বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নতুন সমীকরণ: কৌশলগত টানাপোড়েনের মধ্যেও ভারত থেকে রেকর্ড ডিজেল কিনছে তুরস্ক

বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নতুন সমীকরণ: কৌশলগত টানাপোড়েনের মধ্যেও ভারত থেকে রেকর্ড ডিজেল কিনছে তুরস্ক

বৈশ্বিক ভূরাজনীতি, যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক অস্থিতিশীলতার প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহের ওপর। রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত ও হরমুজ প্রণালীর ভৌগোলিক জটিলতার কারণে মারাত্মক জ্বালানি সংকটে পড়ে বিশ্ববাজারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আমদানিকারক দেশ তুরস্ক। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কৌশলগত বিরোধ থাকা সত্ত্বেও নিজ দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে ভারত থেকে রেকর্ড পরিমাণ পরিশোধিত ডিজেল আমদানি করতে বাধ্য হচ্ছে আঙ্কারা।

জ্বালানি সংকট ও আঙ্কারার বিকল্প পথ

ঐতিহাসিকভাবে তুরস্ক তাদের অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানির বড় অংশের জন্য রাশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ওপর নির্ভর করে আসছিল। তবে ইউক্রেনীয় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় রাশিয়ার একাধিক তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেখান থেকে আঙ্কারার তেল সরবরাহ উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসে। পূর্বে তুরস্ক দৈনিক প্রায় দুই লাখ ব্যারেল রুশ তেল আমদানি করলেও তা নেমে আসে আশঙ্কাজনক পর্যায়ে।

পাশাপাশি আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে কৌশলগত হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্য থেকেও প্রয়োজনীয় তেল আমদানি বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে দেশের চরম বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ঘাটতি মেটাতে তুরস্ক দিল্লি থেকে দৈনিক বিপুল পরিমাণ (দৈনিক এক লাখ ২০ হাজার ব্যারেলেরও বেশি) ডিজেল আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়।

রাজনৈতিক বিরোধ বনাম বাণিজ্যিক স্বার্থ

কাশ্মীর ইস্যু, পাকিস্তানের সঙ্গে কৌশলগত জোট গঠন এবং ইসলামাবাদকে সামরিক ড্রোন সরবরাহের কারণে আঙ্কারা ও নয়াদিল্লির কূটনৈতিক সম্পর্কে দীর্ঘদিন ধরে টানাপোড়েন চলছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থায় তুরস্কের ভারত-বিরোধী কূটনৈতিক অবস্থানের পরও ভারতের এই বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত দু দেশের সম্পর্কের এক নতুন মাত্রা নির্দেশ করে।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারত আন্তর্জাতিক বাজারে একটি দায়িত্বশীল সরবরাহকারী হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে চায়। রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও অর্থনৈতিক ও বৈশ্বিক জ্বালানি স্থিতিশীলতার স্বার্থে ভারত আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও পরিশোধিত পণ্যের সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে।

মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও ভারতের স্বাধীন অবস্থান

ইউক্রেন যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার জ্বালানি খাতের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নিলেও ভারত মার্কিন নির্দেশ উপেক্ষা করে রুশ সস্তা অপরিশোধিত তেল কেনা অব্যাহত রেখেছে। মার্কিন আইনি পরিষদে রুশ বা ইরানি তেল ক্রেতাদের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের হুঁশিয়ারি থাকলেও নয়াদিল্লি তাদের অবস্থানে অনড়।

ভারতের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, ১৪০ কোটি জনসংখ্যার নিজস্ব জ্বালানি নিরাপত্তা এবং জাতীয় স্বার্থই তাদের প্রধান অগ্রাধিকার। অন্য কোনো দেশের নির্দেশে তাদের নীতি পরিবর্তিত হবে না। মার্কিন চাপ সত্ত্বেও রাশিয়ার তেল কিনে তা নিজস্ব শোধনাগারে প্রক্রিয়াজাত করে ভারত ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ (ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, বেলজিয়াম) বৈশ্বিক বাজারে ডিজেল ও বিমানের জ্বালানি হিসেবে সরবরাহ চালিয়ে যাচ্ছে।

বিশ্ব রাজনীতিতে ভারতের তেল শোধনাগার খাতের প্রভাব

বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতিতে ভারতের বৃহত্তম রিফাইনারি বা তেল শোধনাগারগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি রাশিয়ার নিজস্ব কিছু শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর তারাও শোধিত তেলের জন্য ভারতের ওপর আংশিক নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভারতের ওপর কোনো ধরনের সরাসরি বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা বা চরম অর্থনৈতিক বিধিনিষেধ আরোপ করা হলে তা বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দামে মারাত্মক অস্থিরতা তৈরি করবে। ফলে ওয়াশিংটন চাপ বজায় রাখলেও ভারতের ওপর সরাসরি চরম ব্যবস্থা নেওয়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
সংবাদ প্রতিনিধি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

এই সংবাদটি The News-এর সংবাদ প্রতিনিধি পাঠিয়েছেন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।