ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জ, ধামাকা শপিং, কিউকমসহ বিভিন্ন ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কেলেঙ্কারিতে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের দাবিকৃত অর্থের একটি অংশ ফেরত দেওয়া হয়েছে। এসব ঘটনায় গ্রাহকদের মোট দাবির পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার ৮৬৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ৪৭২ কোটি টাকা গ্রাহকদের কাছে ফেরত দেওয়া হয়েছে।
ই-কমার্স খাতে প্রতারণা ও অনিয়ম ঠেকাতে একটি পৃথক ‘ই-কমার্স কর্তৃপক্ষ’ বা ‘ডিজিটাল কমার্স নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ’ গঠনের পরিকল্পনাও সরকারের বিবেচনায় রয়েছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী আবদুল খন্দকার মুক্তাদির।
রোববার (৩০ আগস্ট) জাতীয় সংসদে কার্যপ্রণালি-বিধির ৭১ বিধির আওতায় জরুরি জন-গুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে আনা মনোযোগ আকর্ষণ নোটিশের জবাবে এসব তথ্য জানান তিনি।
শেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. রাশেদুল ইসলাম রাশেদ নোটিশটি উত্থাপন করেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
৫৮ হাজারের বেশি অভিযোগ
সংসদে নোটিশ উত্থাপন করে রাশেদুল ইসলাম বলেন, গত কয়েক বছরে দেশের ডিজিটাল বাণিজ্য খাতে একের পর এক বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের ঘটনা সামনে এসেছে।
ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জ, ধামাকা শপিং, কিউকম ও আলেশা মার্টসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গ্রাহকদের বিপুল পরিমাণ অর্থ আটকে রাখা বা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। অনলাইন ট্রাভেল ও টিকিটিং ব্যবসার ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমস্যার অভিযোগ সম্প্রতি সামনে এসেছে।
সরকারি বিভিন্ন সংস্থার নিবন্ধন ও অনুমোদন থাকা সত্ত্বেও কীভাবে এত বিপুলসংখ্যক গ্রাহক আর্থিক ঝুঁকির মধ্যে পড়লেন—এ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন সংসদ সদস্য।
জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে ৫৮ হাজার ৭২০টি অভিযোগ জমা হয়েছে। এসব অভিযোগে গ্রাহকদের দাবিকৃত অর্থের পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার ৮৬৯ কোটি টাকা।
৫৩১ কোটি টাকা আটক, ফেরত ৪৭২ কোটি
গ্রাহকদের অর্থ উদ্ধারের অগ্রগতি তুলে ধরে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন ই-কমার্স কেলেঙ্কারি প্রকাশ্যে আসার পর এখন পর্যন্ত প্রায় ৫৩১ কোটি টাকা আটক করা সম্ভব হয়েছে।
এর মধ্যে এসক্রো সেবা নীতিমালার আওতায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যস্থতায় প্রায় ৪৭২ কোটি টাকা গ্রাহকদের অ্যাকাউন্টে ফেরত দেওয়া হয়েছে।
বাকি অর্থও যাচাই-বাছাই ও শুনানি শেষে প্রকৃত দাবিদারদের ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে সংসদকে জানান তিনি।
১,৯০২ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ২০২২ সালের আগে দেশে ই-কমার্স খাত তদারকির জন্য নির্দিষ্ট কোনো নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ ছিল না। পরবর্তীতে ডিজিটাল বিজনেস আইডেন্টিটি (DBID) নির্দেশিকা চালু করা হয়।
এই ব্যবস্থার আওতায় যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরের (RJSC) মাধ্যমে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৯০২টি প্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত হয়েছে।
পাশাপাশি অনলাইন বাণিজ্যে গ্রাহকদের অর্থ সুরক্ষিত রাখা এবং আর্থিক জালিয়াতি কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ‘মার্চেন্ট অ্যাকোয়ারিং ও এসক্রো সেবা নীতিমালা’ প্রণয়ন করেছে।
চালু হবে ‘আর্লি ওয়ার্নিং’ ব্যবস্থা?
সংসদ সদস্য রাশেদুল ইসলাম জানতে চান, শুধু নিবন্ধন দেওয়ার মধ্যে তদারকি সীমাবদ্ধ না রেখে কোনো প্রতিষ্ঠানের লেনদেনে অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা চালু করা হবে কি না।
তার প্রস্তাব ছিল, আরজেএসসি, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সমন্বয়ে একটি ‘আর্লি ওয়ার্নিং ও মনিটরিং সিস্টেম’ চালু করা।
আরও পড়ুনঃ মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি: ইরান নয়, ইসরায়েলকে ঘিরেই কি নতুন মুসলিম জোট?
বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, প্রস্তাবটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে গঠিতব্য ই-কমার্স কর্তৃপক্ষের দায়িত্বের মধ্যে নিয়মিত নজরদারি এবং আগাম সতর্কতা ব্যবস্থাও অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
নতুন কর্তৃপক্ষ গঠনের উদ্যোগ
মন্ত্রী বলেন, ই-কমার্স খাত যখন দেশে দ্রুত বিকশিত হতে শুরু করে, তখন এই খাতের জন্য পর্যাপ্ত আইন ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো ছিল না। ফলে নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি তৈরি হয়েছিল।
বর্তমানে খাতটির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, গ্রাহক সুরক্ষা এবং প্রতারণা প্রতিরোধে একটি পৃথক ই-কমার্স কর্তৃপক্ষ গঠনের বিষয়টি সরকারের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে।
আরও পড়ুনঃ ভারত-উজবেকিস্তান ইউরেনিয়াম চুক্তি, বাড়ছে কৌশলগত সহযোগিতা
তবে নতুন কর্তৃপক্ষ গঠন করতে সময় লাগতে পারে। সে কারণে অন্তর্বর্তী সময়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ সংশোধনের মাধ্যমে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সক্ষমতা বাড়িয়ে ডিজিটাল বাণিজ্য ও সংশ্লিষ্ট অপরাধ নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও সরকার বিবেচনা করছে।
ই-কমার্স খাতে দীর্ঘদিনের অনিয়মের পর গ্রাহকদের অর্থ ফেরত এবং নতুন নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তোলার এই উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ডিজিটাল বাণিজ্যে আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।


