রাশিয়ায় উত্তর কোরিয়ার ৮৫০০ সেনা ও ড্রোন ইউনিট, নতুন করে উদ্বেগ ইউক্রেনের

রাশিয়ায় উত্তর কোরিয়ার ৮৫০০ সেনা ও ড্রোন ইউনিট, নতুন করে উদ্বেগ ইউক্রেনের
রাশিয়ায় উত্তর কোরিয়ার ৮৫০০ সেনা ও ড্রোন ইউনিট

রাশিয়ায় বর্তমানে উত্তর কোরিয়ার প্রায় ৮ হাজার ৫০০ সেনা মোতায়েন রয়েছে এবং তাদের সঙ্গে একটি নতুন ড্রোন ইউনিটও কাজ করছে। এই ইউনিট ইউক্রেনের ভেতরের লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত ও হামলায় সক্ষম হতে পারে বলে দাবি করেছেন ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা বিভাগের উপপ্রধান মেজর জেনারেল ভাদিম স্কিবিতস্কি।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে তার এই বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। স্কিবিতস্কির দাবি, রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা আরও বাড়াতে উত্তর কোরিয়া ভবিষ্যতে অতিরিক্ত সেনা ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পাঠাতে পারে।

কুরস্কে উত্তর কোরিয়ার সেনা

ইউক্রেনীয় গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মোতায়েন উত্তর কোরিয়ার সেনাদের বড় একটি অংশ রাশিয়ার কুরস্ক অঞ্চলে অবস্থান করছে। তাদের মধ্যে প্রায় ১ হাজার প্রকৌশলী ও মাইন অপসারণকারী এবং প্রায় ৪০০ ড্রোন অপারেটর রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

আরও পড়ুনঃ ম্যাকাইয়ে বাংলাদেশের ব্যাটিং ধস, ২২ বলে ফাইফার স্টার্কের

স্কিবিতস্কির ভাষ্য অনুযায়ী, ড্রোন ইউনিটের সদস্যদের একটি অংশ আগের মোতায়েনের সময় অর্জিত অভিজ্ঞতা কাজে লাগাচ্ছে। এসব ড্রোন ইউক্রেনের ভূখণ্ডে নজরদারির পাশাপাশি হামলার কাজেও ব্যবহৃত হতে পারে।

ইউক্রেনীয় গোয়েন্দা সংস্থার দাবি, উত্তর কোরিয়ার সেনারা সরাসরি ইউক্রেনের ভেতরে যুদ্ধ না করলেও রাশিয়ার পেছনের অবস্থানগুলো শক্তিশালী করছে। এর ফলে রুশ বাহিনীর আরও সদস্যকে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

আরও ৫০ হাজার সেনার সম্ভাবনা

স্কিবিতস্কি দাবি করেছেন, সেপ্টেম্বরে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের বৈঠক হলে মস্কো পিয়ংইয়ংয়ের কাছে আরও সেনা চাইতে পারে। তার ধারণা, সম্ভাব্যভাবে ৫০ হাজার পর্যন্ত অতিরিক্ত সেনা পাঠানোর বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।

তবে এই দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন কিম জং উনের প্রভাবশালী বোন কিম ইয়ো জং। তিনি অতিরিক্ত কয়েক হাজার উত্তর কোরীয় সেনা পাঠানোর সম্ভাবনাকে ‘ভিত্তিহীন মনগড়া কল্পকাহিনি’ বলে অভিহিত করেছেন।

ফলে অতিরিক্ত সেনা পাঠানোর বিষয়টি এখনো নিশ্চিত নয় এবং এটি মূলত ইউক্রেনীয় গোয়েন্দা মূল্যায়ন ও উত্তর কোরিয়ার পাল্টা বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে।

আরও পড়ুনঃ ধর্মীয় কারণে সহিংসতার শিকারদের স্মরণে আন্তর্জাতিক দিবস

২০২৪ সাল থেকে রাশিয়ায় উত্তর কোরিয়ার সেনা

রাশিয়ার হয়ে ইউক্রেন যুদ্ধে উত্তর কোরিয়ার সেনা অংশগ্রহণের বিষয়টি দুই দেশের সামরিক সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে। ইউক্রেনীয় তথ্য অনুযায়ী, প্রথম দফায় প্রায় ১০ হাজার উত্তর কোরীয় সেনা ২০২৪ সালের অক্টোবরে রাশিয়ার কুরস্ক অঞ্চলে মোতায়েন করা হয়।

তাদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ইউক্রেনীয় বাহিনীর অনুপ্রবেশ মোকাবিলায় রুশ বাহিনীকে সহায়তা করা। পরবর্তী সময়ে উত্তর কোরিয়া ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে প্রথমবারের মতো স্বীকার করে যে তাদের সেনারা ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার সামরিক অভিযানে অংশ নিয়েছে।

স্কিবিতস্কির দাবি, এখন পর্যন্ত প্রায় ২৫ হাজার উত্তর কোরীয় সেনা রাশিয়ায় মোতায়েন অথবা পালাক্রমে দায়িত্ব পালন করেছে।

ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ

শুধু জনবল নয়, উত্তর কোরিয়া রাশিয়াকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও সরবরাহ করছে বলে দাবি করেছেন স্কিবিতস্কি। তার মতে, গত বছরের আগস্টের আগে উত্তর কোরিয়া থেকে অন্তত ১৫০টি KN-23 বা KN-24 ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করা হয়েছিল এবং আরও ১২০টি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল।

ইউক্রেনের জন্য এই ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে উঠছে বলে দাবি করা হয়েছে। বিশেষ করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে সক্ষম পশ্চিমা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সীমিত হওয়ায় কিয়েভের ওপর চাপ বাড়ছে।

স্কিবিতস্কির ভাষ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ৪০টি ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করা হয়েছে। এর মধ্যে দুটি ৩০ জুলাই দনিপ্রো অঞ্চলের রাদুশনে হামলায় ব্যবহার করা হয় বলে তিনি দাবি করেছেন। ওই হামলায় একই পরিবারের চার শিশুসহ কয়েকজন নিহত হওয়ার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

রাশিয়ায় উত্তর কোরীয় প্রযুক্তি সহায়তা

ইউক্রেনীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তা আরও দাবি করেছেন, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারে সহায়তা করার জন্য উত্তর কোরিয়া থেকে প্রায় ৯০ জন কর্মী রাশিয়ার ভোরোনজ অঞ্চলে পাঠানো হয়েছে। একই অঞ্চলের একটি বিমানঘাঁটিতে উত্তর কোরিয়া থেকে ক্ষেপণাস্ত্র বহন করতে পারে এমন প্রায় ১০টি বড় কার্গো ফ্লাইট অবতরণ করেছে বলেও তিনি দাবি করেন।

তার মতে, উত্তর কোরিয়া রাশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে নিজেদের অস্ত্রের লক্ষ্য নির্ধারণ ও বিস্ফোরক বহনক্ষমতা উন্নত করার সুযোগ পাচ্ছে। আধুনিক সংস্করণের এসব ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা প্রায় ৮০০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে বলেও দাবি করা হয়েছে।

সামরিক সহযোগিতায় নতুন সমীকরণ

রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার সামরিক সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হওয়ার বিষয়টি পশ্চিমা দেশগুলোর জন্যও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ার ফলে ইউক্রেন যুদ্ধের পাশাপাশি পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতিতেও নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে।

স্কিবিতস্কির দাবি, রাশিয়াকে জনবল ও গোলাবারুদ সরবরাহের বিনিময়ে উত্তর কোরিয়া রুশ S-400 আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চেয়েছে। ইতোমধ্যে পিয়ংইয়ং একটি Pantsir-1 ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পেয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।

সব মিলিয়ে, উত্তর কোরিয়ার সেনা, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র সহযোগিতা ইউক্রেন যুদ্ধের সামরিক বাস্তবতাকে আরও জটিল করে তুলছে। তবে এসব তথ্যের বড় অংশই ইউক্রেনীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তার দাবি; রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার পক্ষ থেকে এর সবগুলো বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
Brinda Chowdhury
লেখক / প্রতিবেদক

Brinda Chowdhury

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।