দীর্ঘ ১৮ বছর ভিক্ষা বৃত্তির পর দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মেহেরপুরের মকর উদ্দিন এখন বাঁশের ঝুড়ি বানানোর কারিগর

মেহের আমজাদ, মেহেরপুরঃ দীর্ঘ ১৮ বছর মানুষের দ্বারে দ্বারে হাত পেতে ভিক্ষা করেছেন মেহেরপুর সদর উপজেলার রাজাপুর গ্রামের দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মকর উদ্দিন। কিন্তু ভিক্ষার হাত যে বড় লজ্জার, বড় কষ্টের তা বুঝতে পেরে ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে বাঁশের ঝুড়ি বানিয়ে রোজগার করছেন। এখন তিনি বাঁশের ঝুড়ি বানানোর কারিগর এবং একজন কর্মঠ মানুষ হিসেবে এলাকায় পরিচিতি পেয়েছেন।

মেহেরপুর সদর উপজেলার রাজাপুর গ্রামের বৃদ্ধ মকর উদ্দিন-এর বয়স যখন দেড় বছর তখন হামে আক্রান্ত হন। হামের কারণে দু’চোখের দৃষ্টি হারান তিনি। অন্ধত্ব বরণ করায় তিনি সংসারের বোঝা হয়ে দাঁড়ান। বাবা-মা মারা যাওয়ার পর তিনি ভিক্ষার ঝুলি তুলে নেন কাঁধে। ১৯৪৭ সালে জন্মগ্রহণ করার পর দেড় বছরে অন্ধত্ব বরন করায় ভিক্ষা ছাড়া তার করার কিছু ছিলনা। তাই ১৯৫৫ সাল থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত টানা ১৮ বছর ভিক্ষা করেন। কিন্তু ভিক্ষার হাত বড় লজ্জার, বড় কষ্টের তা বুঝতে পারেন তিনি। ১৯৭৪ সালের পর ভিক্ষা বৃত্তি ছেড়ে হাতে তুলে নেন ধারালো অস্ত্র। নিজ হাতে বাঁশ কাটেন। এরপর চটা তুলে সুন্দর করে চেঁছে-ছিলে ঝুড়ি বোনেন। যা দেখে মনে হবে একজন নিপুন কারিগরের কাজ। একদিন বাঁশ কেটে সাইজ করেন, একদিন চটা তোলেন, একদিন ঝুড়ি বোনেন, একদিন সেগুলো সুন্দর করে বাঁধায় করেন। এরপর তৈরি ঝুড়িগুলো একটি বাঁকে ঝুলিয়ে লাঠি হাতে করে বেরিয়ে পড়েন বিক্রি করতে।

নিজ গ্রাম রাজাপুর, গোভীপুর, যাদবপুর, দারিয়াপুর ও মেহেরপুর শহরে ফেরি করে বিক্রি করে বাড়ি ফেরেন। যা দেখে অনেকেই বিস্ময় বোধ করে। মানুষের অবহেলা ও অপমান সইতে না পেরে প্রতিবেশি চতুর আলীর নিকটে বাঁশের ঝুড়ি বানানো শেখার পর ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে দেন। বর্তমানে তার ৬৮ বছর বয়স। এ বয়সে তিনি কাজ ছাড়া কিছু বোঝেন না। মাসে তার অন্তত আড়াই হাজার টাকা আয় করা চাই। সংসার জীবনে ২ ছেলে জুয়াদ আলী, ওহাব আলী ও ৩ মেয়ে হাচেনা খাতুন, বাচেনা খাতুন, আচেনা খাতুনের জনক তিনি। বাবার রেখে যাওয়া দুই বিঘা জমি বিক্রি করে তিন মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। জুয়াদ আলী রাজমিস্ত্র ও ওহাব আলী সবজি ব্যাবসা করেন। এখন ছেলেদের আয়ের সাথে তিনিও মাসে আড়াই হাজার টাকা আয় করেন যা দিয়ে তাদের সংসার ভালই চলছে। মকর উদ্দীন এখন এলকায় বাহ্যিক দৃষ্টিতে অন্ধ হলেও এলাকার একজন আলোকিত ব্যাক্তি। অনেকেই নতুন প্রজন্মদের বলেন জীবনে কিছু শিখতে হলে মকরউদ্দীনের মত সংগ্রাম করে শিখতে হবে। তাহলেই দেশ, সমাজ, জাতি ও পরিবারে সাফল্য আসবে।

মকর উদ্দিনের বড় ছেলে জোয়াদ আলী জানান, তারা যখন ছোট ছিল তখন ভিক্ষা করে অতি কষ্টে তাদের মানুষ করেছেন। এখন তিনি ভিক্ষা ছেড়ে নিজেই কাজ করেন। যা দিয়ে তাদের সংসারের বাজার খরচ হয়। তাদের আয় আর বাবার আয় দিয়ে সংসার ভালই চলছে। বড় পুত্রবধূ অঞ্জনা খাতুন বলেন, তার শ্বশুর অন্ধ হলেও একজন দৃষ্টি সম্পন্ন মানুষের মত বাঁশ কাটা, চটা তোলা, চাঁচা-ছিলা এবং ঝুড়ি বোনানো দেখে অনেকেই অবাক হয়। তার কাজ করা দেখে মনে হবে না সে অন্ধ। ঝুড়ি বোনানোর পর একটি সাইকেলের কাটা চেন আছে, তা দিয়ে মেপে দেখবে ঠিক সাইজ মত বোনা হলো কিনা। তার অভিমত আমাদের দেশে যত লোক ভিক্ষা করে তাদের বেশিরভাগ কাজ করে খেতে পারে। তার মত ভিক্ষাকে ঘৃনা করে কাজ করলে পরিবার, সমাজ তথা দেশের উন্নয়ন হবে। কমবে বেকারত্বের সংখ্যা সচ্ছল হবে দেশের অর্থনীতি ।

গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আক্কাস আলী বলেন মকরউদ্দীন এখন কারো নিকটে হাত পাতেনা। খেতে না পেলেও কারো কাছে কিছু চাইবেনা। ৭১ সালে অন্ধ ব্যাক্তি হয়েও তথ্য উপাত্ব দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করেছেন। সে আমার সমবয়সি। অন্ধ না হলে তিনিও মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতেন। তিনি আমার নিকটে যুদ্ধে যাবার আশাবাদ ব্যাক্ত করতেন।

মেহেরপুর সদর উপজেলা চেয়ারম্যান মারফ আহাম্মদ বিজন বলেন, মকর উদ্দীনের কথা শুনে অবাক হচ্ছি। এমন ব্যাক্তির জন্য কিছু করতে পারলে নিজের খুব ভাল লাগবে। আমি খোজ নিয়ে আমার সামর্থের মধ্যে তার জন্য কিছু করার চেষ্টা করব।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
admin
লেখক / প্রতিবেদক

admin

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।