হাসপাতালে অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নতিকল্পে মতবিনিময় সভা

ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকার হাসপাতালসমূহের মালিক ও তাদের প্রতিনিধিদের সাথে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়।

আজ ২০ ফেব্রুয়ারি বুধবার হাসপাতালহ সমূহের অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নতিকল্পে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত এই মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহাম্মেদ খান, পিএসসি (অবঃ)। বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) মেজর এ কে এম শাকিল নেওয়াজসহ বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাগণ এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানের সভাপতি ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সবাইকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, হাসপাতালগুলোর অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা একটি স্পর্শকাতর ও উদ্বেগজনক বিষয়। স্বাভাবিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ে হাসপাতালের দুর্ঘটনায় জীবনহানির আশঙ্কা অনেক বেশি থাকে। কারণ একটি হাসপাতালে যারা অবস্থান করেন তাদের বেশিরভাগই থাকেন রোগী, যাদের পক্ষে অন্যের সাহায্য ছাড়া দুর্ঘটনার সময় বের হয়ে আসা সম্ভব নয়। এ কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য পূর্ব প্রস্তুতির কোনো বিকল্প নেই। তিনি সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের অগ্নি দুর্ঘটনার স্মৃতিচারণা করে বলেন, ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে আমরা সেখানে একটি মহড়া করেছিলাম। আমরা মনে করি, সেই মহড়ার সুফল হিসেবে সেখানে জীবনহানির ঘটনা ঘটেনি। তবে আমাদের সুপারিশমালা বাস্তবায়ন করা হলে হয়তো অগ্নি দুর্ঘটনায় সম্পদের ক্ষতির পরিমাণও সহনীয় পর্যায়ে থাকতো।

মতবিনিময় সভায় ফায়ার সার্ভিস অধিদপ্তরের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) মেজর একেএম শাকিল নেওয়াজ পাওয়ার পয়েন্টের মাধ্যমে কি-নোট উপস্থাপন করেন। তিনি বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরে বলেন, আমরা হাসপাতালগুলোতে যে সার্ভে কার্যক্রম পরিচালনা করেছি তাতে দেখা যায় ঢাকা মহানগরীর ৪৩৩টি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের মধ্যে ২৪৯টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ১৭৩টি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি জানান ঝুঁকিপূর্ণ হাসপাতালের সংখ্যা আমাদের সার্ভেকৃত হাসপাতালের মোট সংখ্যার ৯৮ শতাংশ।

মেজর শাকিল জানান, ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি রোগী, ভবনে র‌্যাম্প ও জরুরি সিঁড়ির অভাব, স্টোরিং গাইডলাইন-এর অভাব, দক্ষ ফায়ার সেফটি প্রফেশনালের অভাব, ফায়ার ডিটেকশন ও প্রটেকশন সিস্টেম এর অভাব, আর্থিং ব্যবস্থা না থাকা, এলপিএস (লাইটিং প্রটেকশন) সিস্টেম না থাকা, পর্যাপ্ত পানির অভাব, আবাসিক ভবনে হাসপাতাল স্থাপন, ইভাকুয়েশনের জন্য পর্যাপ্ত জায়গার অভাব ইত্যাদির কারণে হাসপাতালগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। এর সাথে যেসব অগ্নিঝুঁকি বিরাজ করে তা হলো অক্সিজেন ও নাইট্রাস অক্সাইড ইত্যাদির ব্যবহার, রান্নাঘর স্থাপন; লন্ড্রি হাউসের অব্যবস্থাপনা, অনিরাপদভাবে বয়লার ব্যবহার, বৈদ্যুতিক স্থাপনা (জেনারেটর, ট্রান্সফর্মার ইত্যাদি), ইন্টেরিয়র ডেকোরেশন; কার পার্কিং; খোলা বাতির ব্যবহার (মোমবাতি, মশার কয়েল ইত্যাদি), ধূমপান, অপরিকল্পিত স্টোর, Poor Housekeeping ইত্যাদি।

মেজর শাকিল জানান, ফায়ার সার্ভিস থেকে হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহে সার্ভে পরিচালনা করে ঝুঁকি নির্ধারণ করা হয়, ঝুঁকির উপর ভিত্তি করে তা নিরসণের জন্য সুপারিশমালা প্রণয়ন, অগ্নি দুর্ঘটনা মোকাবেলার জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ প্রদান, নিয়মিত মহড়া অনুশীলন, অগ্নি দুর্ঘটনা বিষয়ক হাসপাতালে সচেতনামূলক কার্যক্রম অব্যাহত আছে।

হাসপাতালের নিরাপত্তা জোরদারে সুপারিশমালা তুলে ধরে তিনি বলেন, নিরাপত্তা কমিটি গঠন, ফায়ার রিস্ক এসেসমেন্ট, আপদকালীন কর্মপরিকল্পনা (ফায়ার এন্ড সেফটি প্ল্যান), ফায়ার সেফটি অফিসার এবং ফায়ার ফাইটিং টিম (২৪/৭) সংরক্ষণ, নিয়মিত অগ্নি নির্বাপণের প্রশিক্ষণ ও মহড়া পরিচালনা, ইভাকুয়েশনের জন্য বহির্গমণ পথ সর্বদা বাধামুক্ত ও আলোকিত রাখা, ফায়ার এলার্ম ও ডিটেকশন সিস্টেম স্থাপন, পিএ সিস্টেম সংরক্ষণ, বহনযোগ্য অগ্নি নির্বাপণ যন্ত্র সংরক্ষণ, রিফিউজ এলাকা এবং সেফটি লবি সংরক্ষণ, এসেম্বেলি এরিয়া সংরক্ষণ, ফায়ার পাম্প সিস্টেম সংরক্ষণ, পর্যাপ্ত পানির রিজার্ভার সংরক্ষণ, স্ট্যান্ডপাইপ সিস্টেম সংরক্ষণ, ফায়ার হোজ এবং ফাস্ট এইড হোজ কানেকশন সংরক্ষণ, ফায়ার ডিপার্টমেন্ট কানেকশন এবং ফায়ার হাইড্রেন্ট সংরক্ষণ, ফায়ার লিফ্ট ও হাসপাতাল লিফ্্ট সংরক্ষণ, ফায়ার কমান্ড স্টেশন স্থাপন ইত্যাদি।

অনুষ্ঠানের সভাপতি বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক হাসপাতাল মালিক ও তাদের প্রতিনিধিদের সাথে কথা বলেন এবং বিভিন্ন নিরাপত্তা বিষয়ে নির্দেশনা দেন। এসময় তিনি সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন। তিনি বলেন, পুরনো হাসাপাতালগুলোর জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা স্থাপন কিছুটা কষ্টসাধ্য হলেও নিরাপত্তা ব্যবস্থার সাথে কোনো আপস করা যায় না। হাসপাতাল চালুও রাখতে হবে আবার তা নিরাপদও রাখতে হবে। তিনি জরুরি মুহূর্তে হাসপাতাল থেকে বের হয়ে আসার জন্য পজিটিভ প্রেশারে আইসোলেটেড বহির্গমন জরুরি সিঁড়ি সংরক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, ফায়ার ডোর স্থাপনের মাধ্যমে এ ধরনের ইমার্জেন্সি এক্সিট সংরক্ষণ করতে পারলে জীবনহানির আশঙ্কা কমে যাবে।

ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে আগত মালিক-পরিচালকদের বক্তব্য মনোযোগের সাথে শোনেন এবং তাদের মতামত প্রদান ও উপস্থিতির জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। মতবিনিময় সভায় হাসপাতালের নানা দিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যৎ নির্দেশনা ও এক্ষেত্রে ফায়ার সার্ভিসের সহযোগিতা চেয়ে বিভিন্ন জন বক্তব্য দেন। সোহরাওয়ার্দি হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ড. মামুন মোর্শেদ সোহরাওয়ার্দি হাসপাতালের সম্প্রতি সংঘটিত অগ্নি দুর্ঘটনা এবং তাতে সহ¯্রাধিক রোগী ইভাকুয়েশনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, আমি মনে করি আমাদের এই প্রাণশক্তি সঞ্চিত হয়েছিল গত অক্টোবরে ফায়ার সার্ভিসের সাথে আমাদের মহড়া অনুশীলনের মাধ্যমে। তিনি মনে করেন মহড়া না হলে সোহরাওয়ার্দি হাসপাতালের অগ্নি দুর্ঘটনার চিত্র ভিন্ন রকম হতে পারতো। সেখানে বহু হতাহতের ঘটনা ঘটতে পারতো। তিনি এজন্য হাসপাতালগুলোতে মহড়া জোরদারেরর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

অন্যান্যে মধ্যে মতামত ব্যক্ত করেন জনকণ্ঠের সিনিয়র রিপোর্টার মশিউর রহমান, ল্যাবএইড-এর জিএম হাবিবুল আলম, বার্ডেম হাসপাতালের আমিনুল ইসলাম, জাতীয় মানিসক হাসপাতালের কামাল উদ্দিন আহমেদ, ব্রেন অ্যান্ড মাইল্ড হাসপাতালের এজিএম মজিবর রহমান, ওএসবি চক্ষু হাসপাতালের ড. স্বপন কুমার ভৌমিক, পিডব্লিউডির প্রকৌশলী নাসিরুল রেজা, ঢাকা সেন্ট্রাল স্পেশালাইজড হাসপাতালের হেড অফ অ্যাডমিন মজিবর রহমান, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের পরিচালক কর্নেল শামসুল আলম, মিটফোর্ড হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ড. আব্দুর রশিদ, উত্তরা মহিলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ড. শাহরিয়ার প্রমুখ।

মতবিনিময় সভায় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স-এর পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) যুগ্ম সচিব মোঃ হাবিবুর রহমান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের উপসচিব আমিনুল ইসলাম, ফায়ার সার্ভিসের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ ঢাকার ৪ শতাধিক হাসপাতালের মালিক-পরিচালক ও অন্যান্য প্রতিনিধিবৃন্দ। খবর বিজ্ঞপ্তির।

ট্যাগ Poor Housekeepingঅক্সিজেন ব্যবহারঅগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থাঅনিরাপদভাবে বয়লার ব্যবহারঅপরিকল্পিত স্টোরআপদকালীন কর্মপরিকল্পনা (ফায়ার এন্ড সেফটি প্ল্যান)ইন্টেরিয়র ডেকোরেশনইভাকুয়েশনের জন্য বহির্গমণ পথ সর্বদা বাধামুক্ত ও আলোকিত রাখাএসেম্বেলি এরিয়া সংরক্ষণকার পার্কিং; খোলা বাতির ব্যবহারজেনারেটরট্রান্সফর্মার ইত্যাদিধূমপাননাইট্রাস অক্সাইড ব্যবহারনিয়মিত অগ্নি নির্বাপণের প্রশিক্ষণ ও মহড়া পরিচালনানিরাপত্তা কমিটি গঠনপর্যাপ্ত পানির রিজার্ভার সংরক্ষণপিএ সিস্টেম সংরক্ষণফায়ার এলার্ম ও ডিটেকশন সিস্টেম স্থাপনফায়ার কমান্ড স্টেশন স্থাপনফায়ার ডিপার্টমেন্ট কানেকশন এবং ফায়ার হাইড্রেন্ট সংরক্ষণফায়ার পাম্প সিস্টেম সংরক্ষণফায়ার রিস্ক এসেসমেন্টফায়ার লিফ্ট ও হাসপাতাল লিফ্্ট সংরক্ষণফায়ার সেফটি অফিসার এবং ফায়ার ফাইটিং টিম (২৪/৭) সংরক্ষণফায়ার হোজ এবং ফাস্ট এইড হোজ কানেকশন সংরক্ষণবহনযোগ্য অগ্নি নির্বাপণ যন্ত্র সংরক্ষণবৈদ্যুতিক স্থাপনামশার কয়েল ইত্যাদিমোমবাতিরান্নাঘর স্থাপনরিফিউজ এলাকা এবং সেফটি লবি সংরক্ষণলন্ড্রি হাউসের অব্যবস্থাপনাস্ট্যান্ডপাইপ সিস্টেম সংরক্ষণহাসপাতালসমূহের অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থাহাসপাতালে অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
Kishori
সংবাদ প্রতিনিধি

Kishori

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।