মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সংঘাতের শঙ্কা. ইরানের লারাক দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার পর পাল্টা আঘাত শুরু করেছে তেহরান। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, জর্ডানে অবস্থিত দুটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে।
রোববার লারাক দ্বীপে মার্কিন বাহিনী ইরানের দুটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা লক্ষ্য করে হামলা চালায়। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, ওই লঞ্চারগুলো হরমুজ প্রণালিতে সমুদ্র-মাইন বহনকারী রকেট নিক্ষেপের প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
এর পরই ইরান প্রতিশোধমূলক সামরিক অভিযান শুরু করে। আইআরজিসির ভাষ্য অনুযায়ী, জর্ডানের কিং হুসেইন ও আল আজরাক ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। মার্কিন সূত্রগুলো অবশ্য জানিয়েছে, অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে এবং বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
লারাক হামলায় হতাহতের দাবি ইরানের
মার্কিন হামলার পর আইআরজিসি এক বিবৃতিতে জানায়, লারাক দ্বীপে হামলায় তাদের কয়েকজন সদস্য ও বেসামরিক নাগরিক নিহত ও আহত হয়েছেন। তবে নির্দিষ্ট করে হতাহতের সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি। একই সঙ্গে হামলার জন্য দায়ীদের কঠোর জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরানের সামরিক বাহিনী।
আরও পড়ুনঃ মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি: ইরান নয়, ইসরায়েলকে ঘিরেই কি নতুন মুসলিম জোট?
মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালির দিকে রকেট নিক্ষেপের প্রস্তুতি নেওয়া ইরানি লঞ্চারগুলোই ছিল হামলার মূল লক্ষ্য।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে বাড়ছে উত্তেজনা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সামরিক সংঘাতের সবচেয়ে স্পর্শকাতর ক্ষেত্রগুলোর একটি হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথটির মধ্য দিয়ে স্বাভাবিক সময়ে বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবহন করা হয়।
সাম্প্রতিক উত্তেজনার কারণে এই জলপথে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২৮ আগস্ট মাত্র সাতটি পণ্যবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছিল, যেখানে আগের দিন সংখ্যা ছিল ১৭ এবং ১০ দিনের গড় ছিল প্রায় ১৫টি।
আরও পড়ুনঃ ভারত-উজবেকিস্তান ইউরেনিয়াম চুক্তি, বাড়ছে কৌশলগত সহযোগিতা
ইরানের আইআরজিসি নৌবাহিনী এরই মধ্যে হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে বলে দাবি করেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র জলপথটি সচল রাখার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে।
নিষেধাজ্ঞার পরই ফের সামরিক সংঘাত
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর নতুন দফা অর্থনৈতিক চাপ বাড়ায়। ২৮ আগস্ট প্রকাশিত Reuters-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, ছয় মাস ধরে চলা সংঘাতের মধ্যেই ওয়াশিংটন তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও জোরদার করেছে।
এক পর্যায়ে কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে সংঘাত প্রশমনের সম্ভাবনা তৈরি হলেও লারাক দ্বীপে মার্কিন হামলা সেই আশাকে ফের অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে।
এর আগে ইরান ও ওমানের মধ্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার বিষয়ে একটি সাময়িক সমঝোতার কথাও সামনে এসেছিল। তবে ইরানের বক্তব্য ছিল, এই সমঝোতা কার্যকর হওয়ার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি পালনের ওপর নির্ভর করছে।
সংঘাত কি ছড়িয়ে পড়বে আরও দেশে?
লারাক দ্বীপে মার্কিন হামলার পর জর্ডানে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি একাধিক দেশে বিস্তৃত এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত আরও আঞ্চলিক রূপ নেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও তেলের বাজারেও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। লারাক দ্বীপে মার্কিন হামলার খবরের পরই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে।
ফলে লারাক দ্বীপে হামলা ও জর্ডানে ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপকে কেবল দুই দেশের সামরিক পাল্টাপাল্টি আক্রমণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ এবং মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বৃহত্তর যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি।




