আজ গৃহীর ভগবান শ্যামাচরণ লাহিড়ী মহাশয়ের জন্মদিবস

আজ গৃহীর ভগবান শ্যামাচরণ লাহিড়ী মহাশয়ের জন্মদিবস
যোগীরাজ শ্যামাচরণ লাহিড়ী

আজ ৩০ সেপ্টেম্বর। যোগসাধনার ইতিহাসে এই দিনটি বিশেষভাবে স্মরণীয় যোগীরাজ শ্যামাচরণ লাহিড়ী মহাশয়ের অনুসারীদের কাছে। প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, ১৮২৮ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর নদীয়া জেলার ঘূর্ণি গ্রামে এক ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন শ্যামাচরণ লাহিড়ী মহাশয়। বাংলা ১২৩৫ সালের ১৬ আশ্বিন ভাদ্রকৃষ্ণা সপ্তমী তিথিতে তাঁর আবির্ভাব ঘটে বলে ভক্তদের মধ্যে বিশ্বাস রয়েছে।

পরবর্তী সময়ে তিনি ‘লাহিড়ী মহাশয়’ ও ‘যোগীরাজ’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন। তাঁর সাধনজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বর্ণনা করা হয় হিমালয়ের রানিক্ষেত ও দ্রোণগিরি পর্বতের সঙ্গে তাঁর যোগসূত্রকে। গৃহস্থ জীবন বজায় রেখেও আধ্যাত্মিক সাধনা করা এবং ক্রিয়াযোগের শিক্ষা প্রচার করা ছিল তাঁর জীবনদর্শনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

শৈশব ও শিক্ষাজীবন

শ্যামাচরণ লাহিড়ী ছিলেন গৌরমোহন লাহিড়ী ও মুক্তকেশী দেবীর কনিষ্ঠ পুত্র। শৈশবেই পারিবারিক জীবনে নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে হয় তাঁকে। পূর্বপুরুষের বাড়ি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর তাঁর পরিবার বারাণসীতে চলে যায়। সেখানেই তাঁর জীবনের বড় একটি সময় অতিবাহিত হয়।

বারাণসীতে তাঁর পিতা ধর্মীয় ও শাস্ত্রীয় শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করেন। বেদশিক্ষার পাশাপাশি শ্যামাচরণ বাংলা, সংস্কৃত, ফার্সি, ফরাসি, ইংরেজি, হিন্দি ও উর্দু ভাষার শিক্ষাও গ্রহণ করেন বলে প্রদত্ত জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে। গঙ্গাস্নান, বেদপাঠ ও পূজা তাঁর পারিবারিক জীবনের নিয়মিত অংশ ছিল।

১৮৪৬ সালে কাশীমণি দেবীর সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। তাঁদের দুই পুত্র ও তিন কন্যা ছিল। পরবর্তী সময়ে কাশীমণি দেবীও তাঁর আধ্যাত্মিক সাধনার সঙ্গে যুক্ত হন এবং শিষ্যদের কাছে ‘গুরুমা’ হিসেবে পরিচিতি পান বলে উৎসে উল্লেখ রয়েছে।

কর্মজীবন থেকে হিমালয়ের পথে

শ্যামাচরণ লাহিড়ী কর্মজীবনে ব্রিটিশ সরকারের সামরিক প্রকৌশল বিভাগের হিসাবরক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। চাকরির প্রয়োজনে ভারতের বিভিন্ন স্থানে তাঁকে যেতে হয়। ১৮৬১ সালে তাঁকে দানাপুর থেকে হিমালয়ের পাদদেশে রানিক্ষেতে বদলি করা হয়।

রানিক্ষেতে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি পাহাড়ি প্রকৃতির প্রতি তাঁর আকর্ষণ তৈরি হয়। স্থানীয়দের কাছ থেকে তিনি দ্রোণগিরি পর্বতের যোগসাধনার ঐতিহ্যের কথা জানতে পারেন। এরপর সেখানে যাওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা তাঁর মধ্যে তৈরি হয়।

দ্রোণগিরিতে মহাবতার বাবাজির সঙ্গে সাক্ষাতের বর্ণনা

প্রচলিত জীবনী ও ভক্তদের বর্ণনা অনুযায়ী, দ্রোণগিরির একটি গুহায় শ্যামাচরণ লাহিড়ীর সঙ্গে এক জটাধারী যোগীর সাক্ষাৎ হয়। সেই যোগী তাঁকে নাম ধরে ডাকেন এবং জানান, শ্যামাচরণের সঙ্গে তাঁর পূর্বজন্মের সাধনার সম্পর্ক রয়েছে। পরে সেই যোগীকে মহাবতার বাবাজি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

ভক্তদের বর্ণনা অনুযায়ী, বাবাজি মহারাজ তাঁকে পূর্বজন্মের সাধনার সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু উপকরণ দেখান এবং গৃহী অবস্থায় থেকেই যোগসাধনার পথ অনুসরণের নির্দেশ দেন। এখানেই শ্যামাচরণ লাহিড়ী ক্রিয়াযোগের দীক্ষা লাভ করেন বলে তাঁর অনুসারীদের মধ্যে প্রচলিত।

বর্ণনা অনুযায়ী, শ্যামাচরণ তখন সংসার ত্যাগ করে হিমালয়ে থেকে যেতে চাইলেও বাবাজি তাঁকে তা করতে দেননি। বরং পরিবার ও কর্মজীবনের দায়িত্ব পালন করে সাধারণ মানুষের মধ্যেই থেকে সাধনা চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। এ কারণে পরবর্তী সময়ে তাঁকে ‘গৃহী যোগী’ বা ‘গৃহী সন্ন্যাসী’ হিসেবে বিশেষভাবে স্মরণ করা হয়।

ক্রিয়াযোগ প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা

হিমালয় থেকে ফিরে শ্যামাচরণ লাহিড়ী বারাণসীতে বসবাস শুরু করেন এবং ক্রিয়াযোগের শিক্ষা দিতে থাকেন। ধীরে ধীরে তাঁর কাছে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আসতে শুরু করেন। তিনি ছোট ছোট আধ্যাত্মিক সভা আয়োজন করতেন এবং গীতার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন বলে উৎসে উল্লেখ রয়েছে।

তাঁর শিক্ষার একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল—আধ্যাত্মিক সাধনার জন্য সংসার ত্যাগ অপরিহার্য নয়। গৃহস্থ জীবন ও কর্মজীবনের দায়িত্ব পালন করেও ঈশ্বরসাধনা করা সম্ভব—এমন ধারণাকে তিনি গুরুত্ব দেন। তাঁর শিক্ষায় ধর্মকে সর্বজনীন ও মানবজীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি বিষয় হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

উৎসের বর্ণনা অনুযায়ী, তৎকালীন সামাজিক বিভাজনের মধ্যেও তিনি বিভিন্ন ধর্মের মানুষের কাছে ক্রিয়াযোগের শিক্ষা উন্মুক্ত রেখেছিলেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য শিষ্যদের মধ্যে পঞ্চানন ভট্টাচার্য, শ্রীযুক্তেশ্বর গিরি, প্রণবানন্দ, কেশবানন্দ ব্রহ্মচারী, ভূপেন্দ্রনাথ সান্যাল এবং পরমহংস যোগানন্দের পিতামাতার নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

ত্রৈলঙ্গ স্বামীর সঙ্গে সাক্ষাৎ

শ্যামাচরণ লাহিড়ীর সঙ্গে ত্রৈলঙ্গ স্বামীর সাক্ষাতের কথাও তাঁর জীবনকথায় বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়। প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, বারাণসীর পঞ্চগঙ্গা ঘাটে দুই সাধকের সাক্ষাৎ হয়েছিল। ত্রৈলঙ্গ স্বামী তাঁকে বিশেষ সম্মান দেখিয়েছিলেন বলে ভক্তদের বর্ণনায় পাওয়া যায়।

কর্মজীবন ও সাধনা পাশাপাশি

শ্যামাচরণ লাহিড়ী দীর্ঘদিন কর্মজীবনের পাশাপাশি ক্রিয়াযোগের শিক্ষকতা চালিয়ে যান। ১৮৮৬ সালে পেনশনে অবসর নেওয়া পর্যন্ত তিনি পরিবার ও চাকরির দায়িত্ব পালন করেন এবং একই সঙ্গে তাঁর কাছে আসা মানুষদের আধ্যাত্মিক শিক্ষা দিতেন বলে উৎসে উল্লেখ রয়েছে।

তাঁর জীবনদর্শনে গৃহস্থ মানুষের জন্য বিশেষ একটি বার্তা ছিল—সংসার ও দায়িত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়েও আধ্যাত্মিক সাধনা করা যায়। এই ভাবনাই পরবর্তী সময়ে তাঁকে অন্য অনেক সাধকের থেকে স্বতন্ত্র পরিচিতি দেয়।

মহাপ্রয়াণ

প্রদত্ত জীবনবৃত্তান্ত অনুযায়ী, ১৮৯৫ সালে শ্যামাচরণ লাহিড়ী তাঁর ঘনিষ্ঠ শিষ্যদের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে তাঁর পৃথিবীর জীবন শেষ হওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছে। একই বছর ২৬ সেপ্টেম্বর দুর্গাপূজার মহাষ্টমীর সন্ধিক্ষণে তিনি দেহত্যাগ করে মহাসমাধি লাভ করেন বলে তাঁর অনুসারীদের মধ্যে প্রচলিত।

তাঁর মৃত্যুর পরও ক্রিয়াযোগের শিক্ষা বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর শিষ্য-পরম্পরার মাধ্যমে এই সাধনপদ্ধতি ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিচিতি লাভ করে।

শ্যামাচরণ লাহিড়ীর শিক্ষার মূল কথা

শ্যামাচরণ লাহিড়ীর দর্শনের অন্যতম কেন্দ্র ছিল আত্মসাধনা, কর্মের মধ্যে থেকে আধ্যাত্মিক জীবনযাপন এবং সর্বজনীনতার ধারণা। তাঁর শিক্ষার সঙ্গে গীতা, কর্মযোগ ও ক্রিয়াযোগের সম্পর্ক বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়।

ভক্তদের কাছে তাঁর জীবন তাই শুধু একজন যোগসাধকের জীবন নয়; বরং সংসার, কর্ম ও আধ্যাত্মিক সাধনাকে একই ধারায় পরিচালনার একটি দৃষ্টান্ত। তাঁর অনুসারীরা মনে করেন, সাধারণ জীবনযাপন করেও আত্মিক উন্নতির পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব—লাহিড়ী মহাশয়ের জীবন সেই শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

আজ তাঁর আবির্ভাব তিথিতে দেশ-বিদেশের অনুসারীরা প্রার্থনা, ধ্যান, ক্রিয়াযোগ অনুশীলন ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁকে স্মরণ করছেন।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
Brinda Chowdhury
সংবাদ প্রতিনিধি

Brinda Chowdhury

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।