রাখী পূর্ণিমায় ভাইয়ের হাতে রাখি পরানোর সময় একটি মন্ত্র বহুদিন ধরে উচ্চারিত হয়ে আসছে। মন্ত্রটির শুরুতেই রয়েছে এক বিস্ময়কর পৌরাণিক চরিত্রের নাম—মহাবলী রাজা।
মন্ত্রটি হলো—
যেন বদ্ধো বলী রাজা দানবেন্দ্রো মহাবলঃ।
তেন ত্বামভিবধ্নামি রক্ষে মা চল মা চল॥
সংস্কৃত মূল পাঠ—
येन बद्धो बली राजा दानवेन्द्रो महाबलः।
तेन त्वामभिबध्नामि रक्षे मा चल मा चल॥
এর সরল অর্থ—
“যে বন্ধনে মহাবলশালী দানবরাজ বলী আবদ্ধ হয়েছিলেন, সেই বন্ধনেই তোমাকে আবদ্ধ করছি। হে রক্ষাসূত্র, তুমি বিচলিত হয়ো না, অটল থাকো।”
কিন্তু প্রশ্ন হলো—রাখির মতো ভাই-বোনের ভালোবাসার উৎসবে কেন একজন দানবরাজের নাম উচ্চারণ করা হয়?
এর উত্তর খুঁজতে হলে ফিরে যেতে হয় পুরাণের কাহিনিতে।
কে ছিলেন মহাবলী?
পুরাণে মহাবলী বা বলী ছিলেন অসুর বংশের অত্যন্ত শক্তিশালী রাজা। তিনি ছিলেন প্রহ্লাদের পৌত্র এবং বিরোচনের পুত্র। অসুরকুলে জন্ম হলেও তাঁর পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে দানশীলতা, সত্যনিষ্ঠা, প্রজাহিতৈষণা ও পরাক্রমের নানা কাহিনি।
তাঁর শক্তি এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছিল যে দেবতাদের সঙ্গে সংঘর্ষে তিনি জয়লাভ করে স্বর্গসহ তিন লোকের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। দেবতারা তখন তাঁর শক্তিতে উদ্বিগ্ন হয়ে ভগবান বিষ্ণুর শরণাপন্ন হন।
বামনরূপে বিষ্ণুর আগমন
মহাবলী ছিলেন অসাধারণ দাতা। তিনি যজ্ঞ আয়োজন করে ব্রাহ্মণ ও দরিদ্রদের মধ্যে দান করতেন। তাঁর এই দানশীলতার সুযোগ নিয়েই একদিন ভগবান বিষ্ণু বামন অবতার ধারণ করে তাঁর যজ্ঞস্থলে উপস্থিত হন।
বামনরূপী বিষ্ণু মহাবলীর কাছে মাত্র তিন পা জমি প্রার্থনা করেন।
আরও পড়ূনঃ আজ রাখী পূর্ণিমা: ভাই-বোনের ভালোবাসার বন্ধন আরও দৃঢ় করার দিন, জেনে নিন পুরো বিধি
মহাবলী এত সামান্য দান শুনে সম্মতি দেন।
কিন্তু এরপরই ঘটে বিস্ময়কর ঘটনা।
বামন বিশাল ত্রিবিক্রম রূপ ধারণ করেন। তাঁর এক পায়ে পৃথিবী, অন্য পায়ে স্বর্গলোক পরিমাপ হয়ে যায়। তখন তৃতীয় পা রাখার মতো কোনো স্থান আর অবশিষ্ট থাকে না।
মহাবলী নিজের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে মাথা এগিয়ে দিয়ে বলেন—তৃতীয় পদক্ষেপ তাঁর মাথার ওপর রাখা হোক।
বিষ্ণু তাঁর মাথায় তৃতীয় পদক্ষেপ রাখেন। মহাবলী পাতালে অবস্থান করতে যান।
তবে তাঁর সত্যনিষ্ঠা ও দানশীলতায় বিষ্ণু সন্তুষ্ট হন। পুরাণের বিভিন্ন বর্ণনায় এরপর মহাবলীকে আশীর্বাদ ও বিশেষ মর্যাদা দেওয়ার কথা পাওয়া যায়।
তাহলে রাখির সঙ্গে বলীর সম্পর্ক কোথায়?
এখানেই বিষয়টি আরও আকর্ষণীয়।
রাখির মন্ত্রে বলা হয়—
“যেন বদ্ধো বলী রাজা…”
অর্থাৎ এমন একটি রক্ষাবন্ধনের কথা স্মরণ করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে মহাবলী আবদ্ধ হয়েছিলেন।
তবে এটিকে সরাসরি “বামন অবতারে বিষ্ণু যে বন্ধনে বলীকে বেঁধেছিলেন, সেটিই রাখির সুতো”—এভাবে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়।
কারণ ভবিষ্য পুরাণের যে অধ্যায়ে এই মন্ত্রটি পাওয়া যায়, সেখানে রক্ষাবন্ধনের একটি পৃথক আচারিক ও পৌরাণিক প্রেক্ষাপট রয়েছে।
ভবিষ্য পুরাণে রক্ষাবন্ধনের বর্ণনা
ভবিষ্য পুরাণের উত্তরপর্বের ১৩৭তম অধ্যায়ে শ্রাবণ পূর্ণিমার রক্ষাবন্ধনের বিধান বর্ণনা করা হয়েছে।
অধ্যায়ের শুরুতে দেবতা ও অসুরদের সংঘর্ষ এবং দানবরাজ বলীর প্রসঙ্গ আসে। এরপর রক্ষাসূত্র তৈরির নিয়ম, পূজা এবং তা ধারণের পদ্ধতি বলা হয়েছে।
রক্ষাসূত্র তৈরিতে অক্ষত, সিদ্ধার্থ বা বীজ, সোনা এবং বিভিন্ন ধরনের কাপড় ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। এরপর নির্দিষ্ট আচার সম্পন্ন করে পুরোহিত রাজাকে রক্ষাসূত্র বাঁধবেন।
এরপরই আসে বহুল প্রচলিত মন্ত্র—
येन बद्धो बली राजा दानवेन्द्रो महाबलः।
तेन त्वामभिबध्नामि रक्षे मा चल मा चल॥
অর্থাৎ, মহাবলীর সঙ্গে যুক্ত একটি পৌরাণিক রক্ষাবন্ধনের দৃষ্টান্তকে সামনে রেখে বর্তমান রক্ষাসূত্রের অটলতা কামনা করা হচ্ছে।
‘বলী’ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
মন্ত্রে বলীকে শুধু একজন অসুররাজ হিসেবে স্মরণ করা হয়নি; তাঁকে বলা হয়েছে—
“দানবেন্দ্রো মহাবলঃ”
অর্থাৎ মহাশক্তিশালী দানবরাজ।
পুরাণে মহাবলীর চরিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তাঁর প্রতিশ্রুতি রক্ষা।
তিনি জানতেন, বামন যে সাধারণ ব্রাহ্মণ নন, তারপরও দেওয়া প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসেননি। নিজের সর্বস্ব ত্যাগ করেও তিনি সত্য ও দানের মর্যাদা রক্ষা করেন।
এই কারণে মহাবলীকে শুধু ‘অসুর’ হিসেবে দেখলে তাঁর পৌরাণিক চরিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ পড়ে যায়।
রক্ষাসূত্রের আসল ভাবনা কী?
“রক্ষা” শব্দ থেকেই রক্ষাসূত্র বা রক্ষাবন্ধনের ধারণা।
রাখি বাঁধার সময় মূল প্রার্থনা হলো—যাকে রক্ষাসূত্র পরানো হচ্ছে, তিনি যেন নিরাপদ, সুস্থ ও মঙ্গলময় জীবন লাভ করেন এবং সেই বন্ধন যেন অটুট থাকে।
মন্ত্রের শেষ অংশ—
“রক্ষে মা চল মা চল”
এর মধ্যেই সেই ভাবনাটি সবচেয়ে স্পষ্ট।
অর্থাৎ—
“হে রক্ষাসূত্র, তুমি অটল থাকো; বিচলিত হয়ো না।”
এখানে রাখি কেবল একটি সুতো নয়; এটি প্রতীকীভাবে সুরক্ষা, দায়িত্ব, ভালোবাসা এবং অটুট বন্ধনের প্রতীক।
প্রাচীন রক্ষাবন্ধন আর আজকের রাখি কি একই?
এখানে একটি ঐতিহাসিক পার্থক্য মনে রাখা প্রয়োজন।
ভবিষ্য পুরাণের ১৩৭তম অধ্যায়ের রক্ষাবন্ধন মূলত রাজা, পুরোহিত ও রক্ষাসূত্রকে কেন্দ্র করে একটি ধর্মীয় আচার। সেখানে আজকের মতো বোন ভাইয়ের হাতে রাখি বাঁধছেন—এমন সরাসরি বিবরণ নেই।
পরবর্তী সময়ে ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রথার সঙ্গে রক্ষাবন্ধনের ধারণা পরিবর্তিত ও বিস্তৃত হয়েছে। আধুনিক সময়ে এটি বিশেষভাবে ভাই-বোনের ভালোবাসা ও পারিবারিক বন্ধনের উৎসব হিসেবে জনপ্রিয় হয়েছে।
তাই আজকের রাখি উৎসবকে ভবিষ্য পুরাণের সেই প্রাচীন রক্ষাবন্ধনের সঙ্গে সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতায় দেখা যায়; কিন্তু দুই আচারকে সম্পূর্ণ অভিন্ন বলা ইতিহাসসম্মত হবে না।
মহাবলী থেকে ভাই-বোনের রাখি
মহাবলী রাজার কাহিনির সঙ্গে আধুনিক রাখির সবচেয়ে সুন্দর সংযোগটি সম্ভবত এখানেই—প্রতিশ্রুতি রক্ষা।
মহাবলী নিজের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছিলেন। আর রাখি বাঁধার সময় ভাই-বোনও প্রতীকীভাবে একে অপরের সুখ-দুঃখে পাশে থাকার অঙ্গীকার করেন।
একদিকে মহাবলীর সত্য ও প্রতিশ্রুতির কাহিনি, অন্যদিকে রক্ষাসূত্রের অটুট থাকার প্রার্থনা—এই দুই ভাবনা মিলেই মন্ত্রটি আজও অর্থবহ।
তাই রাখির মন্ত্রে মহাবলী রাজার নাম আসা নিছক একটি পৌরাণিক নামের উল্লেখ নয়। এর মধ্যে রয়েছে রক্ষা, প্রতিশ্রুতি, বন্ধন, আত্মত্যাগ ও অটলতার একটি দীর্ঘ সাংস্কৃতিক স্মৃতি।
আর সেই কারণেই শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়েও রাখি বাঁধার সময় উচ্চারিত হয়—
“যেন বদ্ধো বলী রাজা দানবেন্দ্রো মহাবলঃ।
তেন ত্বামভিবধ্নামি রক্ষে মা চল মা চল॥”


