পরিবেশ সুরক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার বলে মন্তব্য করেছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম, এমপি ।
তিনি বলেন, জলবায়ু সহনশীল উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার, পরিবেশবান্ধব নগর ব্যবস্থাপনা, টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং প্রাকৃতিক সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারে বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে।
আজ (বুধবার) ‘দ্য রোড টু আনাতোলিয়া: ক্লাইমেট ফাইন্যান্স অ্যান্ড এনডিসি ৩.০’ শীর্ষক প্রাক-কপ৩১ আন্তর্জাতিক অনলাইন সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন।
জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক কাঠামো সনদের আওতায় অনুষ্ঠেয় কপ৩১-এর প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট এবং ইউনেস্কো চেয়ার অন এডুকেশন ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট, গ্রিন স্কিলস অ্যান্ড ক্লাইমেট অ্যাকশনস যৌথভাবে এ ওয়েবিনারটি আয়োজন করে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, শহরাঞ্চলে বায়ুদূষণ কমাতে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার উৎসাহিত করা, কৃষিজমির উর্বর উপরিভাগের মাটির ব্যবহার কমানো, পাহাড় ও টিলা কাটা রোধ এবং পরিবেশ সুরক্ষায় বিদ্যমান আইন ও বিধিবিধানের কার্যকর প্রয়োগে সরকার কাজ করছে।
একই সঙ্গে বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন, বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর এবং সৌর ও বায়ুশক্তিসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এনডিসি ৩.০ বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জলবায়ু অগ্রাধিকারগুলোকে বাস্তবায়নযোগ্য ও বিনিয়োগযোগ্য প্রকল্পে রূপান্তরের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অর্থায়নের সুযোগ আরও সম্প্রসারণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে উন্নয়ন সহযোগী, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি খাত ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সমন্বিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. মো. সাইফুম পারভেজ বলেন, সরকার পরিবেশ সুরক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলাকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের কার্যক্রম আরও যুগোপযোগী করার পাশাপাশি জলবায়ু অর্থায়নের উৎস বহুমুখীকরণে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, সরকারি অর্থায়নের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি খাত ও অন্যান্য সম্ভাব্য উৎস থেকে অর্থায়ন সংগ্রহের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার, বৃক্ষরোপণ, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের কার্যক্রম সরকারের পরিবেশ ও জলবায়ু কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তিনি আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন একটি বৈশ্বিক সমস্যা। এ সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, প্রযুক্তি ও জ্ঞান বিনিময় এবং কার্যকর অংশীদারিত্ব জোরদার করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের জাতীয় অগ্রাধিকার এবং কপ৩১-এর আলোচ্য বিষয়গুলোর মধ্যে সমন্বয় ঘটিয়ে বাস্তবায়নভিত্তিক ফলাফল অর্জনের ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী রওনাকুল ইসলাম উদ্বোধনী বক্তব্যে বলেন, বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান সামান্য হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে দেশটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা ও লবণাক্ততাসহ বিভিন্ন জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নের সুযোগ কাজে লাগানো জরুরি।
তিনি বলেন, এনডিসি ৩.০-এর অগ্রাধিকারগুলোকে বাস্তবসম্মত ও বিনিয়োগযোগ্য প্রকল্পে রূপান্তর এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উৎস থেকে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন সংগ্রহে প্রাতিষ্ঠানিক ও কারিগরি সক্ষমতা আরও জোরদার করতে হবে।
আলোচনায় এনডিসি ৩.০ বাস্তবায়নে জলবায়ু অর্থায়নের নতুন ও বহুমুখী উৎস কাজে লাগানো, বিনিয়োগযোগ্য প্রকল্প প্রস্তুত, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব জোরদার, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অর্থায়ন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বিশেষজ্ঞরা গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড, বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংক, প্যারিস চুক্তির অনুচ্ছেদ ৬-এর আওতায় সহযোগিতামূলক ব্যবস্থা এবং বেসরকারি পুঁজি কাজে লাগিয়ে জলবায়ু অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণের বিষয় তুলে ধরেন। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি অর্থায়নের সমন্বয়ে মিশ্র অর্থায়নের সম্ভাবনার কথাও আলোচনায় উঠে আসে।
কপ৩১ সম্মেলন সামনে রেখে ক্লাইমেট ইমপ্লিমেন্টেশন ব্রিজসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কাঠামোর মাধ্যমে এনডিসি ও জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনার অগ্রাধিকারগুলোকে বাস্তবায়নযোগ্য প্রকল্পে রূপান্তর এবং প্রয়োজনীয় অর্থায়ন সংগ্রহে সহযোগিতা জোরদারের বিষয়েও আলোচনা হয়।
আয়োজকেরা আশা প্রকাশ করেন, ওয়েবিনারটির আলোচনা ও সুপারিশ আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নে বাংলাদেশের প্রবেশাধিকার বাড়ানো, এনডিসি ৩.০ বাস্তবায়ন এবং কপ৩১-এ বাংলাদেশের কার্যকর অংশগ্রহণের প্রস্তুতি জোরদারে সহায়ক হবে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. মোহাম্মদ নূরুল মুনীর এর সঞ্চালনায় আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী ড. লিওনার্দো এ. এ. তেগুহ সাম্বোদো, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন ও স্বাস্থ্য বিভাগের ড. মারিয়া নেইরা, সিকিউ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ওলাভ মুরলিংক, ইস্তাম্বুল আয়দিন ইউনিভার্সিটির ড. এলিফ কায়া, তুরস্কের ওএমইউডির এর মহাসচিব উমাই ইলমাজ এবং ক্লাইমেট হাব ইন্টারন্যাশনাল, উগান্ডার কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. ক্লিনটন মাওয়ান্ডা প্রমূখ ওয়েবিনারে অংশ নেন।





