আজ ১ অক্টোবর, আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রবীণ নাগরিকদের অধিকার, মর্যাদা, নিরাপত্তা ও কল্যাণ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে প্রতি বছর দিনটি পালন করা হয়।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ১৯৯০ সালের ১৪ ডিসেম্বর গৃহীত ৪৫/১০৬ নম্বর সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ১ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এর আগে ১৯৮২ সালে গৃহীত ভিয়েনা আন্তর্জাতিক কর্মপরিকল্পনা প্রবীণদের কল্যাণ ও অধিকার সুরক্ষার বিষয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করে।
প্রবীণদের সম্মান ও অধিকার
বার্ধক্য মানুষের জীবনের স্বাভাবিক একটি পর্যায়। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়নে দীর্ঘ কর্মজীবনে অবদান রাখা প্রবীণদের শেষ জীবনে সম্মান, নিরাপত্তা ও যত্ন পাওয়ার অধিকার রয়েছে।
তবে বাস্তবে অনেক প্রবীণকে জীবনের শেষ পর্যায়ে নানা ধরনের সামাজিক ও পারিবারিক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হওয়া, একান্নবর্তী পরিবারের সংখ্যা কমে যাওয়া এবং প্রজন্মের মধ্যে দূরত্ব বাড়ার কারণে অনেক প্রবীণ একাকিত্ব ও অবহেলার শিকার হন।
কিছু ক্ষেত্রে সন্তানদের অবহেলা, সম্পদ নিয়ে বিরোধ, পারিবারিক নির্যাতন কিংবা ভরণপোষণের অভাবে প্রবীণদের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় নেন। এমন পরিস্থিতি এড়াতে পরিবার ও সমাজে প্রবীণদের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং মানবিক আচরণ বাড়ানো জরুরি।
বাড়ছে মানুষের গড় আয়ু, বাড়ছে প্রবীণের সংখ্যাও
বিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে বিশ্বজুড়ে মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যাও।
বাংলাদেশেও গত কয়েক দশকে মানুষের গড় আয়ু উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে দেশের জনসংখ্যার একটি ক্রমবর্ধমান অংশ এখন প্রবীণ বয়সে পৌঁছাচ্ছে। ভবিষ্যতে এই প্রবণতা আরও বাড়তে পারে বলে জনসংখ্যাবিষয়ক বিভিন্ন বিশ্লেষণে ধারণা করা হয়।
আরও পড়ুনঃ আন্তর্জাতিক কফি দিবস আজ: কৃষক থেকে ভোক্তা, কফিকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে উৎসব
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে প্রবীণ নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা, আবাসন, বিনোদন ও আর্থিক সহায়তার জন্য নানা ধরনের কর্মসূচি রয়েছে। বাংলাদেশেও প্রবীণদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণমূলক কর্মসূচি ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত হচ্ছে।
প্রবীণদের ভরণপোষণে আইনি সুরক্ষা
বাংলাদেশে বাবা-মায়ের ভরণপোষণ ও দেখাশোনার দায়িত্ব নিশ্চিত করতে ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩’ প্রণয়ন করা হয়েছে। এই আইনের মাধ্যমে সন্তানদের ওপর বাবা-মায়ের ভরণপোষণ ও প্রয়োজনীয় যত্নের দায়িত্ব আইনগতভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় প্রবীণদের জন্য বিভিন্ন সহায়তা কার্যক্রমও পরিচালিত হচ্ছে। তবে শুধু আইন বা সরকারি কর্মসূচির মাধ্যমে প্রবীণদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। পরিবার ও সমাজের মানুষের সচেতনতা এবং দায়িত্বশীল আচরণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আরও পড়ুনঃ বিশ্ব নিরামিষ দিবস আজ: স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সচেতনতায় উদ্ভিদভিত্তিক খাবারের গুরুত্ব
শেষ বয়স হোক নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ
বার্ধক্য কোনো বোঝা নয়; এটি জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও অবদানের পরবর্তী অধ্যায়। একজন প্রবীণের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও জীবনবোধ পরিবার ও সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হতে পারে।
তাই প্রবীণদের একাকিত্ব দূর করা, তাদের মতামতের মূল্য দেওয়া, চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করা এবং পারিবারিক জীবনে সম্মানের সঙ্গে রাখার বিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে।
আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস তাই শুধু একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয়; বরং প্রবীণ নাগরিকদের মর্যাদা, অধিকার, নিরাপত্তা ও মানবিক জীবন নিশ্চিত করার বিষয়ে সামাজিক দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।





