সাকিব-লিটনের ব্যাটে দারুণ প্রশংসা

সাকিব-লিটনের ব্যাটে দারুণ প্রশংসা

পশ্চিম গ্যালারির অদূরের দোতলা সাদা বাড়িটির ছাদ থেকে সাকিবকে বিরতিহীন উৎসাহ জুগিয়ে গেলেন এক কিশোর। ছেলেটি বিজ্ঞাপনের ভাষায় সারাক্ষণ বলে গেলেন ‘খেলবে টাইগার জিতবে টাইগার…সাকিব সাকিব।’ ২২ গজে ব্যাটিংয়ে মগ্ন সাকিব দেয়ালের ওপারের খুদে ভক্তকে দেখতে না পেলেও প্রেরণাদায়ক স্লোগান শুনে উজ্জীবিত হলেন ঠিকই। মাঠ ছাড়লেন দিনের শেষ বল পর্যন্ত খেলে।

ক্রিকেট অনুরাগী কিশোর ছেলেটিও প্রিয় খেলোয়াড়কে অপরাজিত দেখার স্বস্তি নিয়ে ফিরে গেছে বাড়ির ভেতরে। আর বাংলাদেশ দল ড্রেসিংরুমে ফিরে গেছে পাঁচ উইকেটে ২৪২ রানে। চট্টগ্রামের কন্ডিশন বিবেচনায় নিলে বাংলাদেশের প্রথম দিনে এই পারফরম্যান্সকে তৃপ্তিদায়ক বলবে না কেউই। প্রতিপক্ষের বোলিং বিবেচনায় আরও ভালো হতে পারত স্বাগতিকদের ব্যাটিং এবং স্কোর বোর্ড। মুমিনুলদের পছন্দের উইকেটই বানিয়েছেন কিউরেটর প্রবীণ হিঙ্গিকার। টস ভাগ্যও টাইগার অধিনায়কের পক্ষে গেছে। সবকিছু মিলে যাওয়ায় আগে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেন মুমিনুল।

এমনকি বাউন্স হওয়ায় বলও ব্যাটে যাচ্ছিল। যাকে বলে বড় ইনিংস খেলার জন্য আদর্শ পিচ। যেখানে গড়ে ১৪০ থেকে ১৪৫ কিলোমিটার গতিতে ১৭ ওভার বল করেও উইকেটশূন্য থাকতে হয়েছে শ্যানন গ্যাব্রিয়েলকে। তামিম ইকবাল ভুল না করলে কেমার রোচেরও উইকেট পাওয়া হতো না। কারণ, পিচের পেসারদের জন্য একটুও সুবিধা রাখা হয়নি। তাই তো নতুন পিচেও গ্যাব্রিয়েলকে জোরের ওপর বল করে যেতে হয়েছে গতি তোলার জন্য।

অথচ এমন ভালো উইকেটেও স্বাভাবিক ব্যাটিং করতে পারল না স্বাগতিকরা। তামিম, মুমিনুল, মুশফিকের ফোকাস ঠিক থাকলে পাঁচ উইকেট হারাতে হতো না বাংলাদেশকেও। এই সিনিয়র ব্যাটসম্যানত্রয়ী হয়তো ভুলেই গিয়েছিলেন কোচ রাসেল ডমিঙ্গো তাদের বলে দিয়েছিলেন লম্বা ইনিংস খেলার কথা।

ঘরের মাঠে খেলার পূর্ণ সুবিধা কাজে লাগাতে একমাত্র পেসার মুস্তাফিজকে রেখে একাদশ সাজিয়েছেন কোচ। পাঁচ বোলারের সঙ্গে সাতজন বিশেষজ্ঞ ব্যাটসম্যান রেখেছেন লাইনআপে। উইন্ডিজের সাদামাটা বোলিংয়ের বিপরীতেও সেই সাতজনের থেকে গতকাল পর্যন্ত পাওয়া গেছে একটি মাত্র হাফ সেঞ্চুরি। সাদমান ইসলাম অনিক ফেরার ম্যাচে করেন ৫৯ রান।

ওয়ারিকানের যে বলে আম্পায়ার শরফুদ্দৌলা ইবনে শহীদ সৈকত ভুল এলবিডব্লিউ দিলেন সাদমানকে। টেস্ট আম্পায়ারিংয়ের অভিষেকে ভুল সিদ্ধান্ত দিয়ে শুরু করলেন সৈকত। সেদিক থেকে দেখলে অভাগাই বলতে হবে বাঁহাতি ওপেনার সাদমানকে। তার আউটের পেছনে মুশফিকেরও ভুল আছে। তিনটি রিভিউ হাতে থাকার পরও আম্পায়ারের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানাতে সতীর্থকে সমর্থন দেননি তিনি। অথচ নন-স্ট্রাইক ব্যাটসম্যান অভিজ্ঞ মুশফিকেরই এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করার কথা। সময় মতো সঠিক সিদ্ধান্ত না নেওয়ায় আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে ফিরে যেতে হয় দলের সেট ব্যাটসম্যানকে। আসলে রিভিউ গ্রাফিক্স দেখাচ্ছিল, বলটি পিচ করে লেগ স্টাম্পের বাইরের দিকে যাচ্ছিল।

ভুল বোঝাবুঝির সূত্রপাত হয়েছে আরও আগে। নাজমুল হোসেন শান্ত রানআউট হন সাদমানের ভুলে। এক রান নেওয়ার বলে দুই রান নিতে গিয়ে সতীর্থকে রানআউট করেন তিনি। ১১২ বল খেলে ৪২ রান করা এই জুটি অমার্জনীয় ভুলটি না করলে বোলারদের চাপে ফেলার দারুণ সুযোগ ছিল। তারও আগে কেমার রোচের বলে তামিম যেভাবে বোল্ড আউট হলেন, তার মতো একজন অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যানের কাছ থেকে তা আশা করে না কেউ। বল পিচ করার আগেই সামনে পা বাড়িয়ে বলের লাইন মিস করেন তিনি। ব্যাট ফাঁকি দিয়ে বল প্যাডে লেগে স্টাম্পে আঘাত করে। চার নম্বরে নেমে মুমিনুল জড়তা কাটিয়ে উঠতে পারছিলেন না। প্রথম বল থেকেই আউট হতে হতেও বেঁচে যাচ্ছিলেন। এক রানে জীবন পেয়েও ইনিংস লম্বা করা হয়নি তার।

৯৭ বল খেলে ২৬ রানে মিডউইকেটে ক্যাচ তুলে বিদায় নেন জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামের সবচেয়ে সফল এ ব্যাটসম্যান। সাদমানের সঙ্গে ৫৬ রানের জুটি অধিনায়কের। পঞ্চম উইকেটে দুই অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান সাকিব মুশফিকের কাছে স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশা বেশি ছিল টিম ম্যানেজমেন্টের। টুকটাক ভুলের পরও জুটি জমে উঠেছিল। কিন্তু একপর্যায়ে মুশফিকের ফোকাস নাড়িয়ে দেন স্পিনার ওয়ারিকান। প্রথম স্লিপে অসাধারণ ক্যাচ নেন বিশালদেহী কর্নওয়াল। অফসাইডের বাইরের বলে ডিফেন্ড করতে গেলে ব্যাটের বাইরের দিকের লেগে স্লিপে উড়ে যায়। ৬৯ বলে ৩৮ রান করেন মুশফিক। সাত নম্বরে নামা লিটন আউট হয়ে যাচ্ছিলেন ব্যক্তিগত ২ রানে। পুনরায় জীবন পাওয়া উইকেটরক্ষক এ ব্যাটসম্যান শেষপর্যন্ত বেঁচে রয়েছেন সাকিবের জুটিতে। ৪৯ রানে অপরাজিত এ জুটিকে আজ আবার নতুনভাবে শুরু করতে হবে বড় ইনিংস গড়ার স্বপ্ন নিয়ে।

টেস্ট ক্রিকেটে ঘণ্টা এবং সেশন ধরে এগোতে হয়। কিছু না কিছু রোমাঞ্চ থাকে প্রতিটি সেশনেই। গ্যাব্রিয়েলের বলের গতি ছাড়া চট্টগ্রাম টেস্টে গতকাল উপভোগ্য কিছু ছিল না বলা যায়। ফোকাস থাকলে রোমাঞ্চ এবং বিনোদন দিতে পারতেন ব্যাটসম্যানরাই। নিজেদের ভুলেই সেটা আর হয়ে ওঠেনি। প্রতিপক্ষ বাঁহাতি স্পিনার জোমেল ওয়ারিকানকেও এ জন্য কৃতিত্ব দিতে হয়। ভালো জায়গায় বল করে স্বাগতিক ব্যাটসম্যানদের চাপে রাখতে পেরেছিলেন তিনি। তিন উইকেট নিয়ে প্রথম দিনের সফল বোলারও তিনি। তিন সেশনের প্রথম দুটিতে দুটি করে উইকেট নিয়ে লিডে ছিল উইন্ডিজ।

Share this news

Brinda Chowdhury
Author / Reporter

Brinda Chowdhury

Click the author name to read more stories.

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।