাঙ্গাইল গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

ঘটনা পরবর্তী পারিপার্শ্বিক অবস্থা –
মঙ্গলবার দর্জি নিখিলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় সুনশান নীরবতা। বাড়িতে মোট ৪টি থাকার ঘরে ঝুলছে তালা। ওই বাড়িসহ আশপাশ দিয়ে লোকজনের চলাচল নেই বললেই চলে। ডুবাইল বাজার এলাকায় জঙ্গি আতঙ্কে অনেক ব্যবসায়ীরা দোকান বন্ধ করে দিয়েছে।
এ ব্যাপারে স্থানীয় ব্যবসায়ী খলিল মিয়া বলেন, নিখিলের হত্যাকারী ধরা পরলে আমাদের মনে স্বস্তি ফিরে আসবে।
স্থানীয় বাসিন্দা মহিদুল ইসলাম বলেন, এ ঘটনার পর থেকেই বাজারে লোকজন সমাগম কমে গেছে। আইএস দায় স্বীকার করায় এ আতঙ্ক আরও বেড়ে গেছে।

আলামত –
পুলিশ জানায়, হত্যাকাণ্ডের স্থান থেকে কিছু দূর থেকে একটি রক্তাক্ত শার্ট উদ্ধার করে পুলিশ। এছাড়া ডুবাইল বাজার থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার পশ্চিম দিকে গোপালপুর উপজেলার সুতী কালীবাড়ি অটো রাইচমিলের পাশের একটি ঝোঁপ থেকে উদ্ধার করা হয় রক্ত মাখা একটি চাপাতি। পুলিশের ধারণা, নিখিল হত্যাকাণ্ডের সময় তার রক্ত খুনির শার্টে লেগেছিল এবং যে চাপাতি দিয়ে তাকে হত্যা করা হয়েছে সেই চাপাতি খুনিরা ফেলে গেছে। রক্ত মাখা চাপাতি ও রক্তাক্ত শার্ট ডিএনএ পরীক্ষার জন্য গত ৯ মে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।

মামলা সম্পর্কে গোয়েন্দা পুলিশের বক্তব্য –
টাঙ্গাইল জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) অশোক কুমার সিংহ জানান, নিখিল হত্যা মামলায় জড়িত মোসলেম উদ্দিন গ্রেফতার হয়েছে। সে আদালতে স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দিতে জানিয়েছেন, ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করার কারণেই জেএমবির সিদ্ধান্তে নিখিলকে হত্যা করা হয়। এ সময় তার সাথে এই হত্যাকাণ্ডে সিরাজগঞ্জের মতিয়ার ওরফে হৃদয় এবং পঞ্চগড়ের নজরুল ওরফে বাইক নজরুল অংশ নেয়। বাইক নজরুল পুলিশের সাথে বন্দুক যুদ্ধে রাজশাহীতে নিহত হয়েছে। মতিয়ারকে গ্রেফতারের চেষ্টা এবং মামলার তদন্ত কাজ চলছে।

নিখিল জোয়ার্দ্দারের মেয়ের অভিযোগ –
নিহত দরজি নিখিল জোয়ার্দ্দারের বড় মেয়ে কবিতা রানি দে অভিযোগ করে বলেন যে, তার বাবার সাথে ষড়যন্ত্র করা হয়েছে, ষড়যন্ত্র করে তার বাবাকে মারা হয়েছে। তিনি বলেন, চার বছর আগে দাড়ি ও ধর্ম নিয়ে কটূক্তির যে অভিযোগ উঠেছিল, সেটার জের ধরেই তার বাবাকে হত্যা করেছে উগ্রপন্থীরা। নিখিলের বাড়িতেই কথা হয়েছে কবিতার সঙ্গে। ২০১২ সালে তাঁর বাবার বিরুদ্ধে দাড়ি নিয়ে কটূক্তির যে অভিযোগ উঠেছিল, সেটা ষড়যন্ত্র ছিল বলে দাবি করেন কবিতা। তিনি বলেন, ওসব কিছুই বলেন নাই বাবা। ষড়যন্ত্র কইরা ওসব কথা প্রচার করেছিল তারা। আর এত দিন পর মাইরা চইলা গেল। এত দিন ঝিম মাইরা আছিল।

পরিবারের বর্তমান অবস্থা –
নিখিলরা চার ভাই। একই ভিটার মধ্যে পাশাপাশি চারটি টিনের ঘর। নিখিল দ্বিতীয়। দুই ভাই আরও আগে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। অন্য ভাই মানসিক রোগে আক্রান্ত। চারটি পরিবারের দেখাশোনা করতেন নিখিল। তাঁর খুন হওয়ার পর তাদের বাড়িতে কিছুদিন পুলিশ প্রহরা ছিল। পরে তা প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। পুলিশ প্রত্যাহারের পর নিরাপত্তাহীনতার কারণে নিখিলের স্ত্রী ও তার ভাইয়েরা বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে।

নিখিলের স্ত্রী যা বলেন –
মামলার বিষয়ে আমি বা আমরা কেউ কিছু জানিনা। আমাদের সাথে কেউ যোগাযোগ করেনা। আমরা টেলিভিশন, পত্র-পত্রিকা ও মানুষের মুখে শুনেছি যে, আরো একজন খুনিকে ধরেছে পুলিশ। তার বর্তমান অবস্থানের কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি অসহায়, আমার স্বামী নেই, আমার দুটি মেয়ে, ছেলে সন্তান নেই। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম যে ছিল তাকে তো ওরা মেরে ফেলেছে। বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পরেন নিখিল জোয়ার্দ্দারের স্ত্রী আরতী রানী।

তিনি আরো বলেন, আমি আমার নিজ বাড়িতে থাকতে পারিনা, আমাকে ভাইয়ের বাড়িতে আশ্রিতা হিসেবে থাকতে হচ্ছে। আমার কোন অভিবাবক নাই। ঘটনার পর থেকেই আমি ও আমার স্বামীর অন্য তিন ভাই ভোলানাথ, অখিল ও গোপালের পরিবারের সবাই বাড়ি থেকে পালিয়ে রয়েছি।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
admin
সংবাদ প্রতিনিধি

admin

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।