ঘরে বসেই কোম্পানি নিবন্ধন. কোম্পানি নিবন্ধনের প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা ও দাপ্তরিক জটিলতা কমাতে বড় ধরনের ডিজিটাল পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সিঙ্গাপুরের দ্রুতগতির ব্যবসা নিবন্ধন ব্যবস্থার আদলে যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তর (আরজেএসসি) চালু করতে যাচ্ছে ইলেকট্রনিক বিজনেস রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম (eBRS)।
নতুন এই ব্যবস্থা পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে উদ্যোক্তাদের কোম্পানি নিবন্ধনের জন্য আরজেএসসি কার্যালয়ে সরাসরি যেতে হবে না। অনলাইনে কোম্পানির নাম ছাড়পত্রের আবেদন থেকে শুরু করে চূড়ান্ত নিবন্ধন পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার সুযোগ তৈরি হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রয়োজনীয় যাচাই দ্রুত শেষ করে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নিবন্ধন সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আরজেএসসির কার্যক্রম আধুনিকায়ন নিয়ে আয়োজিত এক সভায় eBRS বাস্তবায়নের অগ্রগতি তুলে ধরা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খান। প্রধান অতিথি ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
সভায় বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, উদ্যোক্তাদের সেবা সহজ করতে আরজেএসসির কার্যক্রম ধাপে ধাপে সম্পূর্ণ অটোমেশনের আওতায় আনা হচ্ছে। এর ফলে ঘরে বসেই কম সময়ে কোম্পানি নিবন্ধনের সুযোগ পাবেন ব্যবসায়ীরা।
NID, e-TIN ও মোবাইল নম্বর অনলাইনে যাচাই
eBRS-এ আবেদন প্রক্রিয়াকে আরও নির্ভুল ও নিরাপদ করতে জাতীয় পরিচয়পত্র (NID), ই-টিন (eTIN) এবং মোবাইল নম্বরের তথ্য রিয়েল-টাইমে যাচাইয়ের ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। আবেদনের সময় দেওয়া তথ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারি ডাটাবেজের তথ্য মিলিয়ে দেখার মাধ্যমে ভুল, অসংগতি কিংবা জালিয়াতির সম্ভাবনা কমানো হবে।
আরও পড়ুনঃ বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ক আরও বিস্তৃত হবে: শিক্ষামন্ত্রী
এর ফলে আবেদন যাচাইয়ে কর্মকর্তাদের ওপর নির্ভরতা কমার পাশাপাশি নিবন্ধন প্রক্রিয়াও দ্রুততর হওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
MOA-AOA ব্যবস্থায় থাকছে তিন বিকল্প
কোম্পানি গঠনের আইনি নথি প্রস্তুতের ক্ষেত্রেও সহজীকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উদ্যোক্তাদের জন্য সংঘস্মারক বা MOA এবং সংঘবিধি বা AOA-এর তিন ধরনের বিকল্প রাখা হচ্ছে।
এর মধ্যে রয়েছে—
- স্ট্যান্ডার্ড MOA ও AOA;
- ব্যবসার প্রয়োজন অনুযায়ী ধারা সংযোজনের সুযোগসহ কাস্টমাইজড MOA ও AOA;
- পূর্বানুমোদিত মানসম্মত প্রি-অ্যাপ্রুভড MOA ও AOA।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, মডেল ও প্রি-অ্যাপ্রুভড নথির ব্যবহার বাড়ানো গেলে আবেদন যাচাই এবং অনুমোদনের সময় আরও কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
eBRS উন্নয়নে বুয়েটের কারিগরি সহায়তা
নতুন ব্যবস্থার সফটওয়্যার উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন। সফটওয়্যারের বিভিন্ন উন্নয়ন ধাপ পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় কারিগরি নির্দেশনাও দিচ্ছে বিশেষজ্ঞ দলটি।
ইতোমধ্যে eBRS-এর নিবন্ধন মডিউলের ইউজার অ্যাকসেপ্টেন্স টেস্ট (UAT) সম্পন্ন হয়েছে। পরীক্ষায় পাওয়া ব্যবহারকারীদের মতামতের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন ও পরিমার্জনের কাজও শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
আরও পড়ুনঃ জনপ্রশাসনের এডিপি প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের নির্দেশ
সরকারি ডাটাবেজের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে eBRS
কোম্পানি নিবন্ধনের পুরো প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয় করতে eBRS-এর সঙ্গে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানের ডাটাবেজ যুক্ত করা হচ্ছে।
NID ও ভোটারসংক্রান্ত তথ্য যাচাইয়ের জন্য নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে, উদ্যোক্তার মোবাইল সিমের তথ্য যাচাইয়ে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (BTRC) সঙ্গে এবং ক্লাউডভিত্তিক নিরাপত্তা ও নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ডাটা সেন্টার কোম্পানি লিমিটেডের (BDCCL) সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের কাজ এগিয়ে চলছে।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, এসব ইন্টিগ্রেশনের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
২০২৭ সালের জানুয়ারিতে চূড়ান্ত হস্তান্তর
প্রশাসনিক অনুমোদন অনুযায়ী সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ডাইনামিক সলিউশন লিমিটেডকে (DSI) ২০২৭ সালের ১৫ জানুয়ারির মধ্যে eBRS-এর চূড়ান্ত রূপান্তর ও হস্তান্তর সম্পন্ন করতে বলা হয়েছে।
তবে পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় নাম ছাড়পত্র বা ‘অটো নেম ক্লিয়ারেন্স’ ব্যবস্থা চালুর আগে এর ব্যাক-এন্ড অ্যালগরিদম আরও নির্ভুল করার কাজ চলছে। এই সময় উদ্যোক্তাদের সেবা যাতে ব্যাহত না হয়, সে জন্য একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
প্রথম ছয় মাসে কয়েক ঘণ্টায় নিবন্ধনের লক্ষ্য
পরিকল্পনা অনুযায়ী, eBRS চালুর পর প্রথম ছয় মাস আবেদন জমা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নাম ছাড়পত্রসহ প্রয়োজনীয় তথ্য পুনঃযাচাই করবেন। আবেদন ও প্রয়োজনীয় নথি সঠিক থাকলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কোম্পানি নিবন্ধন সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে।
একই সময়ে ব্যবসায়ীদের স্ট্যান্ডার্ড ও মডেল MOA-AOA ব্যবহারে উৎসাহিত করা হবে। পাশাপাশি অটো নেম ক্লিয়ারেন্স ব্যবস্থার অ্যালগরিদম আরও কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় কারিগরি আপডেট চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের জন্য কমবে সময়-খরচ
সংশ্লিষ্টদের মতে, eBRS পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে কোম্পানি নিবন্ধনের ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের সময় ও ব্যয় দুটোই কমবে। অফিসে সরাসরি উপস্থিতির প্রয়োজন কমার পাশাপাশি বিভিন্ন তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাচাই হওয়ায় সেবার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়তে পারে।
বিশেষ করে নতুন উদ্যোক্তা, স্টার্টআপ এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের দ্রুত ব্যবসা শুরু করার ক্ষেত্রে নতুন এই ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সরকারের প্রত্যাশা, আরজেএসসির ডিজিটাল রূপান্তরের মাধ্যমে ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়া সহজ হওয়ার পাশাপাশি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ আরও শক্তিশালী হবে এবং ব্যবসার প্রাথমিক ব্যয় কমবে।
সভায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (আইআইটি) ও আরজেএসসির নিবন্ধক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) শিবির বিচিত্র বড়ুয়াসহ মন্ত্রণালয় ও আরজেএসসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।




