শ্রীলঙ্কার বেদনায় ভরা অতীত ঠেলে ধীরে ধীরে হাসছে অর্থনীতি। ভুল নীতিতে চলা কৃষি এসেছে আলোর পথে। শ্রীলঙ্কার কৃষি ও প্লান্টেশন শিল্পমন্ত্রী মাহিন্দা অমরাবিরা বলেন, সরকার ধান চাষ এবং অন্য ফসলের পাশাপাশি রাবার, চা, কফি ও নারকেলের ফলন বাড়াতে মনোযোগ দিয়েছে। দ্রুতই কৃষি ঘুরে দাঁড়িয়েছে। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে কৃষিখাদ্য ব্যবস্থার রূপান্তরের মাধ্যমে শ্রীলঙ্কা এগিয়ে যাবে। কলম্বো বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক শ্রিমাল আবিরত্নে বলেন, অর্গানিক কৃষি চালু করার আগে বিষয়টি নিয়ে যথেষ্ট গবেষণা হয়নি। এতে উল্টো ফল হয়েছে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় গ্রামের কৃষক ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তখন ২০২২ সালের মাঝামাঝি। সে সময় শ্রীলঙ্কার বিপন্ন অর্থনীতি আর গণআন্দোলনের খবর বারবার আসছিল গণমাধ্যমে। বছর দেড়েক পরের ছবিটা পুরোপুরি আশা জাগানিয়া। সমুদ্র, পাহাড় আর নারকেল গাছে ঘেরা দেউলিয়ার পথে যাওয়া দেশটি এখন হাঁটছে নতুন পথে। পরতে পরতে যেন দিনবদলের জয়গান।
বিশ্লেষকরা বলছেন, খাদের প্রায় কিনারে পড়া দেশটি ঘুরে দাঁড়াল মুহূর্তেই। এটি সম্ভব হয়েছে কারণ, শ্রীলঙ্কার প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে পড়েনি ততটা। দক্ষ আর শিক্ষিত জনগোষ্ঠী ঠিকই দায় নিয়ে অর্থনীতিকে এগিয়ে নিচ্ছে।
২০১৯ সালে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসে দেশে অর্গানিক কৃষি চালু করেন। কৃষিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার নিষিদ্ধের পটভূমিতে শ্রীলঙ্কায় সার আমদানি বন্ধ করা হয়। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে কৃষিক্ষেত্রে। চালের উৎপাদন ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। চালের দাম হু হু করে বাড়তে থাকে। একসময় চাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ শ্রীলঙ্কা বাধ্য হয় ৪৫০ মিলিয়ন ডলারের চাল আমদানি করতে হয়। অর্গানিক কৃষির নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল দেশটির চা উৎপাদনেও। চা রপ্তানি করে শ্রীলঙ্কা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। সেখানেও বড় ধাক্কা লাগে। কৃষকের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সরকার ২০০ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দেয়। দেশজুড়ে খাদ্য ঘাটতিও প্রকট হয়ে ওঠে। ফলে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যায়, খাদ্য আমদানি করার জন্য আরও বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করতে হয়েছে। এ ছাড়াও বিপর্যয়ের পেছনে আরও দায়ী ছিল অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প, ঋণের ভারে জর্জরিত, কর কমানো, পর্যটন ও রেমিট্যান্স খাতের মন্দাভাব। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে পর্যটন ও রেমিট্যান্সের পালে হাওয়া লেগেছে।
বৈদেশিক ঋণে জর্জরিত হয়ে এক বছর আগে আমদানি খরচ মেটাতে পারছিল না শ্রীলঙ্কা। ফলে নিত্যপণ্যের দাম হয়ে যায় আকাশছোঁয়া। বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের পাশাপাশি তীব্র জ্বালানি সংকটে ধুঁকতে থাকে দেশটির মানুষ। ব্যাপক রাজনৈতিক সহিংসতার মুখে ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছিল তৎকালীন রাজাপাকসে সরকারকে। বিদেশে পালিয়ে যান তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসে।
গত বছর পর্যটনে আয় ৩০ শতাংশ ও রেমিট্যান্স ৭৬ শতাংশ বাড়ার ফলে শ্রীলঙ্কার কোষাগারে ৩.২ বিলিয়ন ডলার যোগ করেছে। নিত্যপণ্য ও বিদ্যুতের দাম কমানোর পাশাপাশি অতি দরিদ্রদের আর্থিক সহায়তা দিতে শুরু করে সরকার। সেই সঙ্গে গত বছর বিদেশে কর্মী পাঠিয়ে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে ফেলেছে দ্বীপরাষ্ট্রটি। অবশ্য সংকট সামলাতে সংস্কার কর্মসূচির অংশ হিসেবে কিছু খাতে কর বাড়ানো আবার কোনোটাতে ভর্তুকি কমানোর মতো অজনপ্রিয় পদক্ষেপও নিতে হয়েছে সরকারকে।



