নিজস্ব প্রতিবেদক: গণতান্ত্রিক সমাজে কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের সব বক্তব্যের সঙ্গে একমত হওয়া বাধ্যতামূলক নয়। আবার কোনো সমালোচনা পছন্দ না হলেই তা প্রত্যাখ্যান করাও সঠিক নয় বলে মন্তব্য করেছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তাঁর মতে, ভিন্নমত ও সমালোচনা গ্রহণ করার মানসিকতা গণতান্ত্রিক সমাজের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর লেকশোর গ্র্যান্ড হোটেলে ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের মরণোত্তর গ্রন্থ ‘Bangladesh Jamaat-e-Islami: Its History and Politics’ প্রকাশনা অনুষ্ঠানে প্যানেলিস্ট হিসেবে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এসব কথা বলেন। বইটি প্রকাশ করেছে ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল)।
আইনমন্ত্রী বলেন, আবদুর রাজ্জাকের বইটি তাঁর কাছে শুধু সাহিত্য বা গবেষণাধর্মী গ্রন্থ নয়। এটি একজন মানুষের জীবনদর্শন, চিন্তা, চেতনা এবং সমাজকে দেখার অভিজ্ঞতার প্রতিফলন। বইটিতে লেখকের রাজনৈতিক চিন্তা ও দর্শনেরও প্রতিফলন ঘটেছে।
আরও পড়ুনঃ ডিজিটাল রূপান্তরে যাচ্ছে টিসিবি, এআইয়ে হবে পণ্য বিতরণ মনিটরিং
আবদুর রাজ্জাকের রাষ্ট্র ও সমাজচিন্তার প্রসঙ্গ তুলে ধরে মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ওপর থেকে কোনো ইসলামিক শাসনব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে সমাজ থেকে ইসলামিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গড়ে তোলা এবং পরিচালনা করাই তাঁর চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল। এ বিষয়গুলো বইটিতেও প্রতিফলিত হয়েছে।
নতুন প্রজন্ম ও পরিবর্তনের প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী বলেন, সামনে এগিয়ে যেতে হলে সমাজকে পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান একটি প্রজন্মের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে সামনে এনেছে। আবদুর রাজ্জাকের বইয়েও পরিবর্তন ও রাজনৈতিক চিন্তা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি উঠে এসেছে।
একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নের প্রসঙ্গ
বইয়ে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও সে সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আবদুর রাজ্জাকের মূল্যায়নের বিষয়টিও উঠে এসেছে। এ প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী বলেন, ২০১৬ সালে আবদুর রাজ্জাক জামায়াতে ইসলামীর একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে জাতির সামনে একটি বক্তব্য দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তাঁর ওই বক্তব্য সে সময় গ্রহণ করা হলে দলটির একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে অনেক প্রশ্নের অবসান হতে পারত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আইনমন্ত্রী আরও বলেন, আবদুর রাজ্জাক জামায়াতে ইসলামীর অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও তাঁর কর্ম, চিন্তা ও দর্শনের কারণে সংগঠনের পদমর্যাদার বাইরে নিজস্ব একটি অবস্থান তৈরি হয়েছিল। সমাজ ও আন্তর্জাতিক পরিসরে তাঁর প্রতি যে শ্রদ্ধা তৈরি হয়েছিল, তা তাঁর সাংগঠনিক পদমর্যাদার চেয়েও বড় ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রচারণার বিষয়েও আবদুর রাজ্জাক কাজ করতেন বলে উল্লেখ করেন আইনমন্ত্রী। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক পরিসরে মানবাধিকারের বিষয়কে এ ধরনের প্রচেষ্টার একটি মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়েছিল।
ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ আইনমন্ত্রীর
আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত ও পেশাগত সম্পর্কের স্মৃতিচারণ করে মো. আসাদুজ্জামান বলেন, লন্ডনে গেলে কখনো তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে চা পান করেছেন, আবার কখনো টেলিফোনে কথা বলেছেন।
জীবনের শেষ দিকে হাসপাতালে থাকা অবস্থায় আবদুর রাজ্জাক বাংলাদেশে দাফন হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন বলেও জানান আইনমন্ত্রী। তাঁর সেই ইচ্ছা পূরণ হয়েছে উল্লেখ করে মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন তিনি।
আইনমন্ত্রী বলেন, ‘Bangladesh Jamaat-e-Islami: Its History and Politics’ বিশেষ করে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের পড়া উচিত।
অনুষ্ঠানে প্যানেলিস্ট হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির ডিপার্টমেন্ট অব পলিটিক্স অ্যান্ড গভর্নমেন্টের অধ্যাপক আলী রিয়াজ, ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক Right to Freedom-এর প্রেসিডেন্ট ও সাবেক মার্কিন কূটনীতিক জন ড্যানিলোভিচ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী এবং দ্য ডেইলি স্টারের কনসালটিং এডিটর ও সাবেক মিডিয়া রিফর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান কামাল আহমেদ।
অনুষ্ঠানে বইটির মোড়ক উন্মোচন করা হয়। আবদুর রাজ্জাকের মরণোত্তর প্রকাশিত এই বইয়ে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা এবং দলের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে তাঁর চিন্তা ও অভিজ্ঞতার বিভিন্ন দিক উঠে এসেছে।





