বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও জাতিসংঘের তীব্র বাজেট সংকটের মধ্যে নতুন মহাসচিব নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের উত্তরসূরি হওয়ার দৌড়ে রয়েছেন আটজন প্রার্থী—পাঁচ নারী ও তিন পুরুষ। জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব
প্রার্থীদের মধ্যে প্রথম অনানুষ্ঠানিক ভোটে এগিয়ে রয়েছেন কোস্টারিকার সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ও জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার (আঙ্কটাড) প্রধান রেবেকা গ্রিনস্প্যান। তবে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য দেশগুলোর অবস্থান ভিন্ন হওয়ায় শেষ পর্যন্ত কে এগিয়ে থাকবেন, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন।
আরও পড়ুনঃ তিন সচিব পদে রদবদল, ১১ দিনের মাথায় ফের বদলি রফিকুল আই মোহাম্মদ
জাতিসংঘের মহাসচিব নির্বাচনে প্রথমে ১৫ সদস্যের নিরাপত্তা পরিষদ একজন প্রার্থীকে সুপারিশ করবে। এরপর তাঁর নাম সাধারণ পরিষদের অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে। নির্বাচিত হতে একজন প্রার্থীকে নিরাপত্তা পরিষদের অন্তত নয়টি ভোট পেতে হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, ফ্রান্স ও রাশিয়ার কোনো স্থায়ী সদস্যের ভেটো এড়াতে হবে। ফলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে বড় শক্তিগুলোর অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রেবেকা গ্রিনস্প্যান
কোস্টারিকার সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট রেবেকা গ্রিনস্প্যান বর্তমানে জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা আঙ্কটাডের মহাসচিব। প্রার্থিতা নিয়ে প্রচারণার জন্য তিনি সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে ছুটি নিয়েছেন।
২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যে কৃষ্ণসাগর দিয়ে খাদ্যশস্য রপ্তানি সচল রাখতে করা ‘ব্ল্যাক সি গ্রেইন ইনিশিয়েটিভ’ নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
৭০ বছর বয়সী গ্রিনস্প্যান নিজের পারিবারিক ইতিহাসও প্রচারণায় তুলে ধরেছেন। তাঁর বাবা-মা হলোকাস্ট থেকে বেঁচে গিয়ে পরে কোস্টারিকায় অভিবাসী হন।
মিশেল বাচেলেত
চিলির সাবেক প্রেসিডেন্ট মিশেল বাচেলেত জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। অগাস্তো পিনোশের শাসনামলে নির্যাতনের শিকার হওয়া বাচেলেত ২০০৬ সালে চিলির প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
চীনের উইঘুর মুসলিমদের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের প্রতিবেদনের কারণে বেইজিংয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হয়।
৭৪ বছর বয়সী বাচেলেতের মতে, বড় শক্তিগুলোর চাপের মধ্যেও জাতিসংঘের মহাসচিবকে নৈতিক অবস্থান ধরে রাখতে হবে। মেক্সিকো ও ব্রাজিল তাঁর প্রার্থিতাকে সমর্থন করলেও চিলি পরে সমর্থন প্রত্যাহার করেছে।
মারিয়া ফার্নান্দা এসপিনোসা
ইকুয়েডরের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাবেক সভাপতি মারিয়া ফার্নান্দা এসপিনোসা জাতিসংঘকে বিশ্বের অভিন্ন সমস্যার সমাধানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সর্বজনীন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখেন।
৬১ বছর বয়সী এসপিনোসা জাতিসংঘে সংস্কারের পক্ষে। সংঘাতের সম্ভাব্য লক্ষণ আগেই শনাক্ত করতে তিনি একটি আন্তর্জাতিক ‘আগাম সতর্কতা’ ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন। অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডা তাঁর প্রার্থিতাকে সমর্থন করলেও নিজ দেশ ইকুয়েডর তাঁকে সমর্থন করেনি।
রাফায়েল গ্রসি
আর্জেন্টিনার কূটনীতিক রাফায়েল গ্রসি ২০১৯ সাল থেকে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং ইউক্রেনের জাপোরিঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ঘিরে আন্তর্জাতিক সংকটে তাঁর ভূমিকা তাঁকে বিশ্ব কূটনীতিতে পরিচিত করেছে।
৬৫ বছর বয়সী গ্রসি মহাসচিব পদে প্রচারণা চালালেও আইএইএর দায়িত্ব ছাড়েননি। তাঁর যুক্তি, সংকটের সময় দায়িত্ব ছেড়ে প্রচারণায় নামা দায়িত্বের প্রতি অবহেলার শামিল হবে।
জাতিসংঘকে আরও কার্যকর করতে মহাসচিবের সক্রিয় ভূমিকার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন গ্রসি।
ক্যারোলিন রড্রিগেস-বির্কেট
গায়ানার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্যারোলিন রড্রিগেস-বির্কেট বর্তমানে জাতিসংঘে দেশটির রাষ্ট্রদূত। ৫২ বছর বয়সী এই কূটনীতিকের মতে, বৈশ্বিক অঙ্গনে জাতিসংঘকে তার হারানো বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধার করতে হবে।
তিনি মনে করেন, শান্তি ও নিরাপত্তার পাশাপাশি উন্নয়ন, মানবাধিকার এবং অন্যান্য বৈশ্বিক ইস্যুতেও জাতিসংঘের ভূমিকা সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ইভোনে এ-বাকি
ইকুয়েডরের কূটনীতিক ও রাজনীতিক ইভোনে এ-বাকি ওয়াশিংটনে দেশটির রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রে দায়িত্ব পালনকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ তৈরি হয়েছিল বলে মনে করা হয়।
৭৫ বছর বয়সী এ-বাকি কাতারেও ইকুয়েডরের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। লেবানিজ বাবা-মায়ের সন্তান এই কূটনীতিক ১৯৯৫ সালের সীমান্তযুদ্ধের পর ইকুয়েডর ও পেরুর মধ্যে সংলাপ এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখেন।
যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে শিক্ষা নিয়ে জাতিসংঘ সনদের শান্তির অঙ্গীকার বাস্তবায়নে কাজ করার প্রত্যয় জানিয়েছেন তিনি।
ম্যাকি সাল
সেনেগালের সাবেক প্রেসিডেন্ট ম্যাকি সাল আট প্রার্থীর মধ্যে ল্যাটিন আমেরিকার বাইরের একমাত্র প্রার্থী। দীর্ঘদিনের প্রথা অনুযায়ী পরবর্তী মহাসচিব ল্যাটিন আমেরিকা অঞ্চল থেকে আসার সম্ভাবনা থাকলেও সাল সেই ধারায় ব্যতিক্রম।
৬৪ বছর বয়সী সাল শান্তি ও উন্নয়নের পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। আফ্রিকান ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান বুরুন্ডি তাঁকে প্রার্থী হিসেবে প্রস্তাব করেছে এবং শেষ পর্যন্ত সেনেগালের সমর্থনও পেয়েছেন।
তবে সেনেগালে তাঁর শাসনামলে রাজনৈতিক বিক্ষোভ দমনে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে এসব বিক্ষোভে কয়েক ডজন মানুষ নিহত হওয়ার দাবি করা হয়েছে।
ওলার ওতুন্নু
উগান্ডার সাবেক কূটনীতিক ওলার ওতুন্নু ১৯৯৭ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘে শিশু ও সশস্ত্র সংঘাতবিষয়ক আন্ডার-সেক্রেটারি জেনারেল ও বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
৭৫ বছর বয়সী ওতুন্নু জাতিসংঘে উগান্ডার রাষ্ট্রদূত এবং অল্প সময়ের জন্য দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছেন।
২০১১ সালের নির্বাচনে তিনি উগান্ডা পিপলস কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ছিলেন। তবে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা ইয়োওয়েরি মুসেভেনির কাছে পরাজিত হন।
সিদ্ধান্তে বড় শক্তির ভূমিকা
জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব নির্বাচনের লড়াইয়ে প্রার্থীদের ব্যক্তিগত যোগ্যতা ও কূটনৈতিক অভিজ্ঞতার পাশাপাশি বড় শক্তিগুলোর রাজনৈতিক সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পাঁচ সদস্য—যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, ফ্রান্স ও রাশিয়া—যে কোনো প্রার্থীকে ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। ফলে প্রথম অনানুষ্ঠানিক ভোটে কোনো প্রার্থী এগিয়ে থাকলেও চূড়ান্ত ফল নির্ভর করবে নিরাপত্তা পরিষদের ভেতরের সমঝোতা এবং ভূরাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের ওপর।
বিশ্ব যখন একাধিক যুদ্ধ, পরাশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা, অর্থনৈতিক চাপ ও বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন নতুন মহাসচিবের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে জাতিসংঘকে আরও কার্যকর, গ্রহণযোগ্য ও ঐক্যবদ্ধ রাখা।




