পাটে হতাশ মেহেরপুরের কৃষক ও ব্যবসায়ী

মেহের আমজাদ, মেহেরপুর (২৯-০৮-১৭):  পাট বাংলাদেশের প্রধান অর্থকরী ফসল হিসাবে বিবেচিত। তাই সোনালী এ আঁশটিকে নিয়ে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা একটু বেশিই আগ্রহ দেখিয়ে থাকেন। আর এ আগ্রহটাই যেন আজ তাদের বড় সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে পাটের ফলনে ঘাটতি হচ্ছে। আবার পাটের ন্যায্য মূল্য না পাওয়া এবং বাজার সংকটের কারণে মিলছে না ক্রেতা। এ অবস্থায় মজুদকৃত পাট নষ্ট হওয়ায় কৃষক ও ব্যবসায়ীরা হতাশ হয়ে পড়েছেন।

মেহেরপুরের কৃষকেরা তাদের চাষকৃত পাট ঘরে তুলতে এখন বেশ ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। কিন্তু এ বছর অতিবৃষ্টির ফলে জমিতে পানি জমে যাওয়ায় পাটের আশানুরূপ ফলন কেউই পাচ্ছেন না। পাট চাষে কৃষকের যে পরিমান অর্থ ব্যয় হয়েছে বিক্রির পর সেই পরিমান ও অর্থ পাচ্ছেন না কেউ ফলে কৃষকদের মোটা অংকের টাকা লোকসান গুণতে হচ্ছে। এ জেলায় সাধারণত বিঘা প্রতি ১২ থেকে ১৪ মণ হারে পাটের ফলন হয়ে থাকে। কিন্তু এবছর বিঘা প্রতি ৭, ৮ ও সর্বোচ্চ ১০ মণ হারে পাটের ফলন হচ্ছে। মেহেরপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কর্তৃক প্রদানকৃত তথ্যানুসারে এবছর এ জেলায় ২৫ হাজার ৮শ ৩৫ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে।

পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭৭ হাজার ৫৩৫ মেট্রিকটন। তবে এবছর বৈরী আবহাওয়ার কারণে পাটের উচ্চ ফলন না হওয়ায় লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবেনা। এবছর পাট চাষের খরচ ও বিক্রয় মূল্যের মধ্যে যে তারতম্য দেখা দিয়েছে তাতে কৃষকেরা বেশ হতাশ হয়েছেন।

মেহেরপুর সদর উপজেলার হরিরামপুর গ্রামের পাট চাষী রুহুল আমিন বলেন, আমি দুই বিঘা জমিতে ২৬ হাজার টাকা ব্যয়ে পাট চাষ করেছিলাম, পাট বিক্রি করে ঘরে এসেছে ১৮হাজার টাকা। বাকী টাকা তিনি লোকসান গুণেছেন। একই উপজেলার গোভীপুর গ্র্রামের পাট চাষী জিনারুল ইসলাম বলেন, একচলি¬শ হাজার টাকা ব্যয়ে তিন বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছি। উৎপাদন শেষে ৩৪ হাজার টাকায় বিক্রি করতে পেরেছি।

তিনি আরো বলেন, প্রতি বিঘা জমির পাট চাষে চাষ, মই বাবদ ১ হাজার টাকা, নিড়ানী বাবদ ৩ হাজার টাকা, ৩ বার সেচ ১হাজার ৫০০টাকা, সার ও কীটনাশক ১ হাজার ৮০০টাকা, পাট কাটা,বাঁধা, জাগে দেওয়া ও পাট ছাড়ানো ৫ হাজার ৮০০ টাকা সহ অনান্য খরচ মিলে অন্তত ১৪ হাজার টাকা খরচ হয়। এ বছর খরচের টাকাই উঠছে না। লোকসান গুনে পরবর্তী আবাদ কিভাবে করব এখন আমাদের মাথায় হাত।

মুজিব নগর উপজেলার বিশ্বনাথপুর গ্রামের চাষি আব্দুস সালাম বলেন, এবছর ব্যাংক ও এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে পাট চাষ করেছি। আমি সহ আমাদের এলাকার অধিকাংশ কৃষকই ঋণ নিয়ে পাট চাষ করেছেন। পাট বিক্রি করে লোকসান হওয়ায় কিভাবে ঋণ পরিশোধ করব? দূঃূশ্চিন্তায় নির্ঘুম রাত কাটছে। ২নং বুড়িপোতা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জনাব শাহজামান বলেন, প্রতিজন শ্রমিকের মুজুরী দিতে হচ্ছে ৩থেকে ৪শ টাকা। তাউ ঠিকঠাক পাওয়া যাচ্ছে না। একেতো পাটের দাম নেই তার উপরে শ্রমিকের উচ্চ মূল্য তাতেও ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে কৃষক। ফলে আগামী বছর মেহেরপুরে পাট চাষ কমে যাবার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। মেহেরপুর জেলার বিভিন্ন আড়তে পাটের গুণগত মান ভেদে ভিন্ন ভিন্ন দামে পাট বিক্রি হচ্ছে। মেহেরপুর জেলা শহরের আড়ত গুলোতে প্রতি মণ পাট ১১৬০ টাকা থেকে ১২২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আবার এ জেলার অন্য মুকাম গাংনীতে প্রতি মণ পাট ১১০০ টাকা থেকে ১১৭০ টাকা, মুজিবনগর উপজেলার কেদারগঞ্জে ১১৩০ টাকা থেকে ১২০০ টাকা, আমঝুপিতে ১১৫০ টাকা থেকে ১২০০ টাকা, বারাদীতে ১১৫০ থেকে ১২০০ টাকা দরে পাট বিক্রি হচ্ছে। আর যে সমস্ত ব্যবসায়ীরা কৃষকের বাড়ি বাড়ি যেয়ে পাট কিনছেন তারা প্রতি মণ পাট ৮০০ টাকা থেকে ১হাজার ৫০০ টাকা দাম দিচ্ছেন।

অন্যদিকে পাট মজুদকারকদের অবস্থারও বেশ বেহাল দশা। গত বছর সরকার কর্তৃক পাটের মূল্য মণ প্রতি ২,৪০০ টাকা নির্ধারিত থাকায় মজুদকারকেরা ভালো দাম পাওয়ার আশায় লক্ষ লক্ষ মণ পাট ক্রয় করে। কিন্তু পরবর্তীতে পাটের নি¤œ মূল্য ও ক্রেতার অভাবে অধিকাংশ মজুদকারকদের পাট অবিক্রিত অবস্থায় গোডাউনে নষ্ট হচ্ছে। মেহেরপুর সদরের বিশিষ্ট পাট ব্যবসায়ী আকছেদ আলী জানান, গত বছর কয়েক হাজার মণ পাট মণ প্রতি ১৫০০ টাকা গড় দামে কিনেছিলাম কিন্তু ভালো ক্রেতা না পাওয়ায় পাট লোকসানে বিক্রি করতে হয়েছে। আর অবশিষ্ট পাট ক্রেতার অভাবে গোডাউনে নষ্ট হচ্ছে।

পাট ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্যানুসারে এ জেলায় শুধুমাত্র গত বছরেরই প্রায় ৪ থেকে ৫ লক্ষাধিক মণ পাট অবিক্রিত অবস্থায় পড়ে আছে। তন্মধ্যে মেহেরপুর জেলা শহরের কাথুলী রোডের পাট ব্যবসায়ী হেকমত সাহেবের প্রায় ৮ হাজার মণ, বড় বাজারের পাট ব্যবসায়ী আবু হানিফ বাবুর প্রায় ৫ হাজার মণ, রশিদ প্রায় ৩ হাজার মণ, রফিক জালালের প্রায় ৩ হাজার মণ, ইয়াছিন আলীর প্রায় ৩ হাজার মণ, দিঘির পাড়ার পাট ব্যবসায়ী মুক্তারের প্রায় ৩ হাজার ২০০ মণ, ট্যাঙ্গর মাঠ গ্রামের পাট ব্যবসায়ী দারা মিয়ার প্রায় ৫ হাজার মণ, বামনপাড়ার পাট ব্যবসায়ী এসকেন মিয়ার প্রায় ৩ হাজার মণ ও ছোট বড় প্রায় সকল মজুদকারকের পাট ক্রেতার অভাবে গোডাউনে নষ্ট হচ্ছে।

মেহেরপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক এস.এম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন পাট চাষ জমির উর্বরা শক্তি বৃদ্ধি করে। কৃষকেরা পাট চাষে আগ্রহ হারালে এ জেলার জমির উর্বরা শক্তিও কমে যাবে। পাট চাষ করে কৃষক লাভবান হলে এ চাষে আগ্রহ বাড়ত। লোকসান হলে চাষিরা পাট চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। ফলে পাট চাষ কমে যাওয়ায় জমির উর্বরা শক্তি কমে যাবে। পাট হচ্ছে অর্থকরি ফসল। কৃষক আশায় বুক বেধে থাকেন পাট বিক্রি করে সংসারের মানুষের মুখের হাসি ফোটাবার পাশাপাশি পরবর্তী আবাদ করার টাকা সঞ্চয় করার। চলতি বছর মেহেরপুরের পাট খুব ভাল হয়েছে।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
admin
লেখক / প্রতিবেদক

admin

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।