দেবাশীষ মুখার্জী, কূটনৈতিক প্রতিবেদকঃ ইদুল-আজহা উপলক্ষ্যে বাংলাদেশের রেলের চাহিদা পূরণের জন্য, আজ ভারত ১০টি ব্রডগেজ লোকোমোটিভ ইঞ্জিন হস্তান্তর করছে বাংলাদেশের কাছে। ভারত এই ইঞ্জিনগুলো দিচ্ছে অনুদান হিসেবে। বাংলাদেশ ও ভারতের ক্রমবর্ধমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের অগ্রযাত্রায় এই সহযোগিতা আরেকটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।
যদিও বাংলাদেশ ও চিনের মধ্যকার সম্পর্ক এখন অনেক মজবুত। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নির্মম ভাবে নিহত হওয়ার পর, চিন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ঐতিহাসিক। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদেশিদের পাশাপাশি ভারতীয় সৈন্যরাও রক্ত দিয়েছেন। বাংলাদেশের কয়েক লক্ষ মুক্তিবাহিনীকে ভারতের মাটিতে সংগঠিত করে ট্রেনিং দিয়েছে, ভাতা দিয়েছে,রেশন দিয়েছে ভারত।
এক কোটি শরণার্থীকে নিঃস্বার্থ ভাবে আশ্রয় ও খাদ্য দিয়ে – প্রায় এক বছরব্যাপী যে মানবিক সহায়তা দিয়েছে ভারত – সেই সম্পর্কের তুলনা অন্য কারও সঙ্গে হতে পারে না বলে মনে করে ঢাকা।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডঃ এ কে আবদুল মোমেন বলেছেন, “প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার পররাষ্ট্র নীতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, আলোচনার মাধ্যমে যাবতীয় সমস্যার সমাধান। প্রতিবেশীদের সঙ্গে যত ধরনের সমস্যা আছে, তার সবই আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করছেন তিনি। আমরা ভারতের সঙ্গে গঙ্গার জলবণ্টন চুক্তি, ছিটমহল বিনিময়, সীমান্তের ৭৪ বছরের পুরনো জটিল সমস্যা এবং সমুদ্রসীমা নির্ধারন প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধান করেছি। উভয় দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতারা তাদের বিচক্ষণতা ও পরিপক্বতা দিয়ে, দু’দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় ও মাত্রায় উন্নীত করেছেন। আসলে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্ক ঐতিহাসিক। আমরা পরস্পরের ভালো-মন্দের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আমরা খুব ভাল বন্ধু।’’
বাংলাদেশে ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত পিনাকরঞ্জন চক্রবর্তী বলেছেন, “চিন অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হয়েছে, এর জন্য এই অঞ্চলে দাদাগিরি করার চেষ্টা করছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করেছিলেন। দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ফোনালাপ অস্বাভাবিক কিছু নয়। আরও অস্বাভাবিক নয়, পাকিস্তানের পক্ষ থেকে কাশ্মীর প্রসঙ্গ তোলা। তবে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ঐতিহাসিক। টাকা-পয়সা বা কোনও কিছু দিয়ে তো আর সেই সম্পর্ক ভোলানো যাবে না। দুই দেশের মধ্যে যে বোঝাপড়া, তাতে এই সম্পর্কে অন্য কোনও দেশের প্রভাব নিয়ে আমি চিন্তার কিছু দেখি না।”
বাংলাদেশের প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত ডঃ ওয়ালিউর রহমান বলেছেন, “পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করেছিলেন। কারণ পাকিস্তানের কোনও বন্ধু নেই। উপসাগরীয় দেশগুলোও পাকিস্তানকে ফিরিয়ে দিয়েছে। পাকিস্তানের একমাত্র বন্ধু যদি এখন কেউ থেকে থাকে সেটি হল সৌদি আরব। আর ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথা ইমরান খানের ভাল ভাবেই জানা আছে। আর ওই ফোনালাপের পর, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রক, বাংলাদেশের অবস্থানের ভূয়সী প্রশংসা করে মন্তব্য করেছে।”
নয়াদিল্লির শীর্ষস্থানীয় ভূরাজনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন’-এর সিনিয়র ফেলো ডঃ জয়িতা ভট্টাচার্য বলেছেন, “ভারত ও বাংলাদেশ একটি বিশেষ সম্পর্কের অংশীদার। এই সম্পর্কের মূলে আছে স্বাধীনতার জন্য ভারতের আত্মত্যাগ ও অভিন্ন সংস্কৃতি। এটি স্বতন্ত্র একটি সম্পর্ক এবং এটি মনে রেখেই এই সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্কের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। এটি প্রতিযোগিতার সময় নয়। বরং দুই দেশের উচিত সম্ভাবনাময় খাতগুলোতে সহযোগিতা জোরদার করার মাধ্যমে, এ সম্পর্কের আরও পরিচর্যা করা।”





