লালমনিরহাট শহরের কালীবাড়ী এলাকায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে একটি মসজিদ ও একটি মন্দির। একদিকে ভেসে আসে আজানের সুর, অন্যদিকে পূজার ঘণ্টা, শঙ্খধ্বনি ও ঢাকের বাদ্য।
ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান আলাদা হলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা ও সহনশীলতার মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে শান্তিপূর্ণভাবে পাশাপাশি ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন দুই সম্প্রদায়ের মানুষ।
কালীবাড়ী এলাকার পুরান বাজার জামে মসজিদ এবং পুরান বাজার কালীবাড়ী কালী ও দুর্গামন্দিরের এই সহাবস্থান স্থানীয়দের কাছে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও মানবিকতার অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, মসজিদ ও মন্দিরের মধ্যকার দূরত্ব মাত্র দুই থেকে তিন ফুট। দুর্গাপূজা উপলক্ষে মন্দিরে চলছে পূজার আনুষ্ঠানিকতা, ভক্তদেরও রয়েছে ব্যাপক সমাগম। এর পাশেই মসজিদে মুসল্লিরা নিয়মিত নামাজ আদায় করছেন।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নামাজের সময় মন্দিরে বাদ্যযন্ত্র বাজানো বন্ধ রাখা হয়। একইভাবে দুই ধর্মের মানুষের পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে নিজ নিজ ধর্মীয় আচার পালন করা হয়। দীর্ঘদিনের এই সমন্বিত সহাবস্থানে বড় ধরনের কোনো বিরোধের ঘটনাও ঘটেনি বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
সম্প্রীতির টানে দূর-দূরান্ত থেকে দর্শনার্থী
মসজিদ ও মন্দিরের এমন পাশাপাশি অবস্থান দেখতে দুর্গাপূজার সময় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে দর্শনার্থীরা কালীবাড়ীতে আসেন। কেউ এখানকার পরিবেশ দেখে মুগ্ধ হন, আবার কেউ স্থানীয়দের কাছ থেকে দুই সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের কথা শোনেন।
কুড়িগ্রাম থেকে আসা ৬০ বছর বয়সী আব্দুল রহমান বলেন, একই আঙিনায় মসজিদ ও মন্দিরের সহাবস্থান তাকে অভিভূত করেছে। কয়েক দশক ধরে এখানে বড় ধরনের কোনো বিরোধ না হওয়াকে তিনি মানবতা ও ধর্মীয় সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখেন।
বগুড়া থেকে আসা ৫০ বছর বয়সী নারায়ণ চক্রবর্তী বলেন, দুর্গাপূজার সময় সুযোগ পেলেই তিনি এখানে আসেন। পাশাপাশি মসজিদ ও মন্দিরের অবস্থান তাকে বারবার শান্তি, সহনশীলতা ও সম্প্রীতির বার্তা দেয়।
নামাজ ও পূজায় পারস্পরিক সম্মান
পুরান বাজার জামে মসজিদের পেশ ইমাম মো. আলাউদ্দিন বলেন, দুই সম্প্রদায়ের মানুষ একে অপরের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখিয়ে চলেন। তাদের মধ্যে কখনো বড় ধরনের কথা-কাটাকাটির ঘটনাও ঘটেনি। মন্দিরের পুরোহিতের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও মতবিনিময় হয় বলেও জানান তিনি।
তার মতে, পারস্পরিক সহানুভূতি, সম্মান ও বোঝাপড়াই দীর্ঘদিন ধরে এই সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক টিকিয়ে রেখেছে।
মন্দির কমিটির সভাপতি ও পুরোহিত শঙ্কর চক্রবর্তী বলেন, নামাজের সময় মন্দিরে বাদ্যযন্ত্র বন্ধ রাখা হয়। অন্যদিকে পূজার সময় মুসলিম প্রতিবেশীরাও বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেন। মন্দিরে ভক্তদের ব্যাপক উপস্থিতি থাকলেও মুসল্লিদের নামাজে যাতে কোনো ধরনের সমস্যা না হয়, সে বিষয়টি সবসময় গুরুত্ব দেওয়া হয়।
শত বছরের বেশি সময় ধরে পাশাপাশি দুই প্রতিষ্ঠান
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৮৩৬ সালে কালীবাড়ী কালীমন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে ওই এলাকায় আসা ব্যবসায়ীরা মন্দিরের পাশে খালি জায়গায় ঘাসের ওপর জায়নামাজ বা চাদর বিছিয়ে নামাজ আদায় করতেন।
এরপর আনুমানিক ১৯১৫ সালের দিকে সেখানে একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়, যা বর্তমানে পুরান বাজার জামে মসজিদ নামে পরিচিত। সেই সময় থেকেই মসজিদ ও মন্দির পাশাপাশি অবস্থান করে নিজ নিজ ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে বলে জানান স্থানীয়রা।
সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, মন্দিরের জমির পরিমাণ ৮ শতাংশ এবং মসজিদের জমি ৫ শতাংশ। মাঝখানে প্রায় ১২ শতাংশ জমি অন্য এক ব্যক্তির মালিকানাধীন। তবে মন্দির ও মসজিদ কমিটির সদস্যদের ভাষ্য, জমির মালিক কখনো ওই জায়গা দখলে নেওয়ার চেষ্টা করেননি।
সম্প্রীতির সম্পর্ক জাতীয় ঐক্যেরও বার্তা
মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক খোরশেদ আলম দুলাল বলেন, দুর্গাপূজা নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে সবসময় সহযোগিতা করা হয়। দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার এই সম্পর্ক শুধু ধর্মীয় সম্প্রীতিই নয়, জাতীয় ঐক্যেরও বার্তা বহন করে।
গত শুক্রবার রাতে কালীবাড়ী দুর্গামন্দির পরিদর্শন করেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু। তিনি বলেন, একই আঙিনায় মসজিদ ও মন্দিরের দীর্ঘদিনের সহাবস্থান দুই ধর্মের মানুষের পারস্পরিক ভালোবাসা, মানবিকতা ও শ্রদ্ধাবোধের প্রতিফলন।
তিনি বলেন, এই সম্প্রীতির কারণেই লালমনিরহাটের কালীবাড়ী দেশজুড়ে পরিচিতি পেয়েছে। সম্প্রীতির এই বন্ধন অটুট রাখতে সবাইকে সহনশীল ও মানবিক হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান বলেন, দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগম হলেও এখানে দীর্ঘদিন ধরে কোনো বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটেনি। প্রতিবছর মন্দির এলাকায় বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং তিনি নিজেও নিয়মিত নিরাপত্তা পরিস্থিতির খোঁজ রাখেন।
জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ রাশেদুল হক প্রধান বলেন, পাশাপাশি মসজিদ ও মন্দিরের অবস্থান ধর্মীয় স্বাধীনতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহনশীলতার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। লালমনিরহাটের এই সহাবস্থান সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করছে।





