স্বামীর আর্থিক সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও দেনমোহর পরিশোধ না করে স্ত্রীকে তা আদায়ের জন্য আদালতের দ্বারস্থ হতে বাধ্য করা হলে, পারিবারিক আদালত পরিস্থিতি বিবেচনায় স্ত্রীকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিতে পারবেন বলে জানিয়েছেন হাইকোর্ট।
একই সঙ্গে আদালত বলেছেন, মুসলিম পারিবারিক আইনে স্ত্রীর সম্মতি ছাড়া নিকাহনামায় দেনমোহরকে ‘বিলম্বিত’ হিসেবে নির্ধারণ করার সুযোগ নেই। স্ত্রী দেনমোহর দাবি করলে তা তাৎক্ষণিকভাবে পরিশোধযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবে।
দেনমোহর ও খোরপোশ নিয়ে পারিবারিক আদালতের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে স্বামীর করা দেওয়ানি রিভিশন আবেদন খারিজ করে এই সিদ্ধান্ত দিয়েছেন বিচারপতি মো. আব্দুর রহমানের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ।
‘ইয়াকুব আলী বনাম সানজিদা নাসরিন’ মামলায় গত ৩ সেপ্টেম্বর রায়টি দেওয়া হয়। ৩২ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপি মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।
মামলায় আবেদনকারীর পক্ষে আইনজীবী ছিলেন মো. নাজের উদ্দিন। বিবাদীপক্ষে ছিলেন আইনজীবী ইশরাত হাসান ও তানজিলা রহমান জুঁই। তাদের সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী ইফফাত হাসান শাম্মী।
মামলার পটভূমি
রায়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর শরিয়াহ অনুযায়ী ইয়াকুব আলীর সঙ্গে তানজিদা নাসরিনের বিয়ে হয়। তাদের দেনমোহর নির্ধারণ করা হয়েছিল ২২ লাখ টাকা। পরবর্তীতে তাদের একটি কন্যাসন্তান জন্ম নেয়।
যৌতুকের দাবি ও পারিবারিক বিরোধের জেরে ২০১৭ সালে স্ত্রীকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরে স্বামী তাকে তালাক দেন। তালাক কার্যকর হওয়ার পর ২০১৯ সালে বকেয়া দেনমোহর, ইদ্দতকালীন খোরপোশ এবং মেয়ের খোরপোশ আদায়ের দাবিতে চট্টগ্রাম পারিবারিক আদালতে মামলা করেন স্ত্রী সানজিদা নাসরিন।
মামলাটির শুনানি শেষে ২০২২ সালের ২৫ মে চট্টগ্রামের সিনিয়র সহকারী জজের আদালত (পারিবারিক আদালত) স্ত্রীর পক্ষে রায় দেন।
রায়ে দেনমোহর বাবদ ১৮ লাখ টাকা, ইদ্দতকালীন খোরপোশ ৩০ হাজার টাকা এবং কন্যাসন্তানের বকেয়া খোরপোশ ২ লাখ ১০ হাজার টাকা—সব মিলিয়ে ২০ লাখ ৪০ হাজার টাকা ৬০ দিনের মধ্যে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
এ ছাড়া মেয়ের বিয়ের আগ পর্যন্ত প্রতি মাসে ৭ হাজার টাকা করে খোরপোশ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। ওই অর্থ প্রতিবছর ১০ শতাংশ হারে বাড়ানোর কথাও বলা হয়।
এই রায়ের বিরুদ্ধে ২০২৩ সালে জেলা জজ আদালতে আপিল করেন স্বামী। ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা জজ (৫ম আদালত) আপিলটি খারিজ করে পারিবারিক আদালতের রায় বহাল রাখেন।
এরপর একই বছর হাইকোর্টে দেওয়ানি রিভিশন আবেদন করেন ইয়াকুব আলী।
হাইকোর্টে দুই পক্ষের বক্তব্য
হাইকোর্টে স্বামীর আইনজীবী বলেন, ডিক্রির অর্থের মধ্যে ৫ লাখ ৬৫ হাজার টাকা ইতোমধ্যে পরিশোধ করা হয়েছে। ব্যবসায়িক লোকসানের কারণে বর্তমানে একসঙ্গে বাকি অর্থ পরিশোধ করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই মানবিক বিবেচনায় বকেয়া দেনমোহর ও খোরপোশ কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ দেওয়ার আবেদন করা হয়।
অন্যদিকে স্ত্রীর আইনজীবী ইশরাত হাসান আবেদনটির বিরোধিতা করে বলেন, স্বামী আর্থিকভাবে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে স্ত্রী ও সন্তানের আইনগত পাওনা পরিশোধে বিলম্ব করছেন। অধস্তন আদালত প্রমাণ ও আইনের ভিত্তিতেই রায় দিয়েছেন। তাই এতে হাইকোর্টের হস্তক্ষেপের কোনো কারণ নেই।
দুই পক্ষের বক্তব্য ও মামলার নথি পর্যালোচনা করে ৩ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট রিভিশন আবেদনটি খারিজ করে অধস্তন আদালতের রায় ও ডিক্রি বহাল রাখেন।
দেনমোহর নিয়ে হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ
রায়ে পবিত্র কোরআনের সংশ্লিষ্ট আয়াত এবং প্রচলিত মুসলিম আইন বিশ্লেষণ করে হাইকোর্ট বলেন, আদালতের নিজ উদ্যোগে দেনমোহরের কোনো অংশ মওকুফ বা বাতিল করার ক্ষমতা নেই। তবে স্ত্রী স্বেচ্ছায় চাইলে দেনমোহরের পুরোটা বা কোনো অংশ স্বামীর অনুকূলে মাফ করে দিতে পারেন।
তবে এমন মওকুফের ক্ষেত্রে সেটি যে সচেতন, নির্দিষ্ট এবং স্বতঃস্ফূর্ত সিদ্ধান্ত ছিল, তার পর্যাপ্ত প্রমাণ থাকতে হবে। জোরজবরদস্তি, প্রতারণা, অযাচিত প্রভাব কিংবা স্বাধীন সম্মতিকে বাধাগ্রস্ত করে এমন পরিস্থিতিতে করা মওকুফকে বৈধ বলে গণ্য করা যাবে না।
আদালত আরও বলেন, মামলার পরিস্থিতি ও উভয় পক্ষের বক্তব্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, দেনমোহর নির্ধারণের ক্ষেত্রে বর-কনের আর্থিক সামর্থ্য বা সামাজিক অবস্থান যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। ফলে লিখিত দেওয়ানি চুক্তিতে থাকা শর্ত অগ্রাহ্য করার সুযোগ নেই।
খোরপোশের বিষয়ে আদালত বলেন, অধস্তন আদালতগুলো ইদ্দতকালীন খোরপোশ এবং নাবালিকা সন্তানের খোরপোশের বিষয়ে একই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। বর্তমান বাস্তবতায় স্কুলপড়ুয়া শিশুর জীবনযাপন, মূল্যস্ফীতি, আবাসন ও উৎসবসহ প্রয়োজনীয় বিষয় বিবেচনায় তার জন্য নির্ধারিত খোরপোশ প্রয়োজনীয়।
সবশেষে হাইকোর্ট বলেন, অধস্তন আদালতের রায় ও ডিক্রিতে এমন কোনো আইনগত ত্রুটি, অসম্পূর্ণতা বা এখতিয়ারগত ভুল পাওয়া যায়নি, যার কারণে হাইকোর্টের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হতে পারে। ফলে রুলের কোনো ভিত্তি না থাকায় তা খরচ ছাড়া খারিজ করা হলো।
রায়ের কপি ও প্রয়োজনীয় নথি দ্রুত অধস্তন আদালতে পাঠানোর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।





