ঢাকা: আজ শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের পুনর্যাত্রা বা উল্টো রথযাত্রা। আষাঢ় মাসের শুক্ল দ্বিতীয়ায় মাসির বাড়ি (গুণ্ডিচা মন্দির) গমনের সাত দিন পর ভগবান জগন্নাথ, বড় ভাই বলরাম ও বোন সুভদ্রাকে নিয়ে নিজ মন্দিরে ফিরে আসবেন। এই পুনর্যাত্রার মধ্য দিয়েই সমাপ্ত হচ্ছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব রথযাত্রা।
বাংলাদেশের বিভিন্ন মন্দিরের পাশাপাশি রাজধানী ঢাকার স্বামীবাগ ইসকন মন্দির, ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির এবং অন্যান্য মন্দিরে দিনব্যাপী ধর্মীয় আচার, পূজা, কীর্তন, প্রসাদ বিতরণ ও শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়েছে।
রাজধানীর উল্টো রথযাত্রা দুপুর ১টা ৩০ মিনিটে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির থেকে শুরু হবে। শোভাযাত্রাটি পলাশী, জগন্নাথ হল, শহীদ মিনার, দোয়েল চত্বর, হাইকোর্ট এলাকা, গুলিস্তান, দৈনিক বাংলা মোড়, শাপলা চত্বর, ইত্তেফাক মোড় ও জয়কালী মন্দির হয়ে স্বামীবাগ আশ্রমে গিয়ে শেষ হবে। এতে হাজার হাজার ভক্তের অংশগ্রহণের প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, মাসির বাড়িতে সাত দিন অবস্থানের পর জগন্নাথদেবের নিজ মন্দিরে প্রত্যাবর্তনই পুনর্যাত্রা বা উল্টো রথযাত্রা। এটি ভক্তদের কাছে ঈশ্বরের করুণা, পুনর্মিলন এবং শুভ প্রত্যাবর্তনের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।
জগন্নাথদেবের হাত-পা বিহীন বিগ্রহ বহু যুগ ধরে ভক্ত ও গবেষকদের আগ্রহের বিষয়। উপনিষদ ও বৈদিক দর্শনে ঈশ্বরকে নিরাকার, সর্বব্যাপী ও মানব-ইন্দ্রিয়ের ঊর্ধ্বে হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। সেই দর্শনের প্রতীক হিসেবেই জগন্নাথদেবের বর্তমান রূপকে ব্যাখ্যা করা হয়।
শ্বেতাশ্বতর উপনিষদে বলা হয়েছে— ঈশ্বরের দৃশ্যমান হাত-পা না থাকলেও তিনি সর্বত্র গমন করেন, সব দেখেন এবং সব শোনেন। জগন্নাথদেবের বিগ্রহ সেই আধ্যাত্মিক দর্শনেরই প্রতীকী প্রকাশ বলে মনে করা হয়।
পদ্মপুরাণে বর্ণিত আছে, মালব দেশের রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন নীলমাধবের সন্ধানে উদ্যোগ নেন। পরে দৈব নির্দেশে সমুদ্র থেকে ভেসে আসা দারুকাঠ দিয়ে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার বিগ্রহ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
বিশ্বকর্মা শিল্পীর রূপ ধারণ করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিগ্রহ নির্মাণের শর্ত দিলেও রানী গুণ্ডিচা নির্ধারিত সময়ের আগেই দরজা খুলে ফেলেন। ফলে অসমাপ্ত অবস্থাতেই বিগ্রহ পূজার নির্দেশ দেন স্বয়ং ভগবান। সেই থেকেই বর্তমান রূপে জগন্নাথদেব পূজিত হয়ে আসছেন বলে পুরাণে উল্লেখ রয়েছে।
ভারতের ওডিশার পুরীতে অবস্থিত জগন্নাথ মন্দির সনাতন ধর্মের চার ধামের অন্যতম। দ্বাদশ শতকে গঙ্গা রাজবংশের আমলে বর্তমান মন্দির নির্মিত হয়। এখানে প্রতিদিন মহাপ্রসাদ প্রস্তুত করা হয় এবং রথযাত্রা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব হিসেবে পালিত হয়।
যোগবিদ্যা কিংবা দেহ তত্ত্বের আলোচনায় এই রথ কে আমাদের দেহ রথের সাথে তুলনা করা হয়। রথ প্রস্তুত করা হয় ২০৬ টি কাঠ দিয়ে। যা মানব দেহের ২০৬ টি হাড়ের সাথে সামঞ্জস্য। অর্থাৎ রথ হচ্ছে আমাদের দেহ গাড়ি। এই রথে ১৬টি চাকা থাকে। এই ১৬টি চাকা হচ্ছে:- ৫টি জ্ঞানেন্দ্রিয়, ৫টি কর্মেন্দ্রিয়, ৬টি রিপু।
মানুষের মধ্যে এই ১৬ টি ইন্দ্রিয় বিরাজ করে। এই ১৬ টি ইন্দ্রিয় কে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। নাহয় জীবনে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে যে কোন সময়। তাই এই ১৬ টি চাকা কে এই ১৬ ইন্দ্রিয়ের প্রতিক হিসেবে দেয়া হয়েছে।
রথের রশি হলো মানুষ এর মন। রশি যেদিকে টান পড়বে দেহ সেদিকে ধাবিত হবে। বুদ্ধি বা জ্ঞান হচ্ছে রথের সারথি। আর এই রথের রথি হচ্ছেন সয়ং ঈশ্বর। অর্থাৎ, মানব দেহে যেমন ঈশ্বর পরমাত্মা রুপে আছেন।
অর্থাৎ দেহস্থ ইন্দ্রিয় ও একাদশ রুদ্রের নিয়ন্ত্রণ করাই এই রথযাত্রার উদ্দেশ্য। একমাত্র শুদ্ধ খাবার ও যোগাভ্যাসের মাধ্যমেই দেহস্থ ইন্দ্রিয় ও বায়ুকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
রথের রশি মানুষের মন, সারথি বুদ্ধি এবং রথের আরোহী পরমাত্মার প্রতীক। অর্থাৎ আত্মসংযম, ইন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রণ এবং ঈশ্বরচিন্তার মধ্য দিয়েই জীবনের প্রকৃত অগ্রগতি সম্ভব—এই বার্তাই রথযাত্রার মূল দর্শন হিসেবে বিবেচিত।