রোহিঙ্গাদের হাতের নাগালে বাংলাদেশি পাসপোর্ট

সেনা-মগদের অস্ত্রের মুখে বিতাড়িত হয়ে ২০১৭ সালের আগস্টে টেকনাফের কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আশ্রয় নেন মিয়ানমারের বুচিডংয়ের বাসিন্দা মরিজান বেগম। কিন্তু দেড় বছরেও ক্যাম্পের পরিবেশ আর নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা ঘোচেনি বাবা-মা হারানো মেয়েটির।
একপর্যায়ে ক্যাম্পে একমাত্র স্বজন ফুফুর ঘর ছেড়ে কাজ নেন কক্সবাজার শহরের পেশকারপাড়ার রাশেদের বাড়িতে। তখন মরিজানকে ভারতে উচ্চ বেতনে চাকরির লোভ দেখান ওই বাড়িতে যাতায়াতকারী রফিকুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি। এ প্রস্তাবে রাজি হয়ে মরিজান গত ২৭ এপ্রিল রাতের বাসে রফিকুলের সঙ্গে কক্সবাজার থেকে ঢাকার ফকিরাপুলে আসেন। এর পর মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানের পূর্ব শিয়ালদি গ্রামে রফিকুলের বাড়িতে গিয়ে জানতে পারেন তার বাংলাদেশি পাসপোর্ট তৈরি হয়ে গেছে। দুদিনের মধ্যে হাতে আসবে ভিসাও। তবে মরিজান একবার ছবি তুললেও পাসপোর্ট-ভিসার সব কাগজপত্র তৈরি ও প্রক্রিয়াগুলো শেষ করেন তার বাবা পরিচয়দানকারী রফিকুল নিজে। সেখানে মরিজানের মতো আরেক রোহিঙ্গা যুবক সরোয়ার ইসলামেরও বাবা সাজেন রফিকুল। আরেক রোহিঙ্গা মফিদুল আলমের বাবা পরিচয় দেন ঢাকার কদমতলীর জামাল খান।
ইমিগ্রেশনে কীভাবে কথা বলতে হবে তিনজনকেই ভালোভাবে শিখিয়ে দেওয়া হয়। এভাবে ৩০ এপ্রিল ট্যুরিস্ট ভিসায় বেনাপোল স্থলবন্দর হয়ে ভারতে যাত্রা করেন তিন রোহিঙ্গাসহ রফিকুল ও জামাল। কিন্তু মরিজান, সরোয়ার ও মফিদুলের কথাবার্তায় সন্দেহ হলে পাঁচজনকেই আটক করে ইমিগ্রেশন পুলিশ। এ ঘটনায় মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে বেনাপোল পোর্ট থানায় দুটি মামলা হয়। মামলার পর ‘যশোর রাইটস’ নামের একটি মানবাধিকার সংগঠন আটক তিন রোহিঙ্গাকে কাউন্সেলিং করে। এতে উঠে এসেছে মুন্সীগঞ্জ জেলার এসবি শাখায় কর্মরত পুলিশ সদস্য এবং পাসপোর্ট অধিদপ্তরের সদস্যদের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট তৈরির তথ্য।
এ ছাড়া রোহিঙ্গা নারীদের ভারত-থাইল্যান্ডে পাচারের পর যৌনপল্লীতে এবং যুবকদের দাস হিসেবে বিক্রির ভয়ঙ্কর ফাঁদের তথ্য উঠে আসে। জাল-জালিয়াতির পাসপোর্টে রোহিঙ্গাদের ঠিকানা দেওয়া হয় মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে রফিকুল ইসলামের বাড়ির ঠিকানা। আর ঢাকায় তাদের পাচারকারী চক্রের সদস্য হিসেবে কাজ করেন ৬২৫ দনিয়া, কদমতলীর জামাল খান।
যশোর রাইটসের নির্বাহী পরিচালক বিনয় কৃষ্ণ মল্লিক বলেন, রোহিঙ্গারা এত দ্রুত সময়ে জাল-জালিয়াতি করে যেভাবে বাংলাদেশি পাসপোর্ট পেয়েছে, তা কোনো বাংলাদেশির পক্ষেও সম্ভব ছিল না।
ভুক্তভোগীদের কাউন্সেলিংয়ে জিজ্ঞাসাবাদের সময় জানা গেছে, বাংলাদেশি পরিচয় ধারণে তাদের কোনো কাগজপত্র সংগ্রহ বা খাটুনির প্রয়োজন পড়েনি। পাসপোর্ট পেতে যত কাগজপত্র লাগে, সবকিছু দুই দালালই করে দিয়েছে। এতে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের কিছু লোক এবং ভেরিফিকেশনের দায়িত্বে থাকা জেলার ডিএসবি পুলিশ সদস্যদের সহায়তা ছিল। এতে তারা বড় অংকের টাকা পেয়েছে।
বিনয় কৃষ্ণ মল্লিক আরও বলেন, আটক রফিকুল ইসলাম ও জামাল খান আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী চক্রের সদস্য। তারা রোহিঙ্গা অবিবাহিত তরুণী ও যুবকদের উচ্চ বেতনের চাকরির লোভ দিয়ে নারীদের যৌনপল্লীতে এবং যুবকদের দাস হিসেবে বিদেশে বিক্রির অপচেষ্টায় ছিল। এর আগেও বেনাপোল স্থলবন্দর হয়ে ভারতে পাচারের সময় ইমিগ্রেশন পুলিশ রোহিঙ্গা মেয়েদের উদ্ধার করে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মানবপাচারকারী দালালরা বিচরণ করছে। তারা কম বয়সী, অবিবাহিত ও সুশ্রী রোহিঙ্গা নারীদের বিদেশে চাকরির লোভ দেখিয়ে পাচার করছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে এ রোহিঙ্গাদের জন্য নাগরিকত্ব সনদ, জন্মনিবন্ধন সনদ সংগ্রহের কাজটিও করে দালালরা। তবে ভেরিফিকেশনের সময় মুন্সীগঞ্জ জেলা পুলিশের ডিএসবি শাখা অর্থের বিনিময়ে জেনেশুনে পাসপোর্ট অধিদপ্তরে ইতিবাচক প্রতিবেদন পাঠিয়েছে। আর পাসপোর্ট অধিদপ্তরের কতিপয় কর্মকর্তাও ঘুষের বিনিময়ে দ্রুত সময়ে রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট সরবরাহ করেন।
প্রতারিত রোহিঙ্গা সরোয়ার ইসলাম (১৫) তার মা খুরশিদা বেগমের সঙ্গে কুতুপালং ক্যাম্পের ই-ব্লক ৬ নম্বর ঘরে বসবাস করত। ক্যাম্পে সে একটি খাবারের দোকান পরিচালনা করত।
খুরশিদা বেগম জানান, দেড় মাস ধরে সরোয়ার উধাও। দোকানের টাকা-পয়সা নিয়ে এতদিন সে কোথায় ছিল, সে খবর তার কাছে নেই। তার পাসপোর্ট-ভিসা হওয়ার বিষয়টিও তিনি জানেন না। তবে ক্যাম্প ছাড়ার আগে লোকজন তার ছেলেকে বিদেশে পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছিল বলে জানান তিনি।
আটক রোহিঙ্গা মফিদুলের বড় ভাই কামাল হোসেন বলেন, আমার ভাই ক্যাম্পে থাকতে কোনো কাজ করত না। পরিবারের সঙ্গে খালি ঝগড়া করত। একদিন ঝগড়া করে দোকান থেকে ২০ হাজার টাকা নিয়ে পালিয়ে যায়। এর পর তার খবর জানি না।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বেনাপোল পোর্ট থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সৈয়দ মো. আলমগীর হোসেন জানান, পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মুন্সীগঞ্জ ও ঢাকা কার্যালয় থেকে বাংলাদেশি পরিচয়দানকারী রোহিঙ্গাদের পাসপোর্টগুলো নেওয়া হয়েছে। কারা এ ঘটনায় জড়িত তা তদন্ত চলছে।
রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট ভেরিফিকেশনের বিষয়ে জানতে চাইলে মুন্সীগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জায়েদুল আলম বলেন, রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট প্রদানের অভিযোগ এখনও আমার কাছে এসে পৌঁছায়নি। তবে মুন্সীগঞ্জে যে কটি জাল-জালিয়াতির পাসপোর্ট সংগ্রহ করা হয়েছে সেগুলোয় কীভাবে ভেরিফিকেশন হয়েছে সে বিষয়ে অভিযোগ পেলে তদন্ত শুরু হবে। এতে পুলিশের যে সদস্যর বিরুদ্ধেই অভিযোগ প্রমাণিত হবে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যমতে, ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়া এ পর্যন্ত ৩ হাজার ৮১৫ রোহিঙ্গাকে উদ্ধার করা হয়েছে। আর বিভিন্ন জেলায় যাওয়ার চেষ্টাকালে শুধু কক্সবাজারেই উদ্ধার হয়েছে ৫৪ হাজার রোহিঙ্গা।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
Kishori
লেখক / প্রতিবেদক

Kishori

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।