আজ শ্রীল ভক্তিপ্রজ্ঞান যতি গোস্বামী মহারাজের আবির্ভাব তিথি

আজ শ্রীল ভক্তিপ্রজ্ঞান যতি গোস্বামী মহারাজের আবির্ভাব তিথি
যতি গোস্বামী মহারাজের আবির্ভাব

আজ ত্রিদণ্ডী স্বামী শ্রীমদ্ভক্তিপ্রজ্ঞান যতি গোস্বামী মহারাজের আবির্ভাব তিথি। বৈষ্ণব দর্শন, ধর্মীয় শিক্ষা, শাস্ত্রচর্চা ও আধ্যাত্মিক প্রচারে তাঁর দীর্ঘ কর্মময় জীবন স্মরণ করছেন ভক্ত ও অনুসারীরা।

এ উপলক্ষে রাজধানী ঢাকার শ্রীশ্রী মাধ্বগৌড়ীয় মঠে তাঁর আবির্ভাব তিথি পূজার আয়োজন করা হয়েছে। তিনি দীর্ঘ ২৮ বছর শ্রীচৈতন্যমঠ এবং এর অধীন গৌড়ীয় মঠগুলোর আচার্যপাদের দায়িত্ব পালন করেন।

শৈশব ও আধ্যাত্মিকতার প্রতি আকর্ষণ

১৯৩০ সালের ভাদ্র মাসের কৃষ্ণা নবমী তিথিতে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার একটি সম্ভ্রান্ত ও ধর্মনিষ্ঠ পরিবারে তাঁর আবির্ভাব। পারিবারিক পরিবেশেই উপনয়নসহ বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে।

জাগতিক শিক্ষার পাশাপাশি শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে আধ্যাত্মিকতা, বৈরাগ্য এবং সংসারজীবনের প্রতি অনাসক্তির লক্ষণ প্রকাশ পেতে থাকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধর্মীয় শাস্ত্র ও সাধন-ভজনের প্রতি তাঁর আগ্রহ আরও গভীর হয়।

গৌড়ীয় বৈষ্ণব সাধনায় প্রবেশ

১৯৫০ সালে তিনি শ্রীধাম মায়াপুরের আকর মঠরাজ শ্রীচৈতন্য মঠে আশ্রয় গ্রহণ করেন। সেখানে প্রভুপাদপ্রেষ্ঠ শ্রীমদ্ভক্তি তীর্থ গোস্বামী মহারাজের চরণাশ্রিত হয়ে পাঞ্চরাত্রিক দীক্ষা গ্রহণ করেন। দীক্ষার পর তাঁর নাম হয় শ্রী নন্দদুলাল ব্রহ্মচারী, ভক্তিবৈভব।

১৯৫২ সালে শ্রীভক্তিবিলাস তীর্থ মহারাজ তাঁকে শ্রীচৈতন্য মঠের মাদ্রাজ বা বর্তমান চেন্নাই শাখায় পাঠান। সেখানে তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা ও নিষ্ঠার কারণে পরবর্তীকালে তিনি মঠের সম্পাদকের দায়িত্ব লাভ করেন।

১৯৬৯ সালে তিনি শ্রীভক্তিবিলাস তীর্থ মহারাজের শিষ্যদের মধ্যে প্রথম ত্রিদণ্ডী সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। এরপর তাঁর নাম হয় ত্রিদণ্ডী স্বামী শ্রীমদ্ভক্তিপ্রজ্ঞান যতি গোস্বামী মহারাজ।

দক্ষিণ ভারতে ব্যাপক ধর্মপ্রচার

সন্ন্যাস গ্রহণের পর দক্ষিণ ভারতকে কেন্দ্র করে তিনি ব্যাপক ধর্মপ্রচার চালান। পরবর্তীতে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলেই বৈষ্ণব দর্শন ও গৌড়ীয় মতবাদ প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

তাঁর উদ্যোগে বিভিন্ন ধর্মীয় ও দার্শনিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। বিশেষ করে মাদ্রাজের গৌড়ীয় মঠ ধীরে ধীরে ধর্মীয় ও দার্শনিক চর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়।

তাঁর সঙ্গে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের আচার্য, পণ্ডিত, শিক্ষাবিদ এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের যোগাযোগ গড়ে ওঠে। ভারতের রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি, সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও শিক্ষাবিদদের সঙ্গেও তাঁর মতবিনিময়ের সুযোগ হয়।

বৈষ্ণব সম্মেলন ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা

সর্বভারতীয় বৈষ্ণব সমাজের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি দক্ষিণ ভারতে তিনটি সর্বভারতীয় বৈষ্ণব সম্মেলনের আয়োজন করেন। পরবর্তীতে ১৯৮৯ সালে শ্রীধাম মায়াপুরে অনুষ্ঠিত হয় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈষ্ণব সম্মেলন।

এসব আয়োজনের মাধ্যমে ভারতের বিভিন্ন বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের আচার্য, দার্শনিক ও পণ্ডিতদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ তৈরি হয়।

তিনি মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়, উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্ম ও দর্শন বিষয়ে বক্তৃতা দেন। বিভিন্ন কলেজ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক সংগঠন, থিয়োসফিক্যাল সোসাইটি, রোটারি ক্লাব ও আলোচনা সভাতেও তিনি বক্তব্য রাখেন। বেতার ও দূরদর্শনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও তাঁর ধর্মীয় ও দার্শনিক বক্তব্য প্রচারিত হয়েছে।

শাস্ত্র অনুবাদ ও গ্রন্থ রচনা

গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শনকে বৃহত্তর পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে তিনি ব্যাপক গ্রন্থ অনুবাদ ও রচনার কাজ করেন। ষড় গোস্বামীর দর্শন ও চিন্তাধারাকে অনুসরণ করে তিনি বহু গুরুত্বপূর্ণ বৈষ্ণব ও সনাতন ধর্মীয় গ্রন্থ ইংরেজিতে অনুবাদ করেন এবং নিজস্ব ব্যাখ্যা ও টীকা সংযোজন করেন।

তাঁর উল্লেখযোগ্য অনুবাদ ও গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ছয় খণ্ডে শ্রীমদ্ভাগবত, দ্বাদশ উপনিষদসমূহ, শ্রীহরিভক্তি সুধোদয়, নারদভক্তি সূত্র, শাণ্ডিল্য ভক্তিসূত্র, বৃহৎ ভাগবতামৃত, শ্রীচৈতন্যচন্দ্রামৃত ও শ্রীভাগবত-অর্ক-মরীচি-মালা।

এ ছাড়া তিনি ‘সনাতন ধর্ম’, ‘ভক্তিযোগে শ্রীগীতা দর্শন’, ‘গৌড়ীয় বৈষ্ণব আন্দোলনের নবজাগরণ’, ‘দ্য স্পেক্স অব শ্রীচৈতন্য’ এবং ‘ফেসেটস অব ট্রুথ’-এর মতো গ্রন্থ রচনা করেন।

তিনি ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত ‘The Gaudiya’ এবং বাংলায় প্রকাশিত ‘শ্রীগৌড়ীয়’ পত্রিকার প্রধান সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। এসব প্রকাশনার মাধ্যমে গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শন, আধ্যাত্মিক বিজ্ঞান ও শ্রীচৈতন্যমঠের উদ্দেশ্য সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরা হতো।

আচার্যপাদ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ

১৯৯০ সালে তিনি বিশ্ববৈষ্ণব রাজসভার আয়োজন করেন। দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার পর এই আয়োজন পুনরায় শুরু করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

একই বছরে কলকাতার শ্রীচৈতন্য রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রজতজয়ন্তী উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ২৯ জুন থেকে ৫ জুলাই পর্যন্ত আয়োজিত এ কর্মসূচিতে বিভিন্ন ধর্মীয় ও গবেষণামূলক কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়।

১৯৯০ সালের ব্যাসপূজা দিবসে শ্রীমদ্ভক্তিপ্রজ্ঞান যতি গোস্বামী মহারাজকে শ্রীচৈতন্যমঠ এবং এর শাখা গৌড়ীয় মঠগুলোর আচার্যপাদ হিসেবে অভিষিক্ত করা হয়।

এরপর দীর্ঘ ২৮ বছর তিনি আচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শন, শাস্ত্রচর্চা ও আধ্যাত্মিক শিক্ষার প্রচারে কাজ করে যান।

নিত্যলীলায় প্রবেশ

২০১৮ সালের ১৮ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার ব্রহ্মমুহূর্তে কলকাতার রাসবিহারী অ্যাভিনিউয়ে অবস্থিত শ্রীচৈতন্য রিসার্চ ইনস্টিটিউটে তিনি নিত্যলীলায় প্রবেশ করেন।

পরদিন শ্রীধাম মায়াপুরের আকর মঠরাজ শ্রীচৈতন্য মঠে রাধাকুণ্ডের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

শ্রীল ভক্তিপ্রজ্ঞান যতি গোস্বামী মহারাজের জীবন ছিল শাস্ত্রচর্চা, বৈষ্ণব দর্শনের প্রচার, ধর্মীয় শিক্ষা এবং গৌড়ীয় বৈষ্ণব সংস্কৃতির প্রসারে নিবেদিত। তাঁর অনুবাদ, গ্রন্থ রচনা, বক্তৃতা ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড বৈষ্ণব দর্শনের প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
Brinda Chowdhury
লেখক / প্রতিবেদক

Brinda Chowdhury

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।