জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে সর্বসম্মতিক্রমে প্রস্তাব অনুমোদন; অর্থনৈতিক সংস্কার, রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও বাণিজ্য সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ পাচ্ছে বাংলাদেশ।
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রস্তুতিকাল আরও তিন বছর বাড়ানোর প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদন করেছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ। এর ফলে এলডিসি থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের নতুন সময়সীমা নির্ধারিত হয়েছে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের সময় বাড়ানোর আবেদনসংক্রান্ত প্রস্তাবটি গৃহীত হয়। এই সিদ্ধান্তের ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ অতিরিক্ত তিন বছর সময় পাবে। একই সঙ্গে রপ্তানি খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।
জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত আইরিন জুবাইদা খান এই সিদ্ধান্তকে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণ করছে শুধু আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়ার কারণে নয়, বরং উত্তরণ আমাদের জনগণের আকাঙ্ক্ষা। এটি একটি জাতীয় অপরিহার্যতা এবং আমাদের সরকার এ লক্ষ্য অর্জনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।”
১৮ ফেব্রুয়ারি আবেদন, ২১ জুলাই ইকোসকের সুপারিশ
নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর গত ১৮ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটির (সিডিপি) কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে তিন বছর সময় বাড়ানোর আবেদন জানায় বাংলাদেশ।
আবেদনে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিবর্তিত পরিস্থিতি, জ্বালানি সরবরাহের ঝুঁকি এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক দুর্বলতার বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়।
সিডিপি বাংলাদেশের আবেদন পর্যালোচনা করে সময় বাড়ানোর পক্ষে ইতিবাচক সুপারিশ করে। পরবর্তী সময়ে ২১ জুলাই জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ইকোসক) বিষয়টি সাধারণ পরিষদের বিবেচনার জন্য পাঠায়।
অতিরিক্ত তিন বছরে যেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে
বর্ধিত প্রস্তুতিকাল বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও এই সময়ের কার্যকর ব্যবহারই হবে মূল চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে কয়েকটি ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করতে হবে।
1. রপ্তানি বহুমুখীকরণ: তৈরি পোশাকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে ওষুধ, চামড়া, কৃষিপণ্য, আইসিটি ও অন্যান্য শিল্পপণ্যের রপ্তানি বাড়ানো।
2. অর্থনৈতিক সংস্কার: ব্যাংকিং খাত, রাজস্ব আদায়, বিনিয়োগ পরিবেশ ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন।
3. বাণিজ্য সুবিধা ধরে রাখা: আন্তর্জাতিক বাজারে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকারের বিকল্প ব্যবস্থা এবং মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা জোরদার করা।
4. অবকাঠামো উন্নয়ন: বন্দর, পরিবহন, জ্বালানি ও সরবরাহব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানো।
5. আন্তর্জাতিক সহযোগিতা: জাতিসংঘ, উন্নয়ন সহযোগী ও বাণিজ্যিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় করে উত্তরণ-পরবর্তী সময়ের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সময় বাড়লেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে না। এই সময়ের মধ্যে বাস্তব সংস্কার ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে।
এলডিসি উত্তরণে নতুন সুযোগ, সামনে বড় দায়িত্ব
বাংলাদেশ ১৯৭৫ সালে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। দীর্ঘ অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির ধারাবাহিকতায় ২০১৮ ও ২০২১ সালের মূল্যায়নে জাতিসংঘের নির্ধারিত উত্তরণের মানদণ্ড পূরণ করে দেশটি।
আগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের কথা ছিল। এবার জাতিসংঘের নতুন সিদ্ধান্তে প্রস্তুতিকাল ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
এই অতিরিক্ত সময়কে কাজে লাগিয়ে অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি শক্তিশালী করাই এখন বাংলাদেশের প্রধান লক্ষ্য।





