কথায় আছে, নামে নামে জমে টানে। এই অবস্থা এখন বরিশালের গৌরনদী উপজেলার সরিকল গ্রামের প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলামের। জীবদ্দশায় পেশায় রিকশাচালক এই বীর মুক্তিযোদ্ধা স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহন করে পেয়েছিলেন বীরত্বের স্বীকৃতি এবং রাষ্ট্রীয় সম্মান। পেয়েছিলেন ভাতা সহ যাবতীয় সুবিধাদি।
২০২০ সালে সরিকলের মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম মৃত্যুবরন করেন। উপজেলা প্রশাসন থেকে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়।
নিয়তির নির্মম পরিহাস, তার মৃত্যুর পরপরই গেজেট ও সনদ নিয়ে শুরু হয় কাড়াকাড়ি। অন্য এক নুরুল ইসলাম নিজেকে প্রয়াত নুরুল ইসলামের গেজেট এবং সনদের দাবীদার হয়েছেন।
এনিয়ে প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধার ছেলে মো. নাসিরের আবেদনের প্রেক্ষিতে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের তদন্তে নতুন দাবীদার নুরুল ইসলাম নিজেকে “মুক্তিযোদ্ধা নন” স্বীকার করেছেন।
পরবর্তীতে আবার পূর্বের দাবীতে ফিরে গেছেন। এতে সে সফলও হয়েছেন। বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধা ভাতাও তুলছেন।
প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধার ছেলে দিনমজুর মো. নাসির বলেন, আমার বাবা একজন প্রকৃত বীর মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তিনি গেজেটভুক্ত হওয়ার পর থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ভাতা পেয়েছেন। গেজেট নং-৩৪৯৩।
জীবদ্দশায় তিনি মুক্তিযোদ্ধা একাউন্টের বিপরীতে ঋণও নিয়েছেন। ২০২০ সালের ১৭ আগস্ট আমার বাবা মৃত্যুবরন করেন। তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়েছে। মৃত্যুর আগে তিনি ঋন পরিশোধ করে যেতে পারেননি।
তিনি আরো বলেন, আমার বাবা প্রয়াত নুরুল ইসলামের বেসামরিক গেজেটে তার বাবার নাম (অর্থাৎ আমার দাদার নাম) আমজাদ আলী হাওলাদারের পরিবর্তে মোসলেম উদ্দিন মুন্সী আসে।
২০০৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর দাদার নাম সংশোধনের জন্য মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর আবেদন করেন বাবা। তবে সংশোধন হয়নি।
এরপর ২০১৮ সালের ২৯ মার্চ তারিখে আবার একই আবেদন করেন। এসব আবেদনে সাড়া দেয়নি মন্ত্রণালয়। এসব ভুল নিয়েই উত্তোলণ করেছেন ভাতা। এরইমধ্যে এমআইএস সৃজনের নির্দেশনা আসলে অন্য সহযোদ্ধাদের সঙ্গে ২০২০ সালের ১ আগস্ট এমআইএস সৃজনের আবেদন করেন। কিন্তু ১৭ আগস্ট তিনি ইন্তেকাল করেন। তাকে গার্ড অব অনারসহ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়।
মুক্তিযোদ্ধার পুত্র নাসির অভিযোগ করে বলেন, বাবার মৃত্যুর পর ২০২০ সালের ২৯ আগস্ট সংশ্লিষ্ট এমআইসের কাগজ উত্তোলন করি এবং আমার নামে সোনালী ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট করা হয়। ওই একাউন্ট থেকে ভাতার টাকাও উত্তোলণ করেছি।
২০২১ সালে এমআইএস সংশোধন চেয়ে আবেদন করি। আবেদন করতে গিয়ে এমআইএসে দেখতে পাই আমার বাবার ছবির পরিবর্তে অন্য একজনের ছবি।
পরবর্তীতে জানতে পারি আমার বাবার ছবির স্থানে অন্য ছবির ব্যক্তির নামও নুরুল ইসলাম। তার বাড়ি মুলাদী উপজেলার গাছুয়া এলাকায়।
অভিযোগ করে নাসির আরও বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে হোসনাবাদ এলাকার কতিপয় দুষ্টুচক্র এবং সরকারি কয়েকজন কর্মচারীর যোগসাজসে আমার বাবার গেজেট নাম্বার দিয়ে মুলাদীর নুরুল ইসলামকে মুক্তিযোদ্ধা বানানোর জন্য উঠেপড়ে লাগে।
এনিয়ে আমি মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ করেছি। তৎকালীণ উপজেলা নির্বাহী অফিসার বিপিন চন্দ্র বিশ্বাস তার কার্যালয়ে বসে তদন্ত করেছেন।
তদন্তে উপজেলা নির্বাহী অফিসার এবং উপস্থিত মুক্তিযোদ্ধাদের সামনে মুলাদীর নুরুল ইসলাম মুচলেকা দিয়ে মুক্তিযোদ্ধার ভাতা ত্যাগ করেছে। সে নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা দাবী করবেনা বলেছে। কিন্তু তদন্ত হওয়ার কয়েকদিন পরই আবার সেই দুষ্টুচক্রের সহায়তায় আমার বাবার গেজেট দিয়ে মুলাদীর নুরুল ইসলাম নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দাবী করে।
এতে সে সফলও হয়। বর্তমানে তার নামে ভাতা চালু হয়েছে।
অভিযোগ করে নাসির বলেন, প্রথমবার আবেদন করার পর উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয় থেকে প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে সারা দেয়নি মন্ত্রণালয়।
এনিয়ে আমি মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করলে আমাকে আবার পূনঃতদন্তের জন্য আবেদন করতে বলা হয়।
২০২৫ সালে আমি পূনঃতদন্তের জন্য আবেদন করি। সেই আবেদনের প্রেক্ষিতে উপজেলা নির্বাহী অফিসার এক পত্রের মাধ্যমে বিষয়টি তদন্তের জন্য গৌরনদী সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে দায়িত্ব প্রদান করেন।
তাদেরকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়ার ১০ মাস অতিবাহিত হয়েছে। তবে রহস্যজনক কারনে তদন্ত কাজ শুরু হয়নি। এনিয়ে আমি এসিল্যান্ড স্যারের কাছে বহুবার গিয়েছি। তিনি তদন্ত না করে আমাকে আদালতে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
নাসির বলেন, আমি ট্যানারিতে কাজ করে সামান্য উপার্জন দিয়ে কোনমতে পরিবারের ভরনপোষন চালাই। আদালতে গেলে টাকা লাগে আমি সেই টাকা কোথায় পাবো।
একজন প্রকৃত বীর মুক্তিযোদ্ধার সম্মান রক্ষায় তিনি (মুক্তিযোদ্ধাপুত্র) তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী এবং বরিশাল-১ আসনের সংসদ সদস্য জহির উদ্দিন স্বপন সহ মুক্তিযেদ্ধা মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
এদিকে প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা পুত্র নাসিরের অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সরিকল এলাকার কমপক্ষে ৫ জন মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নাসিরের বাবা প্রয়াত নুরুল ইসলাম একজন রণাঙ্গনের প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা।
মুলাদীর নুরুল ইসলাম গৌরনদীতে কোথাও যুদ্ধ করেছেন বলে তাদের জানা নেই। সে মুলাদী উপজেলার বাসিন্দা হয়েও অন্যের গেজেট ব্যবহার করে কিভাবে মুক্তিযোদ্ধা হয়েছেন বিষয়টি খতিয়ে দেখতে সংশ্লিষ্টদের প্রতি তারা আহবান জানান।
সরিকল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফারুক হোসেন মোল্লা বলেন, সরিকল গ্রামের প্রয়াত নুরুল ইসলাম (নাসিরের বাবা) একজন প্রকৃত বীর মুক্তিযোদ্ধা।
অপরদিকে জীবিত নুরুল ইসলামের বাড়ি মুলাদী উপজেলার গাছুয়া এলাকায়। তিনি এ এলাকায় যুদ্ধ করেছেন বলে কখনো শুনিনি। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধার ছেলে নাসিরের সব অভিযোগ অস্বীকার করে নতুন বীর মুক্তিযোদ্ধা দাবিদার নুরুল ইসলাম বলেন, আমি প্রকৃত বীর মুক্তিযোদ্ধা। আমি অন্য কারো গেজেট ব্যবহার করে মুক্তিযোদ্ধা হই নাই। আমার গেজেট দিয়ে অন্য একজন ভাতা উত্তোলন করতো।
হাইকোর্টে রিট করার পর এখন আমি আমার মুক্তিযোদ্ধা ভাতা উত্তোলন করতেছি। গৌরনদী উপজেলার সাবেক ইউএনও’র কাছে মুচলেকা দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি তা এড়িয়ে যান এবং এ প্রতিবেদকের সঙ্গে দেখা করার কথা বলে ফোন কেটে দেন।
১০ মাসেও তদন্ত রিপোর্ট না দেওয়ার বিষয়ে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মেহেদী হাসানের মুঠোফোনে কল দেওয়া হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এমনকি হোয়াটসঅ্যাপে ম্যাসেজ দিলেও সারা দেননি।
এবিষয়ে উপজেলা কৃষি অফিসার মো. সেকেন্দার শেখের কাছে মুঠোফোনে জানতে চাইলে তিনি কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তবে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. ইব্রাহীম জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত কেন তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়নি তা খতিয়ে দেখে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


