বরিশাল ঘুরে এসে রিপোর্ট করছেন স্টাফ রিপোর্টার মো. আবুল হোসেন ॥ চাখার ইউনিয়নে মাদ্রাসার জমি অবৈধভাবে দখল করে ইমারত নির্মাণের পাঁয়তারা চলছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
দক্ষিণ বড় চাউলাকাঠী তালিমুল কোরান নূরানী ও হাফেজী দারুসসুন্নাত মাদ্রাসা নামে একটি মাদ্রাসা নিজ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করেছেন হাজী মো: আবুল হোসেন (রফিক)। এ মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠা করার মূল লক্ষ্য হলো এলাকায় দ্বীনি শিক্ষা ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়া, যাতে করে মানুষ শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে এলাকায় বসবাস করতে পারে, সে লক্ষ্যই হচ্ছে তাঁর মূল লক্ষ্য।
এলাকার মানুষ অস্বচ্ছল ও হতদরিদ্র তাই এ চিন্তাটি মাথায় রেখে তিনি মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠা করেন। কারো কাছ থেকে কোনো ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা ছাড়াই মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। মাদ্রাসাটি এখন একটি দ্বীনি মাদ্রাসায় পরিণত হয়েছে এবং ক্রমান্বয়ে প্রসারিত হচ্ছে।
নাল জমির ওপর বালু ভরাট করে এটি নির্মাণ করা হয়েছে। পূর্ব দিকে একটি পুকুর খনন করে ঘাটলা বাঁধানো হয়েছে অজু করার জন্য। ১৯ মার্চ, ২০১৭ তারিখে চাখার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে একটি ওয়াকফ্নামা দলিল রেজিস্ট্রি করা হয়েছে। যার নম্বর-৪৩৩, এ দলিলে ১৯.২৫ শতাংশ জমি রেজিস্ট্রি করে দেয়া হয়েছে মাদ্রাসাটির নামে।
রেজিস্ট্রি ছাড়া এলাকার বিভিন্নজন স্বেচ্ছায় স্ট্যাম্পের ওপর স্বাক্ষর করে ৫.৫০ শতাংশ দান করেছেন। সময় সুযোগ বুঝে তারা ওয়াক্ফানামা দলিল করে দিবেন বলে জানা গেছে। এ মাদ্রাসাটির জমি ৫৭ নং বড় চাউলাকাঠী মৌজার অধীন এস এ খতিয়ান-১৫, হাল। সৃজিত খতিয়ান-৪৫৫/২, দাগ নং-৭০২, ৭০৪, ৭৯৬, ৮০৩।
এ মাদ্রাসার জমির অধিকাংশই তাঁর ক্রয় করা ও পৈতৃক সম্পত্তি। জমির পরিমাণ ২৪.৭৫ শতাংশ। বর্তমান বাজার মূল্য প্রতি শতাংশ ৩০ হাজার টাকা দরে ক্রয়-বিক্রয় চলছে।
মোয়াল্লেম ও ছাত্র সংখ্যা : পাঁচজন মোয়াল্লেম। নূরানী শাখায় ছাত্র সংখ্যা ৫৮ জন। ৪ জামাতে পড়ানো হয় এই ছাত্রদের। হাফেজী শাখায় ছাত্র সংখ্যা ১২ জন। ১ জন ৫০০ টাকা খরচ দেন। অন্য ১১ জন খাওয়া থাকা ফ্রি। কারো কাছ থেকে কোনো রকম বেতন নেয়া হয় না। গরিব ও এতিম-মিসকিনদের কাপড়-চোপড় ফ্রি দেয়া হয়।
পাঁচজন মোয়াল্লেম ও বাবুর্চির বেতন বাবদ মাসিক ৩৩৫০০ টাকা এবং অন্যান্য আনুষাঙ্গিক খরচ মিলিয়ে মাসে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা খরচ হয় এ মাদ্রাসাটিতে। এসব খরচ হাজী মো: আবুল হোসেন (রফিক) বহন করেন।
একই খতিয়ানে সামসুল হক গং ৩ শতাংশ জমি ক্রয় করেন মাদ্রাসার পশ্চিম পাশে। সেখানে একটি দোকানঘর তৈরি করেন সামসুল হক গং। দোকানের সামনে ক্র্যামবোর্ড বসিয়ে ব্যবসা চালাচ্ছেন তিনি, এমনকি উচ্চ সাউন্ড বাজিয়ে টেলিভিশন চালাচ্ছেন বলে এলাকাবাসী অভিযোগ করেন। অনেক মানুষের আড্ডা ও সমাগমে মাদ্রাসার পরিবেশ বিনষ্ট করছেন সামসুল হক গংরা। চেয়ারম্যানও এ ধরনের অভিযোগ পেয়েছেন বলে সাবধানতা অবলম্বন করার জন্য হুঁশিয়ার করে যান সামসুল হক গংদেরকে।
ইতিমধ্যে সামসুল হক গং মাদ্রাসার পরিবেশ যাতে নষ্ট হয় তার সব কূটকৌশল আঁটতে থাকেন ১নং ইউপি সদস্য শাহ আলম সরদার গংদেরকে সঙ্গে নিয়ে। সামসুল হক গংদের জমি মাদ্রাসার পশ্চিম পাশে। রাস্তার পশ্চিম পাশ থেকে কুদ্দুসের মা আমেনা বেগম এ খতিয়ানেই ১ শতাংশ পৈতৃক সম্পত্তি মাদ্রাসায় দান করবেন বলে অনেক আগ থেকেই বলে আসছেন। একথা শুনে হঠাৎ কূটবুদ্ধি এঁটে সেখানে সামসুল হক গংরা ইমারত নির্মাণের উদ্যোগ নেন।
পশ্চিম পাশের উক্ত আমেনা বেগমের ওই জায়গাসহ রাস্তার সীমানা পর্যন্ত দখল করে ইমারত নির্মাণের কাজ শুরু করে দেন সামসুল হক গংরা। এসব ঘটনা এলাকাবাসী জানার পর সেখানে সবাই এসে বাধা প্রদান করেন।
এ ব্যাপারে বানারীপাড়া থানায় একটি জিডি করা হয়। যার নম্বর-৪৬৬, ১১/৩/২০১৭ইং। উক্ত জিডি করার পর থানার এস. আই মো: শাহনূর এসে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ঘটনার সত্যতা পান এবং ওই জমির ওপর কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ প্রদান করেন।
এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত এ নিয়ে দেন-দরবার চলছেই। এখনও পর্যন্ত এর কোনো সুরাহা হয়নি।
১নং ইউপি সদস্য শাহ আলম সরদারের বর্তমান ও অতীত কার্যকলাপ সম্পর্কে এলাকাবাসীর ক্ষোভ : নব্বই দশকের দিকে তরানউল্লা সরদার বাড়ির পূর্ব পাশ থেকে একটি রাস্তা নির্মাণ করার প্রস্তুতি নেন পার্শ্ববর্তী এলাকার লোকজন।
উক্ত রাস্তা যাতে না হয় সে জন্য জমির মালিকরা বাধা প্রদান করেন। যারা রাস্তা নির্মাণ করবেন তাদের পক্ষ নিয়ে ১নং ওয়ার্ড ইউপি সদস্য শাহ আলম সরদার গং এ এলাকায় তা-ব চালায় বলে এলাকাবাসী ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
উক্ত জমির দুজন ওয়ারিশ যথাক্রমে মোখলেস সরদার ১নং ওয়ার্ড ইউপি সদস্য শাহ আলম সরদারের বাড়ির সামনের সরকারি রাস্তা থেকে নিজ বাড়িতে আসার সময় তাকে বাড়ির মধ্যে ধরে নিয়ে গিয়ে এলোপাতারিভাবে মারধোর শুরু করে দেন এবং ওই বাড়িতে বসেই সে প্রস্রাব-পায়খানা পর্যন্ত করে দেন বলে জানা যায়। এমনকি চোখ দুটোও তুলে দেওয়ার চেষ্টা করেন ১নং ওয়ার্ড ইউপি সদস্য শাহ আলম সরদার গংরা, এলাকাবাসী এ ধরনের অভিযোগ করেছেন।
ওই বাড়ির ১নং ওয়ার্ড ইউপি সদস্য শাহ আলম সরদারের এক চাচাত ভাই সালেক সরদার (ওরফে পক্কা) এখন মৃত। এ ঘটনা তিনি স্বচক্ষে দেখে এবং মোখলেস সরদারের অবস্থা গুরুতর দেখে সে প্রতিবাদ করলে মোখলেস সরদারকে ছেড়ে দেন। দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা নেয়ার পর মোখলেস সরদার সুস্থ হন বলে জানা যায়।
এ ঘটনার সূত্র ধরেই কানাই সরদারের মেয়ে জয়তন বিবি নামের ওই বাড়ির জমির ওয়ারিশ এক মহিলাকেও বেদম প্রহার করেন ১নং ওয়ার্ড ইউপি সদস্য শাহ আলম সরদার গং। অনেকদিন পর্যন্ত ওই মহিলা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হেঁটেছেন এবং দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসার পর সে সুস্থ হন বলে জানা যায়।
২/৩ বছর আগে ওই এলাকায় গাঁজা ও অন্যান্য নেশাজাতীয় দ্রব্য বিক্রির প্রতিবেদন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। যাঁরা নেশাজতীয় দ্রব্য বিক্রি করতেন তাদের কাছ থেকে ১নং ওয়ার্ড ইউপি সদস্য শাহ আলম সরদার কমিশন আদায় করতো বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এলাকার একজন ইউপি সদস্য থাকবেন নিরপেক্ষ ও ন্যায়বিচারক। নিরপেক্ষ ও ন্যায়বিচারক তো দূরের কথা! বরং এলাকায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করাই যেন তার দায়িত্ব হয়ে পড়ছে ইউপি সদস্য হিসেবে। এসব অভিযোগগুলো করেন এলাকাবাসী।
এলাকায় কোনো ঘটনা ঘটলে ভালোভাবে আপোষ-মীমাংসা না করে তিনি যেকোনো পক্ষ নিয়ে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ পরিচালনা করে থাকেন এবং ইন্ধন যোগান। এ ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন উক্ত এলাকার বাসিন্দারা।
সামসুল হক গংরা ১নং ওয়ার্ড ইউপি সদস্য শাহ আলম সরদার গংদের একই বাড়ির আত্মীয়-স্বজন। সম্পর্কে চাচাত বোনজামাই ও ভাগিনা। তাই তাদের পক্ষ নিয়ে এলাকায় তা-ব চালাতে থাকে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে। এ মাদ্রাসাটির ব্যাপারে যারাই ন্যায়সঙ্গত কথা বলে তাদেরকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন শাহ আলম সরদারের সাঙ্গপাঙ্গরা ও শাহ আলম সরদার।
২০ মার্চ ২০১৭ তারিখ বিকালে সন্ধ্যার আগে চেয়ারম্যান মো: খিজির সরদারের নেতৃত্বে একটি নিরপেক্ষ বিচারকার্য চলাকালে ১নং ওয়ার্ড ইউপি সদস্য শাহ আলম সরদার তাদের সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে এলাকাবাসীর ওপর চড়াও হয়ে মারধরের চেষ্টা করেন চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতেই। এ পরিস্থিতি চেয়ারম্যান স্বচক্ষে অবলোকন করেন এবং বিচারকার্য স্থগিত করেন। পরবর্তীতে নতুন একটা তারিখ নির্ধারণ করে বিচারকার্য সমাধান করবেন বলে তিনি জানান।
গভীর রাতে ফোন করে রিপোর্টারকে মারধরের হুমকি : এ রিপোর্টার ১৮ মার্চ, ২০১৭ তারিখ রাত ৯টার দিকে এলাকাবাসীর সাথে চেয়ারম্যান মোঃ খিজির সরদারের ইউনিয়ন পরিষদ কক্ষে রিপোর্ট সংগ্রহ করার জন্য যান এবং এলাকায় ফিরে আসার পর রাত ১০.৫৩ মিনিটের সময় অজ্ঞাত এক ব্যক্তি ০১৯৬২৩০০২৬৭ নম্বর থেকে রিপোর্টারের ০১৯১৬৬৮৬৮০৫ নম্বরে ফোন করে মারধরের হুমকি দেন।



