আন্তর্জাতিক ওজোন স্তর সুরক্ষা দিবস আজ

আন্তর্জাতিক ওজোন স্তর সুরক্ষা দিবস আজ
আন্তর্জাতিক ওজোন স্তর সুরক্ষা দিবস

আজ ১৬ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক ওজোন স্তর সুরক্ষা দিবস। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের গুরুত্বপূর্ণ এই সুরক্ষাবলয় সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানো এবং ওজোন-ক্ষয়কারী পদার্থের ব্যবহার কমাতে বৈশ্বিক উদ্যোগকে আরও জোরদার করার লক্ষ্যেই প্রতিবছর দিবসটি পালিত হয়।

১৯৮৭ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ওজোন স্তর ধ্বংসকারী পদার্থ নিয়ন্ত্রণে ঐতিহাসিক মন্ট্রিয়ল প্রটোকল স্বাক্ষরিত হয়। এর স্মরণে ১৯৯৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১৬ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক ওজোন স্তর সুরক্ষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে।

ওজোন স্তর কেন গুরুত্বপূর্ণ

ওজোন হলো তিনটি অক্সিজেন পরমাণু দিয়ে গঠিত গ্যাস, যার রাসায়নিক সংকেত O₃। বায়ুমণ্ডলের স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে থাকা ওজোন স্তর সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মির একটি বড় অংশ শোষণ করে। ফলে মানুষ, প্রাণী, উদ্ভিদ ও বিভিন্ন বাস্তুতন্ত্র অতিবেগুনি বিকিরণের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে সুরক্ষা পায়।

এ কারণে ওজোন স্তরকে পৃথিবীর একটি প্রাকৃতিক সুরক্ষাবলয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

যেসব কারণে ওজোন স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হয়

মানুষের ব্যবহৃত কিছু রাসায়নিক পদার্থ দীর্ঘদিন ধরে ওজোন স্তরের ক্ষয়ের জন্য বড় হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ক্লোরোফ্লোরোকার্বন বা সিএফসি, হ্যালন, কার্বন টেট্রাক্লোরাইড, মিথাইল ব্রোমাইডসহ বিভিন্ন ওজোন-ক্ষয়কারী পদার্থ। এসব রাসায়নিকের ব্যবহার একসময় রেফ্রিজারেটর, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, অ্যারোসল ও শিল্পক্ষেত্রে ব্যাপক ছিল।

বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে পৌঁছে এসব পদার্থ থেকে ক্লোরিন ও ব্রোমিনজাত সক্রিয় উপাদান মুক্ত হতে পারে, যা রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে ওজোন অণু ভেঙে দেয়।

মন্ট্রিয়ল প্রটোকলের ঐতিহাসিক ভূমিকা

ওজোন স্তরের ক্ষয় নিয়ে বৈজ্ঞানিক উদ্বেগ বাড়ার পর আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ভিত্তি হিসেবে ১৯৮৫ সালে ভিয়েনা কনভেনশন ফর দ্য প্রোটেকশন অব দ্য ওজোন লেয়ার গৃহীত হয়। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৮৭ সালে স্বাক্ষরিত হয় মন্ট্রিয়ল প্রটোকল।

এই চুক্তির মূল লক্ষ্য ছিল ওজোন-ক্ষয়কারী রাসায়নিকের উৎপাদন ও ব্যবহার ধাপে ধাপে কমিয়ে শেষ পর্যন্ত বন্ধ করা। চুক্তিটির আওতায় প্রায় ১০০টি নিয়ন্ত্রিত রাসায়নিকের উৎপাদন ও ব্যবহারের জন্য পর্যায়ক্রমিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রয়েছে।

আরও পড়ুনঃ আন্তর্জাতিক ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজি দিবস আজ

২০০৯ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ভিয়েনা কনভেনশন ও মন্ট্রিয়ল প্রটোকল জাতিসংঘের ইতিহাসে প্রথম পরিবেশগত চুক্তি হিসেবে সর্বজনীন অনুমোদন লাভ করে।

কিগালি সংশোধনী ও জলবায়ু সুরক্ষা

মন্ট্রিয়ল প্রটোকলের আওতায় ২০১৬ সালে রুয়ান্ডার রাজধানী কিগালিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী গৃহীত হয়। কিগালি সংশোধনীতে হাইড্রোফ্লুওরোকার্বন বা এইচএফসি-এর উৎপাদন ও ব্যবহার ধাপে ধাপে কমানোর বিষয়ে দেশগুলো সম্মত হয়।

এইচএফসি সরাসরি ওজোন স্তর ধ্বংস করে না; তবে এগুলো শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস। তাই এইচএফসি কমানোর উদ্যোগ ওজোন সুরক্ষার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলাতেও গুরুত্বপূর্ণ।

২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য

২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক ওজোন স্তর সুরক্ষা দিবসের প্রতিপাদ্য “Global Action for a Cooler Planet”, যার বাংলা ভাবার্থ—‘শীতলতর পৃথিবীর জন্য বৈশ্বিক উদ্যোগ’

এ বছর কিগালি সংশোধনী গ্রহণের ১০ বছর পূর্তি উপলক্ষে টেকসই শীতলীকরণ প্রযুক্তির প্রসারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জাতিসংঘ ও ইউএনইপির বার্তায় পরিবেশবান্ধব ও জ্বালানি-সাশ্রয়ী কুলিং প্রযুক্তিতে দ্রুত রূপান্তরের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়েছে।

ওজোন স্তর পুনরুদ্ধারের পথে

মন্ট্রিয়ল প্রটোকলের ধারাবাহিক বাস্তবায়নের ফলে ওজোন স্তর পুনরুদ্ধারের পথে রয়েছে। বৈজ্ঞানিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, বর্তমান নীতিগুলো অব্যাহত থাকলে বৈশ্বিক গড় হিসাবে ওজোন স্তর প্রায় ২০৪০ সালের মধ্যে ১৯৮০ সালের কাছাকাছি অবস্থায় ফিরতে পারে। আর্কটিক অঞ্চলে এই সময়কাল প্রায় ২০৪৫ এবং অ্যান্টার্কটিক অঞ্চলে প্রায় ২০৬৬ সাল হতে পারে।

আরও পড়ুনঃ বিস্কিট-ব্রেডের ২০ শতাংশ দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত স্থগিত

এই অগ্রগতি আন্তর্জাতিক পরিবেশ সহযোগিতার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। দীর্ঘমেয়াদি বৈজ্ঞানিক গবেষণা, আন্তর্জাতিক চুক্তি, অর্থায়ন এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতা একসঙ্গে কাজ করলে বৈশ্বিক পরিবেশগত সমস্যা মোকাবিলা করা সম্ভব—মন্ট্রিয়ল প্রটোকল তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

বাংলাদেশের ভূমিকা

বাংলাদেশও ওজোন স্তর সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক উদ্যোগের অংশীদার। দেশে ওজোন-ক্ষয়কারী পদার্থ নিয়ন্ত্রণ, বিকল্প প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং সংশ্লিষ্ট শিল্পখাতে সক্ষমতা উন্নয়নের উদ্যোগ রয়েছে।

বিশেষ করে রেফ্রিজারেশন ও এয়ার কন্ডিশনিং খাতের সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশবান্ধব ও জ্বালানি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে পুরোনো যন্ত্রপাতি থেকে ক্ষতিকর গ্যাসের অনিয়ন্ত্রিত নিঃসরণ ঠেকানো এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিবিদদের প্রশিক্ষণও প্রয়োজন।

আমাদের করণীয়

ওজোন স্তর রক্ষায় শুধু সরকার বা আন্তর্জাতিক সংস্থার উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; ব্যক্তি, পরিবার, প্রতিষ্ঠান ও শিল্পখাতকেও দায়িত্বশীল হতে হবে। নতুন ফ্রিজ, এয়ার কন্ডিশনার বা শীতলীকরণ যন্ত্র কেনার সময় পরিবেশবান্ধব ও জ্বালানি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তিকে গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে।

পুরোনো যন্ত্রের রেফ্রিজারেন্ট গ্যাস যেন অসতর্কভাবে বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে না পড়ে, সেদিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব পণ্যের ব্যবহার, প্রযুক্তিবিদদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ওজোন স্তর সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানোও জরুরি।

ওজোন স্তর চোখে দেখা যায় না, কিন্তু পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য ও মানুষের সুস্থতার জন্য এর গুরুত্ব অপরিসীম। তাই ১৬ সেপ্টেম্বর শুধু একটি আন্তর্জাতিক দিবস নয়; এটি বিজ্ঞানভিত্তিক পরিবেশ সুরক্ষা এবং বৈশ্বিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা স্মরণ করার দিন।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
সংবাদ প্রতিনিধি

ডেস্ক

এই সংবাদটি The News-এর সংবাদ প্রতিনিধি পাঠিয়েছেন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।