তথ্য মন্ত্রণালয়ে বড় রদবদল: স্বপন উপদেষ্টা, দায়িত্ব পেলেন পার্থ

তথ্য মন্ত্রণালয়ে বড় রদবদল: স্বপন উপদেষ্টা, দায়িত্ব পেলেন পার্থ
তথ্য মন্ত্রণালয়ে বড় রদবদল: স্বপন উপদেষ্টা, তথ্যমন্ত্রী পার্থ

তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের মন্ত্রিসভায় রদবদলের অংশ হিসেবে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে পরিবর্তন এসেছে। জহির উদ্দিন স্বপনকে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা করা হয়েছে। তার স্থলাভিষিক্ত হয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান ও ভোলা-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ। শুক্রবার রাতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ নতুন মন্ত্রীদের দপ্তর বণ্টন ও পুনর্বণ্টন করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। তথ্য মন্ত্রণালয়ে বড় রদবদল

জহির উদ্দিন স্বপনের মন্ত্রণালয় পরিবর্তন এবং পার্থকে তথ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। বিশেষ করে স্বপনের স্বল্প সময়ের দায়িত্বকাল এবং গণমাধ্যমের সঙ্গে তার যোগাযোগের বিষয়টি সামনে এসেছে। অন্যদিকে পার্থর পারিবারিক পরিচয়, দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং বিজেপির নেতৃত্বে তার অবস্থানও আলোচনার অন্যতম বিষয়।

স্বপনকে ঘিরে সাংবাদিক মহলে আলোচনা

জহির উদ্দিন স্বপন মাত্র কয়েক মাস তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম নিয়মতান্ত্রিক ও পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। গণমাধ্যম, সাংবাদিকদের পেশাগত স্বার্থ, প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন এবং তথ্যপ্রবাহসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়েও তার সক্রিয়তা ছিল।

এ কারণে সাংবাদিকদের একটি অংশের কাছে তার মন্ত্রণালয় পরিবর্তনের বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে তাকে সরকার থেকে বাদ দেওয়া হয়নি। বরং মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তার নতুন দায়িত্বের নির্দিষ্ট ক্ষেত্র সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।

কে এই জহির উদ্দিন স্বপন?

জহির উদ্দিন স্বপনের জন্ম বরিশাল জেলার গৌরনদী উপজেলার সরিকল গ্রামে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পর তিনি ছাত্ররাজনীতির মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন। আশির দশকে বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রীর কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।

১৯৯৩ সালে তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

পরবর্তী সময়ে তিনি বিএনপির মিডিয়া সেলের প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক, কেন্দ্রীয় তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক এবং চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে তিনি বিজয়ী হন। প্রকাশিত নির্বাচনী ফল অনুযায়ী, তিনি ১ লাখ ৫৫২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন; তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা কামরুল ইসলাম খান পান ৪৬ হাজার ২৬৩ ভোট। ফলে ৫৪ হাজার ২৮৯ ভোটের ব্যবধানে জয় পান স্বপন।

পার্থর হাতে তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব

আন্দালিব রহমান পার্থ দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান হিসেবে জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয়। ২০০৮ সালে তার বাবা নাজিউর রহমান মঞ্জুর মৃত্যুর পর তিনি দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন। একই বছর ভোলা-১ আসন থেকে চারদলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনি সংস্থাপন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন। ২০১৪ সালের নির্বাচনে তার দল বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে নির্বাচন বর্জন করে। ২০১৮ সালের নির্বাচনে তিনি ঢাকা-১৭ আসনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি ভোলা-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন।

পারিবারিক পরিচয়ও আলোচনায়

আন্দালিব রহমান পার্থর পারিবারিক পরিচয়ও বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহুল আলোচিত। তার বাবা নাজিউর রহমান মঞ্জুর ছিলেন সাবেক মন্ত্রী, ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র এবং বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান।

তার মা শেখ রেবা রহমান শেখ মুজিবুর রহমানের ভাইঝি এবং শেখ ফজলুল করিম সেলিমের বোন—এমন তথ্য বিভিন্ন জীবনীমূলক বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে। সেই সূত্রে পার্থর পারিবারিক সম্পর্ক আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা পরিবারের সঙ্গে যুক্ত।

এছাড়া পারিবারিক বর্ণনা অনুযায়ী, পার্থর পরিবার ভোলার বালিয়ার তালুকদার বংশের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাদের পূর্বপুরুষ মুঙ্গা খাঁ আঠারো শতকে আফগানিস্তানের গরমশির অঞ্চল থেকে বৃহত্তর বরিশালের সালুকা এলাকায় এসে বসতি স্থাপন করেন বলে পারিবারিক ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। পরবর্তী সময়ে বংশটি ভোলার বালিয়া ও গজারিয়া এলাকায় বসতি স্থাপন করে।

তবে এসব বংশীয় তথ্যের বেশ কিছু অংশ পারিবারিক সূত্রনির্ভর হওয়ায় সেগুলোকে ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠিত তথ্যের সঙ্গে পৃথক করে দেখা প্রয়োজন।

পার্থকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক

আন্দালিব রহমান পার্থর রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলে আলোচনা ও সমালোচনা রয়েছে। বিশেষ করে তার পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয়, বিভিন্ন রাজনৈতিক জোটের সঙ্গে তার অবস্থান এবং বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক নিয়ে নানা মত রয়েছে।

তার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম বা রাজনৈতিক সুবিধা ভোগের মতো যেসব অভিযোগ বিভিন্ন মহলে উত্থাপিত হয়, সেগুলোকে নির্ভরযোগ্য নথি, তদন্ত প্রতিবেদন বা আদালতের সিদ্ধান্ত ছাড়া প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা সমীচীন নয়। এসব অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্যসহ পৃথকভাবে যাচাই করে প্রকাশ করাই সাংবাদিকতার দৃষ্টিতে অধিক গ্রহণযোগ্য।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বপনের ভূমিকা

জহির উদ্দিন স্বপনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড শুধু দেশীয় রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। পাশাপাশি আইনপ্রণেতাদের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক ‘পার্লামেন্টারিয়ানস ফর গ্লোবাল অ্যাকশন’-এর এশিয়া অঞ্চলের সহ-সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন বলে তার রাজনৈতিক জীবনীতে উল্লেখ করা হয়।

সংসদ সদস্য হিসেবে তিনি পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি এবং সংস্থাপন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

স্বপনের নতুন দায়িত্ব কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে জহির উদ্দিন স্বপনকে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা করার সিদ্ধান্তকে সরাসরি রাজনৈতিক অবমূল্যায়ন হিসেবে দেখার সুযোগ সীমিত। কারণ তিনি মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়েননি; বরং নতুন একটি নীতিনির্ধারণী দায়িত্ব পেয়েছেন। তবে কোন বিষয়ে তাকে উপদেষ্টা করা হবে, সেটিই তার নতুন দায়িত্বের রাজনৈতিক গুরুত্ব নির্ধারণ করবে।

অন্যদিকে আন্দালিব রহমান পার্থর হাতে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার মধ্য দিয়ে সরকার জোটের শরিক দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে গণমাধ্যম ও তথ্য ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়েছে। ফলে পার্থর নেতৃত্বে মন্ত্রণালয় কী ধরনের নীতি গ্রহণ করে, সাংবাদিকদের সঙ্গে সম্পর্ক কীভাবে পরিচালনা করে এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও তথ্যপ্রবাহের ক্ষেত্রে কী অবস্থান নেয়—সেদিকেই এখন নজর থাকবে।

রাজনৈতিক সমীকরণের নতুন বার্তা

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে এই পরিবর্তনকে শুধু ব্যক্তি পরিবর্তন হিসেবে দেখার পাশাপাশি সরকারের রাজনৈতিক সমীকরণের অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। একদিকে বিএনপির দীর্ঘদিনের নেতা জহির উদ্দিন স্বপনকে উপদেষ্টা হিসেবে রেখে দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে জোটের শরিক বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থকে পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

ফলে এই রদবদনের মাধ্যমে সরকার একই সঙ্গে অভিজ্ঞ রাজনৈতিক নেতাদের ধরে রাখা এবং জোটের অংশীদারদের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব দেওয়ার একটি ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা করেছে—এমন বিশ্লেষণও সামনে আসছে।

তবে শেষ পর্যন্ত এই পরিবর্তনের সাফল্য নির্ভর করবে নতুন তথ্যমন্ত্রীর কার্যক্রম এবং স্বপনের নতুন দায়িত্বের পরিধির ওপর। বিশেষ করে সাংবাদিকদের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং রাষ্ট্রীয় যোগাযোগ ব্যবস্থাপনায় আগামী দিনগুলোতে কী পরিবর্তন আসে—সেটিই এই রদবদনের প্রকৃত মূল্যায়নের ভিত্তি হয়ে উঠবে।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
Brinda Chowdhury
সংবাদ প্রতিনিধি

Brinda Chowdhury

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।