বেসরকারি বাণিজ্যিক সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র বা মার্চেন্ট পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে বিদ্যুৎ কেনার পাইকারি মূল্য এবং জাতীয় সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো ব্যবহারের জন্য ওপেন অ্যাকসেস ট্যারিফ নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নতুন এই হার ঘোষণা করে কমিশন।
বিইআরসির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ৩৩ কেভি সংযোগে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) প্রতি ইউনিট সৌরবিদ্যুৎ কিনবে ৬ টাকা ৯৮ পয়সায়। ১৩২ কেভি সংযোগের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ টাকা ১১ পয়সা।
বড় গ্রাহকের কাছে সরাসরি বিদ্যুৎ বিক্রির সুযোগ
মার্চেন্ট পাওয়ার প্ল্যান্টে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরাসরি বড় গ্রাহকের কাছে বিক্রি করতে পারবেন উদ্যোক্তারা। এ ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ উৎপাদক ও গ্রাহক নিজেদের মধ্যে বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করতে পারবেন।
তবে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য সরকারি সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো ব্যবহার করা হলে সংশ্লিষ্ট হারে ওপেন অ্যাকসেস ট্যারিফ দিতে হবে।
সরকারি সঞ্চালন ও বিতরণ নেটওয়ার্ক ব্যবহারের এই মাশুলই ওপেন অ্যাকসেস ট্যারিফ নামে পরিচিত। সংযোগের ধরন ও বিদ্যুৎ সরবরাহের কাঠামোর ওপর নির্ভর করে প্রতি ইউনিটে এই মাশুল ১ টাকা ২২ পয়সা থেকে ১ টাকা ৯০ দশমিক ৯৭ পয়সা পর্যন্ত হতে পারে।
সঞ্চালন ভোল্টেজ অনুযায়ী মাশুল
বিদ্যুৎকেন্দ্র সরাসরি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত এবং গ্রাহক কোনো সরকারি বিতরণ সংস্থার মাধ্যমে সংযুক্ত থাকলে সঞ্চালন ভোল্টেজ অনুযায়ী মোট মাশুল দিতে হবে।
এ ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিটে মাশুল—
- ২৩০ কেভি: ১ টাকা ৫৯ দশমিক ৮৯ পয়সা
- ১৩২ কেভি: ১ টাকা ৬০ দশমিক ২৫ পয়সা
- ৩৩ কেভি: ১ টাকা ৬০ দশমিক ৯৭ পয়সা
এই মোট মাশুলের মধ্যে সঞ্চালন, বিতরণ, বিদ্যুতের হিসাব ব্যবস্থাপনা এবং বিল নিষ্পত্তির ব্যয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
সঞ্চালন মাশুল হিসেবে ২৩০ কেভিতে প্রতি ইউনিটে ৩৭ দশমিক ৮৯ পয়সা, ১৩২ কেভিতে ৩৮ দশমিক ২৫ পয়সা এবং ৩৩ কেভিতে ৩৮ দশমিক ৯৭ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে।
অন্যদিকে বিদ্যুৎ গ্রহণের প্রান্তে বিতরণ মাশুল হবে প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ১৭ পয়সা। এর সঙ্গে হিসাব ব্যবস্থাপনা ও বিল নিষ্পত্তির জন্য আরও ৫ পয়সা দিতে হবে।
পৃথক বিতরণ সংস্থা হলে বাড়বে মাশুল
বিদ্যুৎকেন্দ্র ও গ্রাহক যদি সঞ্চালন ব্যবস্থার দুই প্রান্তে পৃথক বিতরণ সংস্থার আওতায় থাকেন, তাহলে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রান্তে অতিরিক্ত ৩০ পয়সা বিতরণ মাশুল যুক্ত হবে।
এ ক্ষেত্রে মোট মাশুল দাঁড়াবে—
- ২৩০ কেভি: ১ টাকা ৮৯ দশমিক ৮৯ পয়সা
- ১৩২ কেভি: ১ টাকা ৯০ দশমিক ২৫ পয়সা
- ৩৩ কেভি: ১ টাকা ৯০ দশমিক ৯৭ পয়সা
তবে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও গ্রাহক একই বিতরণ সংস্থার আওতায় থাকলে অতিরিক্ত ৩০ পয়সা দিতে হবে না। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রান্তে বিতরণজনিত লসও আরোপ করা হবে না।
এ ক্ষেত্রে দেশের সব পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিকে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) অধীন একটি বিতরণ সংস্থা হিসেবে গণ্য করা হবে।
সঞ্চালন ব্যবস্থা ব্যবহার না করে একই বিতরণ সংস্থার আওতাভুক্ত বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হলে প্রতি ইউনিটে মোট মাশুল হবে ১ টাকা ২২ পয়সা।
সঞ্চালন ও বিতরণ লসও হিসাব হবে
নির্ধারিত ওপেন অ্যাকসেস ট্যারিফের পাশাপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহের সময় সঞ্চালন ও বিতরণজনিত লসের হিসাবও প্রযোজ্য হবে।
সঞ্চালন লসের ক্ষেত্রে পাওয়ার গ্রিডের প্রতি মাসে প্রকাশিত প্রকৃত গড় হার বিবেচনায় নেওয়া হবে। আর বিতরণ লস নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট ভোল্টেজ পর্যায়ে সর্বশেষ সমাপ্ত অর্থবছরে অর্জিত হার কার্যকর হবে।
বিতরণ সংস্থাভেদে মাশুল
বিইআরসি বিভিন্ন বিতরণ সংস্থার জন্য আলাদা মাশুল নির্ধারণ করেছে। প্রতি ইউনিটে নির্ধারিত হার হলো—
| বিতরণ সংস্থা | মাশুল |
|---|---|
| বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) | ৭০ পয়সা |
| পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) | ১ টাকা ৪৩ পয়সা |
| ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) | ৮৫ পয়সা |
| ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো) | ৯৯ পয়সা |
| ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি | ৮৭ পয়সা |
| নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো) | ১ টাকা ৪ পয়সা |
বিল আদায় ও নিষ্পত্তির দায়িত্ব বিপিডিবির
মার্চেন্ট পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে উৎপাদিত ও সরবরাহ করা বিদ্যুতের হিসাব সংরক্ষণ এবং বিল নিষ্পত্তির সমন্বিত দায়িত্ব পালন করবে বিপিডিবি।
নির্ধারিত হারে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কাছ থেকে বিল আদায়ের পর সংশ্লিষ্ট বিতরণ সংস্থাকে তাদের প্রযোজ্য মাশুল অনুযায়ী অর্থ পরিশোধ করবে বিপিডিবি।
২০২৫ সালে মার্চেন্ট পাওয়ার নীতিমালা
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে ২০২৫ সালে মার্চেন্ট পাওয়ার নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। এই নীতিমালার আওতায় কোনো এলাকায় স্থাপিত বিদ্যুৎকেন্দ্র সরকারি সঞ্চালন ও বিতরণ নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে অন্য এলাকার বড় গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করতে পারবে।
নীতিমালা অনুযায়ী, একটি বাণিজ্যিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তার ঘোষিত মাসিক উৎপাদনের সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ সরকারি বিতরণ সংস্থার কাছে বিক্রি করতে পারবে। অবশিষ্ট বিদ্যুৎ সরাসরি বড় গ্রাহকদের কাছে বিক্রির সুযোগ থাকবে উদ্যোক্তাদের।
আগস্টে গণশুনানি
মার্চেন্ট পাওয়ার প্ল্যান্টের বিদ্যুতের মূল্য এবং জাতীয় গ্রিড ব্যবহারের মাশুল নির্ধারণের বিষয়ে গত ২৩ আগস্ট গণশুনানি করে বিইআরসি।
ওই শুনানিতে কমিশনের কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি সরকারি বিতরণ সংস্থার কাছে বিক্রি করা সৌরবিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিট ৬ টাকা ৪৮ পয়সা নির্ধারণের সুপারিশ করেছিল।
গণশুনানিতে বিপিডিবি ও কয়েকটি বিতরণ কোম্পানি বড় শিল্পগ্রাহক হারিয়ে রাজস্ব কমে যাওয়ার আশঙ্কার কথা জানায়। তাদের বক্তব্য ছিল, শিল্পগ্রাহকরা দিনের বেলায় মার্চেন্ট পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে সৌরবিদ্যুৎ কিনে এবং রাতে আবার বিতরণ কোম্পানির কাছ থেকে বিদ্যুৎ নিতে পারেন। এ ধরনের পরিস্থিতিতে বিতরণ কোম্পানিগুলোর রাজস্ব কাঠামোর ওপর প্রভাব পড়তে পারে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করে।





