শরীয়তপুর প্রতিনিধি ॥ শরীয়তপুর জেলা সদর ও নড়িয়া উপজেলা নির্বাচন অফিসের কতিপয় ব্যক্তি জাতীয় পরিচয়পত্র হালনাগাদ, নতুন ভোটার, ভোটারের স্থানান্তর, ভুল সংশোধন ও ত্রুটিপূর্ণ ভোটার বাতিল কার্যক্রমে ব্যাপক বানিজ্য করছেন। যে সকল কার্যক্রমের জন্য সরকারি ফি’র প্রয়োজন হয় না সেই ক্ষেত্রে চুক্তির মাধ্যমে টাকা আদায় করছেন দায়িত্বরত কর্মচারিগণ। কোথাও আবার জোর করেও দায়িত্বে বসেছে কেউ। এতে হয়রাণীর শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ।
শরীয়তপুর জেলা নির্বাচন কার্যালয়ের নিচ তলায় একটি কক্ষে বসেন অফিস সহকারী কাম কম্পিউচার অপারেটর পদে নার্গিস আক্তার। সেখানেই হয় সদর উপজেলার সাধারণ মানুষের গলাকাঁটা। নার্গিস আক্তার মানুষের চেহারা দেখেই বুঝে নেন লোকটির ধন সম্পদের পরিমান। যে সার্ভিসে সরকারী কোন ফি নাই সে ক্ষেত্রে ৩ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত চুক্তি করেন পরিপূর্ণ জাতীয় পরিচয়পত্র পাইয়ে দিতে।
নড়িয়া উপজেলা নির্বাচন অফিসের দ্বিতীয় তলায় বসেন অফিস সহায়ক আলী আকবর। তিনি চেয়ার টেবিলে যে ভাবে বসেন তা দেখে সাধারণ মানুষ নিঃসন্দেহেই বুঝে নিবেন খোদ নির্বাচন কর্মকর্তা বসে আছেন। তার টেবিলের তিন দিক সহ বারান্দায় লাইন ধরে দাড়িয়ে থাকেন নির্বাচন অফিসে সরকারি সেবা পেতে আসা সাধারণ মানুষ। সেখানেও সরকারি সেবার ফরম পূরণ থেকে সকল ক্ষেত্রেই টাকা দিতে হয় চুক্তির মাধ্যমে। ফরম পূরণ ফি ৫ শত টাকা। যদি কেউ নিজের ফরম পূরণ করেন সেটা সঠিক না বলে ফিরিয়ে দেন আলী আকবর। ৫ শত টাকা দিলেই সেই ভুল ফরমই সঠিক হয়। আকবরের সাথে চুক্তি করলে জাতীয় পরিচয়পত্রের সেবা পেতে কোন বেগ পেতে হয়না।
জেলা নির্বাচন অফিস সূত্র জানায়, ভোটার তালিকা হালনাগাদ শেষ হয়েছে ২০১৬ সালের ১৫ ডিসেম্বর। এখন নির্বাচন অফিস থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে শুনানী করে নতুন ভোটার, ভোটারের স্থান পরিবর্তন, ভুল সংশোধন ও তথ্য গোপন করে ভোটার হওয়া ভোটারদের পরিচয়পত্র বাতিল কার্যক্রম চলছে। এ সকল সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে কোন ফি দিতে হবে না। তবে ভোটার তালিকা হাল নাগাদের পূর্বে যে সকল জাতীয় পরিচয়পত্র হয়েছে সে সকল পরিচয়পত্রের সংশোধনির জন্য ২৩০ টাকা সরকার কর্তৃক নির্ধারিত ফি নেয়া হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নড়িয়া উপজেলার এক মাধ্যমিক স্কুল শিক্ষিকা জানায়, আলী আকবর তাদের আত্মীয়। তার জাতীয় পরিচয়পত্র সঠিক আছে। তার মায়ের পরিচয়পত্রে ভুল থাকায় বেতন তুলতে পারছেন না তিনি। মায়ের পরিচয়পত্র সংশোধন করতে আলী আকবরের সাথে ৪ হাজার টাকায় চুক্তি হয়েছে। টাকা পরিশোধ করে দিয়েছে। তবুও তিন মাস যাবৎ হয়রাণী করছেন আলী আকবর। ওই স্কুল শিক্ষিকাও তিন মাস যাবৎ বেতন পাচ্ছেন না।
বৈশাখী পাড়ার চান মিয়া শিকদারের ছেলে শাহাদাত ও কলুকাঠি গ্রামের গিয়াস উদ্দিন মল্লিক জানায়, জাতীয় পরিচয়পত্র ছাড়া সরকারি কোন সহায়তাও পাওয়া যায় না। তাই পরিচয়পত্র নিতে এসে হাজার হাজার টাকা গুনতে হচ্ছে। আকবর স্যারের সাথে চুক্তি না করে এ পর্যন্ত কেউ পরিচয়পত্র পায় নাই। তারাও কয়েকদিন টাকা ছাড়া পরিচয়পত্র করতে গিয়ে হয়রানী হয়েছেন। এবার টাকার বিনিময়েই পরিচয়পত্র করবেন।
শরীয়তপুরে জাতীয় পরিচয়পত্র পেতে চুক্তি করে টাকা দিতে হয় শুনে প্রতিবেদক নিজেই তার ভাই পরিচয়ে এক ব্যক্তির পরিচয়পত্র পাইয়ে দিতে আলাপ করেন সদর উপজেলা অফিসের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর নার্গিস আক্তারের সাথে। তখন নার্গিস আক্তার বলেন, পরিচয় পত্র ৭ দিনের মধ্যে পাইয়ে দিতে তিনি চুক্তিতে টাকা নেন। সর্বনিন্ম ৩ হাজার টাকা লাগে।
জাতীয় পরিচয়পত্র দিতে টাকা গ্রহন করছে কেন জানতে চাইলে নড়িয়া উপজেলা নির্বাচন অফিস সহায়ক আলী আকবর বলেন, এখন একটু রোজগারের মৌসুম। সকল সময় তো আর কাজ থাকে না। তাছাড়া কাজ না থাকলে পাবলিকতো আর নির্বাচন অফিসের কাছেও আসেন না।