শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রা কি?

শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রা কি?
জগন্নাথদেবের রথযাত্রার তাৎপর্য

পদ্মপুরানের বর্ণনা অনুযায়ী শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রা উৎসব। আষাঢ় মাসের শুক্ল দ্বিতীয়ায় বলরাম ও বোন সুভদ্রার সঙ্গে তিনটি সুসজ্জিত রথে চেপে মাসির বাড়ি যাওয়াই জগন্নাথদেব রথযাত্রা উৎসব। শ্রীশ্রী জগন্নাথদেব মাসিবাড়ী অর্থাৎ রাজা ইন্দ্রদ্যুন্মের পত্নী গুণ্ডিচার বাড়ী সাতদিন থেকে পোঙা পিঠা খেয়ে আবার বাড়ির পথে ফিরে আসার দিনটি শ্রীশ্রী জগন্নাথাদেবের উল্টো রথ বা পুনর্যাত্রা নামে পরিচিত এবং এর মাধ্যমে এ উৎসবের সমাপ্তি হয়। রথযাত্রা

উপনিষদের বর্ণনা অনুযায়ী  শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রাঃ

কঠোপনিষদে বলা হয়েছে- আত্মানং রথিনং বিদ্ধি শরীরং রথমেব তু। বুদ্ধিং তু সারথিং বিদ্ধি মন: প্রগ্রহমেব চ।। (১/৩/৩)

এই দেহই রথ আর আত্মা দেহরূপ রথের রথী। আর ঈশ্বর থাকেন অন্তরে। রথ যাত্রার রূপক অর্থ কিন্তু এমনই। যাহোক তিনি আমাদের অন্তরে থাকেন। তাঁর কোন রূপ নেই। তিনি সর্বত্র বিরাজিত অর্থাৎ- ঈশাব্যাসমিদং।

বেদ বলছে, আবাঙমানসগোচর, মানে মানুষের বাক্য এবং মনের অতীত। আমরা মানুষ তাই তাকে মানব ভাবে সাজাই। এ বিষয়ে কৃষ্ণ যজুর্বেদিয় শ্বেতাশ্বতর উপনিষদের তৃতীয় অধ্যায়ে বলা হয়েছে-

অপাণিপাদো জাবানো গ্রহীতাপশ্যত্যচ ক্ষুঃ স শৃণোত্যকর্নঃ।

স বেত্তি বেদ্যং ন চ তস্যাস্তি বেত্তাতমাহুরগগ্র্যং পুরুষং মহান্তম্।।

অনুবাদ: তার লৌকিক হস্ত নাই, অথচ তিনি সকল দ্রব্য গ্রহণ করেন। তাঁর পদ নাই অথচ সর্বত্রই চলেন। তাঁর চোখ নাই অথচ সবই দেখেন। কান নাই কিন্তু সবই শোনেন। তাঁকে জানা কঠিন, তিনি জগতের আদিপুরুষ। এই বামনদেব ই বিশ্বাত্মা, তাঁর রূপ নেই, আকার নেই ।

উপনিষদের এই বর্ণনার প্রতীকী রূই হল পুরীর জগন্নাথদেব। পুরাণ মানেই ধর্ম কথাকেই গল্পচ্ছলে বা রূপকের মাধ্যমে প্রচার। তাঁর পুরো বিগ্রহ তৈরি সম্ভব হয়নি- কারণ তাঁর রূপ তৈরিতে আমরা অক্ষম। শুধু প্রতীককে দেখান হয়েছে মাত্র। তাছাড়া ও আর একটি পৌরাণিক কাহিনী আছে সেটা হল ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ১২ বছর বয়সে বৃন্দাবন ত্যাগ করেন, তারপর তিনি আর বৃন্দাবনে আসেননি। কিন্তু একবার রথে করে পার্শ্ববর্তী গ্রামে এসেছিলেন বৃন্দাবনবাসিদের সাথে দেখা করতে। বৃন্দাবনবাসিরা কৃষ্ণকে প্রাণাধিক ভালবাসত তাই তাঁর বিরহে তাঁর প্রিয়জনদের অবস্থা দেখে কিছুক্ষণের জন্যে কৃষ্ণ বলরাম সুভদ্রা তিন জন নির্বাক হয়ে যান এই ভালবাসা দেখে। তখন তাঁদের অমূর্ত রুপ ফুটে ওঠে। এই রূপই বর্তমান জগন্নাথ দেবের রূপ।

আধ্যাত্মিক অর্থে (Spiritual Significance of the Chariot) রথ মানে কি?

রথ মানে চলমান দেহ বা শরীরের প্রতীক।  কঠ উপনিষদ-এ বলা হয়েছে:  “আত্মানং রথিনং বিদ্ধি, শরীরং রথমেব তু।” অর্থাৎ, আত্মা হল রথের আরোহী, শরীর হল রথ। এই রথ চলমান জীবনের প্রতীক। রথ মানে আমাদের শারীরিক দেহ, যা পাঁচ ইন্দ্রিয় দ্বারা চালিত হয়।

ঘোড়া কি?

ঘোড়া মানে জ্ঞান ইন্দ্রিয় (Sense Organs)।  রথে যুক্ত ঘোড়াগুলো পাঁচটি জ্ঞান ইন্দ্রিয়ের (চোখ, কান, নাক, জিহ্বা ও ত্বক) প্রতীক। যদি ঘোড়াগুলো নিয়ন্ত্রণহীন হয়, তবে রথ পথভ্রষ্ট হয় তেমনি মানুষের ইন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রণ না থাকলে কোন লক্ষ্যে পৌছানো সম্ভব নয় তাই ইন্দ্রিয়-নিয়ন্ত্রণই যেকোন সাধন কার্যের পথে প্রধান ধাপ।

সারথি কি?

রথের সারথি মানে আমাদের বিবেক/বুদ্ধি/জ্ঞান (Intellect)।  এটি আমাদের শরীরের ভিতরের আত্মাকে সঠিক পথে চালাতে সাহায্য করে। আমাদের শরীরের বিবেক যদি সঠিকভাবে কাজ না করে তবে স্মৃতিভ্রংশ হয়ে সৎ-অসৎ জ্ঞান শূন্য হয়ে অধঃপতনে পতিত হয়। আর  যদি বিবেক সক্রিয় হয়, তবেই মানুষ সৎ পথে সেবক হয়ে দেবত্বের পথে অগ্রগতি হয়।  আত্মা সহজেই মুক্তির পথে চলতে পারে।

দড়ি মানে কি?

দড়ি মানে হচ্ছে আমাদের শরীরের ভিতরের মন (Mind)। রশি যেদিকে টান পড়বে দেহ সেদিকে ধাবিত হবে। বুদ্ধি বা জ্ঞান হচ্ছে রথের সারথি। আর এই রথের রথি হচ্ছেন সয়ং ঈশ্বর। অর্থাৎ, মানব দেহে যেমন ঈশ্বর পরমাত্মা রুপে আছেন। দড়ি যদি নিয়ন্ত্রণ না রাখা যায় তবে রথের পথ ভ্রষ্ট হয় তেমনি দড়ি রুপী মন চঞ্চল হলে আমাদের শরীরের ইন্দ্রিয়গুলি পথচ্যুত হয়। মানুষ বিপদগামী হয়ে ধ্বংসের পথে চালিত হয়।

পথ কি?

পথ মানে ধর্ম মার্গ(Path of Dharma)। রথ যে পথে চলে, তা হল ধর্ম বা জীবনের সৎ পথ। এই পথে চলেই আত্মা তার পরম লক্ষ্য — পরমাত্মার সঙ্গে মিলন — অর্জন করে।

যাত্রা মানে কি?

জগন্নাথের রথযাত্রা মানে মানে  হচ্ছে আত্মার গমন(Soul’s Journey)।  আত্মা জড় দেহ থেকে চেতনের দিকে এগিয়ে যাওয়া। রথ নিলাচল (পুরী) থেকে গুণ্ডিচা মন্দিরে যাওয়া মানে, আত্মার অশুদ্ধতাকে পেরিয়ে শুদ্ধতায় পৌঁছানো।

দড়ি টানা কি?

শরীরের ভিতরস্থ আত্মাতে মন স্থির রেখে মূলাধার থেকে আজ্ঞাচক্রে আবার আজ্ঞাচক্র থেকে মূলাধারে মনকে চালিত করা। ঈশ্বরের কাছে টান ভক্তরা যখন রথ টানেন, তা যেন আত্মাকে ঈশ্বরের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন। এটা আত্মাতে মনস্থির রাখা বা সমর্পণ করাই আত্মসমর্পণ ও ভক্তির প্রতীক।

উপসংহার বলা যায়, রথ কেবল একটি বাহ্যিক অনুষ্ঠান নয়, বরং প্রতিটি মানুষের অন্তর্জগতের প্রতিচ্ছবি। আত্মা যদি বুদ্ধি ও মন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় এবং ইন্দ্রিয়গুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, তবে জীবন-রথ সঠিক পথে ঈশ্বরের দিকে অগ্রসর হয়।

যোগবিদ্যা কিংবা দেহ তত্ত্বের আলোচনায় এই রথ কে আমাদের দেহ রথের সাথে তুলনা করা হয়। রথ প্রস্তুত করা হয় ২০৬ টি কাঠ দিয়ে। যা মানব দেহের ২০৬ টি হাড়ের সাথে সামঞ্জস্য। অর্থাৎ রথ হচ্ছে আমাদের দেহ গাড়ি। এই রথে ১৬টি চাকা থাকে। এই ১৬টি চাকা হচ্ছে:-  ৫টি জ্ঞানেন্দ্রিয়, ৫টি কর্মেন্দ্রিয়, ৬টি রিপু।

মানুষের মধ্যে এই ১৬ টি ইন্দ্রিয় বিরাজ করে। এই ১৬ টি ইন্দ্রিয় কে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। নাহয় জীবনে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে যে কোন সময়। তাই এই ১৬ টি চাকা কে এই ১৬ ইন্দ্রিয়ের প্রতিক হিসেবে দেয়া হয়েছে।

অর্থাৎ দেহস্থ ইন্দ্রিয় ও একাদশ রুদ্রের নিয়ন্ত্রণ করাই এই রথযাত্রার উদ্দেশ্য।  একমাত্র শুদ্ধ খাবার ও যোগাভ্যাসের মাধ্যমেই দেহস্থ ইন্দ্রিয় ও বায়ুকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের পুনর্যাত্রা বা উল্টো রথযাত্রা আজ

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
Kishori
সংবাদ প্রতিনিধি

Kishori

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।