পশ্চিমবঙ্গে ভাষা নিয়ে অহেতুক বিতর্ক চলছে

পশ্চিমবঙ্গে ভাষা নিয়ে অহেতুক বিতর্ক চলছে

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, মাতৃভাষা দিবস অনুষ্ঠানে সংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব(চিত্রশিল্পী) শুভাপ্রসন্ন ভট্টাচার্যের সঙ্গে কথা কাটাকাটি করেছেন ভাষা নিয়ে। শুভাপ্রসন্ন ভট্টাচার্য রাবীন্দ্রিক বিশুদ্ধতার পক্ষে; আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষপাত আরবি-উর্দুর প্রতি। যদিও শুভাপ্রসন্ন ভট্টাচার্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একজন চাটুকার হিসেবে পরিচিত ছিলেন; তবুও শুভাপ্রসন্ন মিডিয়ার কাছে বলেছেন, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুসলিম তোষণ করতে ওসব বলেছেন। আমি ভোট ভিক্ষা করি না। আমি একজন স্বতন্ত্র মানুষ।”

পশ্চিমবঙ্গের বুদ্ধিজীবীরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষ নিয়ে, ইনিয়ে বিনিয়ে নানা ধরনের কথা বলছেন। এছাড়াও পশ্চিমবঙ্গে গর্গ চট্টোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন ‘বাংলা পক্ষ’ নামের একটি উগ্র ফ্যাসিবাদী সংগঠন রয়েছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে : ‘বাংলা পক্ষ’ যতটা হিন্দিভাষী বিদ্বেষী, ঠিক ততটাই উর্দুভাষীদের প্রতি নতজানু। পশ্চিমবঙ্গের এই সমস্ত বিতর্ক যেন ‘অন্ধের হস্তি দর্শন’ গল্পটির সার্থক প্রতিরূপ। এই প্রসঙ্গে আমি দু’-চারটি কথা বলতে চাই।

‘জল’ ও ‘পানি’ এই শব্দ দু’টি বিশুদ্ধ সংস্কৃত শব্দ। সুতরাং জল ও পানি নিয়ে বিতর্ক করা অর্থহীন। তবে বাংলা ভাষায় ‘পানি’র তুলনায় ‘জল’ শব্দটি অনেক শক্তিশালী। যেমন ‘জল’ থেকে এসেছে জলবায়ু, জলসীমা, জলজ, জলপ্রপাত, জলীয়বাষ্প ইত্যাদি বহুল ব্যবহৃত শব্দ। সংস্কৃত ‘পানীয়’ শব্দ থেকে ‘পানি’ শব্দটি এসেছে।

বাংলা ভাষায়, খুবই নগন্য সংখ্যক মূল বাংলা শব্দ রয়েছে; বলতে গেলে প্রায় সবই বাইরের শব্দ এবং সিংহভাগ শব্দই সংস্কৃত থেকে এসেছে। ইংরেজি ভাষার অবস্থাও ঠিক একই। মূল ইংরেজি শব্দের ব‍্যবহার অতি সামান্য। ইংলিশ ভোকাবুলারির ৫৮% ফ্রেঞ্চ অথবা ল্যাটিন, ২৬% জার্মান, ৬% গ্রীক; এছাড়াও অন্যান্য ভাষার শব্দ রয়েছে।

‘হিন্দি’ ও ‘বাংলা’ উভয় ভাষাই ― ‘আদি প্রাকৃত’ ভাষার দু’টি ভিন্ন আঞ্চলিক রূপ। হিন্দির এমন কোন স্বতন্ত্র শব্দভাণ্ডার নাই – যা দিয়ে বাংলা ভাষার উপর আধিপত্য স্থাপন করতে পারে। কাজেই তথাকথিত ‘হিন্দি আগ্রাসন’ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছুই নেই।

আরবরা পারস্য জয় করেছিল ঠিকই, কিন্তু ফার্সি ভাষাকে বিলুপ্ত করতে পারেনি। আর্য গোত্রীয় ফার্সি ভাষা, সেমেটিক আরবি ভাষার তুলনায় অনেক সমৃদ্ধ।

বঙ্গ-বিজয়ীদের মুখের ভাষা আরবি ছিল না, ছিল ধর্মীয় ভাষা। বঙ্গ-বিজয়ী তুর্কি, পাঠান ও উজবেক(মুঘল)রা, ফার্সি ভাষাকে দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে ব্যবহার করেছে। যে কারণে বাংলা ভাষায়, আরবির তুলনায় ফার্সি শব্দ অনেক অনেক বেশি। তাছাড়া বাংলার সঙ্গে ফার্সির মিথস্ক্রিয়া অতি সহজেই সুসম্পন্ন হতে পেরেছে – উভয় ভাষা আর্য পরিবার থেকে আগমনের ফলে।

ইসলাম ধর্মালম্বী বাঙালিদের উপর আরবদের যথেষ্ট ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক প্রভাব রয়েছে। কাজেই মুসলিম-বাংলায় ব্যাপক আরবিকরণ ঘটবে – এটাই স্বাভাবিক। তবে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে, উচ্চশিক্ষিত বাঙালিরা ধীরে ধীরে ইংরেজি ভাষায় বিলীন হয়ে যেতে পারে। উচ্চশিক্ষিত বাঙালিদের নিত্য দিনের কথোপকথনে ইংরেজি শব্দের ব্যবহার ক্রমশ বাড়ছে। তারা ছেলেমেয়েদের ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে দিচ্ছে। এটা খুবই ইতিবাচক। কেননা ইংরেজি প্রধানতম আন্তর্জাতিক ভাষা, ইন্টারনেটের স্রষ্টা আমেরিকার ভাষা, বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের ভাষা।

উচ্চশিক্ষিত-সচ্ছল-বুদ্ধিমান বাঙালিরা, ইংলিশ স্পিকিং উন্নত দেশগুলোতে তাদের সন্তানদের পাঠিয়ে দিচ্ছে। কারণ তারা জানে, বাংলাভাষী অঞ্চল তথা দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ অন্ধকারাচ্ছন্ন।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
Ovi Pandey
সংবাদ প্রতিনিধি

Ovi Pandey

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।