নবীগঞ্জে নানা সমস্যার বেড়াজালে বন্দি হরিজন সম্প্রদায়ের কয়েকটি পরিবার

উত্তম কুমার পাল হিমেল,নবীগঞ্জ(হবিগঞ্জ)প্রতিনিধিঃ   নানা সমস্যার বেড়াজালে বন্দি হয়ে আজও অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জের হরিজন সম্প্রদায়ের বেশ কয়েকটি পরিবার। এদের মধ্যে অনেকেই এখন পৈত্রিক এ পেশা ছেড়ে অন্য পেশার দিকে   চলে যাচ্ছে। কাজের জন্য নির্দিষ্ট জায়গার অভাব, সামাজিকভাবে নিম্ন মর্যাদা, বিদ্যুৎ সমস্যা, স্যানিটেশন সমস্যা, লেখাপড়ার সুবিধা না পাওয়া, মুজুরী বৈষম্যসহ নানামুখী সমস্যা প্রতিনিয়তই তাদের টিকে থাকতে বাধা হয়ে দাড়াচ্ছে। তাদের এই দুরাবস্থা দেখার যেন কেউ নেই। তাদের পূর্নবাসনের জন্য সরকারের নিকট আবেদন জানিয়েছেন এ সম্প্রদায়ের লোকজন।

সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, ঢাকা সিলেট মহাসড়ক সংলগ্ন নবীগঞ্জ উপজেলার আউশকান্দি বাজারের পাশে উলুকান্দি গ্রামে বৃট্রিশ আমল থেকে বসবাস করে আসছেন হরিজন সম্প্রদায়ের বেশ কয়েকটি পরিবার। আর থেকেই এ পল্লীর নামকরন করা হয় হজিন পল্লী বা মুচি বাড়ী। এখনও এ বাড়ী মুচি বাড়ী নামেই পরিচিত।

মাত্র ১৩ শতক জায়গার মধ্যে অনেকটা গাদাগাদি করেই কোন রকমে  পরিবার পরিজন নিয়ে কষ্ট বসবাস করে আসছেন ১১টি পরিবারের অনন্ত শতাধীক লোকজন। এর মধ্যে তাদের অনেক জায়গাই স্থানীয় ভূমিখেকোদের দখলে রয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন সম্প্রদায়ের লোকজনের।

 হরিজন  সম্প্রদায়ের লোকজন জানান, স্বাধীনতার ৪৫ বছর পেরিয়ে গেলেও আজও তারা বিদ্যুতের আলোর মুখ দেখেননি। ফলে তারা ডিজিটাল বাংলাদেশের বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছেন।

অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নির্বাচনের আগে নানা রকম প্রতিশ্রতি দিয়ে ভোট আদায় করেন বিভিন্ন নির্বাচনে অংশগ্রহনকারী বিভিন্ন প্রার্থীরা। কিন্তু ভোটের পর তাদের চেহারা আর দেখা যায়না বলেও জানান তারা।  নির্বাচনের পূর্বে  নির্বাচিত হলেই বিদ্যুতের ব্যবস্থা করে দিবেন বলেও আশ্বাস দেন প্রার্থীরা। এভাবেই চলছে যুগের পর যুগ। তবুও বিদ্যুতের আলোর দেখা নেই। অন্ধাকারেই করছেন বসবাস। হারিকেন আর কুপি বাতিই যেন তাদের জন্য আলোর একমাত্র সম্বল।

এছাড়াও  হরিজনপাড়ার স্যানিটেশন ব্যবস্থাও রয়েছে খুবই নাজুকভাবে। ১১ টি পরিবার মিলে রিং স্লাব দিয়ে কোনমতে ২টি  ল্যাট্রিন তৈরী করে তা ব্যবহার করে শতাধীক লোকজন।

অন্য দিকে, এ সম্প্রদায়ের লোকজন জুতা ও ব্যাগ জাতীয় জিনিসপত্র মেরামতের জন্য যে চামড়া সংগ্রহ করে তার ময়লা-আর্বজনা পার্শ্ববর্তী খালে ফেলে দেয়। ফলে খালের পানি দুষিত হয়। আর এসব পানি  তারা  পরিবার পরিজন নিয়ে আশেপাশের  নিম্ন আয়ের লোকজন রান্না, গোসল, থালা-বাসন ধোয়ার কাজেও  ব্যবহার করে। যার কারনে এসকল অসচেতন নিম্নবৃত্ত মানুষেরা নানা রকম পানিবাহিত রোগে  আক্রান্ত হচ্ছেন।

হরিজন পাড়ার শিশুরা বেশীর ভাগই শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার কারনে বিভিন্ন কাজ করে তারা জীবিকা নির্বাহ করে। ফলে তাদের স্কুলে যাওয়ার সময় হয় না। আবার অনেকেই পিতার কাজে সহযোগীতা করে থাকে।  এ কারণে স্কুলে যাওয়া বা পড়া লেখার সময় নেই তাদের।

হরিজন সম্প্রদায়ের লোকজন জন্ম সূত্রে পেশায়- বিভিন্ন পশুর চামড়া ক্রয়-বিক্রয়, জুতা সেলাই করাই প্রধান কাজ। সকাল থেকে শুরু করে রাত পযন্ত তারা এ কাজ করে থাকেন। সারাদিন কাজ করে তারা দেড় শত বা দুই শত টাকার বেশী আয় করতে পারে না। ফলে তাদের পরিবারে আর্থিক অনটন লেগেই থাকে। এভাবেই যুগের পর যুগ ধরে চলছে তাদের জীবনযাত্রা। এমনটাই জানালেন আউশকান্দি ইউনিয়নের উলুকান্দি গ্রামের মহরিজন বাড়ীতে বসবাসকারী, লাখপতি, সুবল, বাবুল, লক্ষন সহ অনেকেই।

তাদের সাথে কথা বলে জানা য়ায়, তাদের  বিবাহ, আত্মীয়তা, শালিস-বিচার নিজেদের সম্প্রদায়ের মধ্যেই হয়ে থাকে ।  তাদের বিবাহের কোন নথি বা রেজিষ্ট্রেশন হয় না। ফলে বাল্য বিয়ে, বহুবিবাহ, যৌতুক সমস্যা এদের যেন নিত্যসঙ্গী হয়েই আছে। এ ধরনের নানামূখী সমস্যার বেড়াজালে আটকে হরিজন সম্প্রদায়  আজ প্রায় বিলীহ হওয়ার পথে। প্রাচীন ও প্রয়োজনীয় এ পেশাকে টিকিয়ে রাখতে এদের সমস্যাবলীর প্রতিকারের ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সমাজের সচেতন ও সরকারের উর্ধ্বতন মহলের সুদৃষ্টি কামনা করছেন হরিজন সম্প্রদায়ের লাকজন।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
admin
লেখক / প্রতিবেদক

admin

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।