চীন-পাকিস্তান সীমান্ত কমিশন, ভারতের তীব্র আপত্তি—হিমালয়ে নতুন ভূ-রাজনৈতিক উত্তাপ

চীন-পাকিস্তান সীমান্ত কমিশন, ভারতের তীব্র আপত্তি—হিমালয়ে নতুন ভূ-রাজনৈতিক উত্তাপ
চীন-পাকিস্তান সীমান্ত কমিশন

হিমালয়ের বিতর্কিত সীমান্ত এলাকায় ভারত ও চীনের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা প্রশমনের প্রচেষ্টা চলার মধ্যেই দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে চীন ও পাকিস্তানের সীমান্ত সহযোগিতা। দুই দেশ ১৬–১৭ সেপ্টেম্বর ইসলামাবাদে Pakistan-China Boundary Joint Commission-এর প্রথম বৈঠক করেছে। পাকিস্তানের ভাষ্য অনুযায়ী, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, যৌথ জরিপ, বাণিজ্য এবং মানুষে-মানুষে যোগাযোগ আরও জোরদার করাই এই কমিশনের অন্যতম লক্ষ্য।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কমিশনটির কার্যক্রমকে দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করেছে। কমিশনটি ২০১৩ সালের চীন-পাকিস্তান সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থাসংক্রান্ত চুক্তির অধীনে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। দুই পক্ষ ভবিষ্যতে যৌথ সীমান্ত জরিপ, সীমান্ত দিয়ে পণ্য ও মানুষের চলাচল এবং অন্যান্য সীমান্ত ব্যবস্থাপনা বিষয়ে সহযোগিতা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছে।

ভারতের সরাসরি প্রত্যাখ্যান

তবে চীন-পাকিস্তানের এই উদ্যোগকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে ভারত। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছেন, ভারতের অবস্থান স্পষ্ট—ভারতের দাবি করা ভূখণ্ড নিয়ে পাকিস্তান ও চীনের কোনো ধরনের সীমান্ত সহযোগিতার আইনগত ভিত্তি নেই।

ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, নয়াদিল্লি ১৯৬৩ সালের তথাকথিত চীন-পাকিস্তান সীমান্ত চুক্তিকে কখনো স্বীকৃতি দেয়নি। ভারতের বক্তব্য অনুযায়ী, জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখের ভূখণ্ড নিয়ে পাকিস্তান ও চীনের কোনো ব্যবস্থা ভারতের সার্বভৌমত্বের ওপর কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না।

জয়সওয়ালের ভাষায়, “পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে কোনো সীমান্ত নেই”—এই অবস্থান থেকেই ভারত তথাকথিত যৌথ সীমান্ত কমিশনকে প্রত্যাখ্যান করেছে। নয়াদিল্লি বলেছে, ভারতের দাবি করা ভূখণ্ডের বিষয়ে পাকিস্তানের এমন কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার নেই।

শাকসগাম উপত্যকা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

চীন-পাকিস্তান সীমান্ত প্রশ্নের সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশগুলোর একটি হলো শাকসগাম উপত্যকা। ১৯৬৩ সালের চীন-পাকিস্তান সীমান্ত চুক্তির মাধ্যমে পাকিস্তান ওই এলাকার নিয়ন্ত্রণ চীনের কাছে হস্তান্তর করে। ভারত ওই চুক্তি স্বীকার করে না এবং এলাকাটিকে জম্মু ও কাশ্মীরের অংশ হিসেবে দাবি করে আসছে।

এই কারণেই চীন-পাকিস্তানের সীমান্ত সহযোগিতার নতুন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ভারতের কাছে বিশেষভাবে স্পর্শকাতর। নয়াদিল্লির বক্তব্য, পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণাধীন বিতর্কিত ভূখণ্ড নিয়ে পাকিস্তান ও চীন কোনো ব্যবস্থা নিলেও তাতে ভারতের সার্বভৌমত্বের দাবির ওপর কোনো আইনগত প্রভাব পড়ে না।

সীমান্তের সঙ্গে বাণিজ্য ও সিপিইসির যোগসূত্র

চীন ও পাকিস্তানের সীমান্ত সহযোগিতা শুধু নিরাপত্তা বা সীমান্ত ব্যবস্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পাকিস্তানের সরকারি বিবৃতিতে পণ্য পরিবহন, মানুষের চলাচল, যৌথ সীমান্ত জরিপ এবং সীমান্তবর্তী যোগাযোগের বিষয়গুলোও কমিশনের আলোচ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এর সঙ্গে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর বা সিপিইসি (CPEC)-এর কৌশলগত গুরুত্বও যুক্ত রয়েছে। পাকিস্তান ও চীন দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামো, সড়ক যোগাযোগ এবং বাণিজ্যিক সংযোগ বাড়িয়ে আসছে। ভারত অবশ্য পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরের মধ্য দিয়ে সিপিইসির অংশ যাওয়ার বিষয়েও আপত্তি জানিয়ে আসছে।

কেন এখন কমিশনটি সক্রিয় হলো?

চীন-পাকিস্তান সীমান্ত ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে এই কাঠামোর শিকড় ২০১৩ সালের চুক্তিতে থাকলেও ২০২৬ সালে কমিশনটির আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হওয়া নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এটিকে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও দুই দেশের যোগাযোগ বৃদ্ধির জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা হিসেবে তুলে ধরেছে।

বিশ্লেষকদের একটি অংশের মতে, সীমান্ত ব্যবস্থাপনাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক করা, সীমান্ত বাণিজ্য ও চলাচল সহজ করা এবং কৌশলগত যোগাযোগ অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে ভারতের আপত্তি দেখাচ্ছে যে, বিষয়টি শুধু প্রশাসনিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে দীর্ঘদিনের ভূখণ্ডগত বিরোধও জড়িয়ে রয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন সমীকরণ?

চীন-পাকিস্তান সম্পর্ক বহু বছর ধরেই দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত সমীকরণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। নতুন সীমান্ত কমিশন সেই সম্পর্ককে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অন্যদিকে ভারত-চীন সীমান্তে সামরিক উত্তেজনা কমানোর প্রচেষ্টার পাশাপাশি চীন-পাকিস্তান সীমান্ত সহযোগিতা বৃদ্ধি পাওয়ায় দিল্লির কৌশলগত উদ্বেগের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে। তবে কমিশনটি কীভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করবে এবং সীমান্ত বাণিজ্য, জরিপ ও যোগাযোগে এর বাস্তব প্রভাব কতটা হবে, তা আগামী বৈঠক ও সিদ্ধান্তগুলোর ওপর নির্ভর করবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—চীন ও পাকিস্তান কমিশনটিকে সীমান্ত সহযোগিতার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো হিসেবে দেখছে, আর ভারত এর কোনো আইনগত বৈধতা স্বীকার করছে না। ফলে হিমালয়ের এই সীমান্ত প্রশ্নে তিন দেশের অবস্থানগত পার্থক্য আপাতত বহালই থাকছে।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
সংবাদ প্রতিনিধি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

এই সংবাদটি The News-এর সংবাদ প্রতিনিধি পাঠিয়েছেন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।