তিন লাখ মানুষের ভরসা পাইকগাছা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, সেবায় সংকট

তিন লাখ মানুষের ভরসা পাইকগাছা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, সেবায় সংকট
তিন লাখ মানুষের ভরসা পাইকগাছা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, সেবায় সংকট
‎জরুরি মুহূর্তে হাসপাতাল মানেই মানুষের কাছে আশ্রয়, ভরসা ও বেঁচে থাকার শেষ ঠিকানা। কিন্তু সেই হাসপাতালেই যদি প্রয়োজনের সময়ে কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত না হয়, তখন সবচেয়ে বড় সংকটে পড়েন প্রান্তিক মানুষ।
খুলনার পাইকগাছায় দশটি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় বসবাসকারী বিপুলসংখ্যক মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স।
শুধু স্থানীয় বাসিন্দারাই নন, পার্শ্ববর্তী উপজেলা আশাশুনি, তালা ও কয়রার বিভিন্ন এলাকার মানুষও চিকিৎসার প্রয়োজনে ছুটে আসেন এখানে। অথচ রোগীর চাপের বিপরীতে জরুরি অস্ত্রোপচার, অ্যানেস্থেশিয়া ও বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা কতটা পর্যাপ্ত—তা নিয়েই এখন সামনে আসছে নানা প্রশ্ন।
বিশেষ করে প্রয়োজনের সময়ে অপারেশন থিয়েটার (ওটি) সেবা সীমিত থাকলে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন প্রসূতি ও জরুরি অস্ত্রোপচারের রোগীরা। ফলে বিপুল মানুষের চিকিৎসার অন্যতম প্রধান এই প্রতিষ্ঠানে সংকটের সময়ে সাধারণ মানুষের ভরসার জায়গাটি কতটা প্রস্তুত—সেই প্রশ্নই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
‎পাইকগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রতিদিন উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌর এলাকার মানুষ চিকিৎসা নিতে আসেন। এর পাশাপাশি ভৌগোলিক নৈকট্য ও যোগাযোগ সুবিধার কারণে আশাশুনি, তালা ও কয়রার বিভিন্ন এলাকার রোগীরাও এখানে সেবা নেন। ফলে হাসপাতালটির ওপর বাস্তব রোগীর চাপ স্থানীয় জনসংখ্যার হিসাবের চেয়েও বেশি হতে পারে।
এই বিপুলসংখ্যক রোগীর চিকিৎসা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স, পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা, ওষুধ, জরুরি সেবা এবং অস্ত্রোপচারসংশ্লিষ্ট জনবল। বিশেষ করে জরুরি অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে অ্যানেস্থেশিয়া চিকিৎসকের উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একজন অ্যানেস্থেশিয়া চিকিৎসককে একাধিক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দায়িত্ব পালন করতে হলে পাইকগাছায় প্রয়োজনের সময়ে এই সেবা কতটা নিশ্চিত করা যাচ্ছে—সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে।
‎পাইকগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জুনিয়র কনসালট্যান্ট (অ্যানেস্থেশিয়া) ডা. জহিরুল ইসলাম জানান, তিনি সপ্তাহে একদিন শনিবার পাইকগাছায় দায়িত্ব পালন করেন। বুধবার তিনি কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং রবি, সোম, মঙ্গল ও বৃহস্পতিবার ফুলতলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দায়িত্ব পালন করেন। শুক্রবার তাঁর সাপ্তাহিক ছুটি।
‎ডা. জহিরুল ইসলামের ভাষ্য, তিন উপজেলায় দায়িত্ব পালনের বিষয়টি তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়; সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অফিসিয়াল আদেশের ভিত্তিতেই তিনি দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর বাড়ি দিঘলিয়ায় এবং সেখান থেকেই তিনি তিন উপজেলায় দায়িত্ব পালন করেন।
‎তাঁর এই দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে কোনো প্রশ্ন তোলার বিষয় নয়; বরং প্রশ্ন হচ্ছে—একজন অ্যানেস্থেশিয়া চিকিৎসককে তিনটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভাগ করে দায়িত্ব দেওয়ার মধ্যেও পাইকগাছার জরুরি অস্ত্রোপচার সেবা কীভাবে নিরবচ্ছিন্ন রাখা হচ্ছে?
‎প্রসূতি রোগীর ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রসবজনিত জটিলতা দেখা দিলে কখন অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হবে, তা সবসময় আগে থেকে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। একইভাবে দুর্ঘটনায় আহত রোগী কিংবা বিভিন্ন জটিলতায় অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হওয়া রোগীর ক্ষেত্রেও দ্রুত সিদ্ধান্ত ও চিকিৎসা প্রয়োজন হয়।
এমন পরিস্থিতিতে হাসপাতালে প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করা না গেলে রোগীকে অন্যত্র নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। পাইকগাছার প্রত্যন্ত ইউনিয়ন কিংবা পার্শ্ববর্তী উপজেলা থেকে আসা রোগীর জন্য তখন নতুন করে পরিবহন, সময় ও অর্থের ব্যবস্থা করতে হয়। জরুরি মুহূর্তে এই বাড়তি ভোগান্তি রোগী ও স্বজনদের জন্য পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।
সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনের সময়ে অস্ত্রোপচার সেবা না মিললে অনেক রোগীকে বাধ্য হয়ে বেসরকারি ক্লিনিক কিংবা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে হয়। বিশেষ করে জরুরি প্রসূতি ও অস্ত্রোপচারের রোগীদের ক্ষেত্রে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগও অনেক সময় সীমিত থাকে।
এতে নিম্নআয়ের পরিবারের ওপর তৈরি হয় বাড়তি আর্থিক চাপ। সরকারি হাসপাতালে তুলনামূলক কম খরচে চিকিৎসা পাওয়ার প্রত্যাশায় আসা একটি পরিবারের জন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অস্ত্রোপচারের খরচ, চিকিৎসকের ফি, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ, কেবিন বা বেডের ব্যয় এবং যাতায়াত—সব মিলিয়ে ব্যয়ের পরিমাণ অনেক বেড়ে যেতে পারে।
‎দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল পরিবারের জন্য এই অতিরিক্ত ব্যয় জোগাড় করাই হয়ে ওঠে বড় চ্যালেঞ্জ। কেউ ধারদেনা করে, কেউ সঞ্চয় ভেঙে, আবার কেউ প্রয়োজনীয় অন্য খরচ কমিয়ে চিকিৎসার অর্থ জোগাড় করেন। ফলে চিকিৎসার সংকট তখন শুধু শারীরিক দুর্ভোগে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা একটি পরিবারের জন্য বড় ধরনের আর্থিক ও মানসিক চাপেও পরিণত হতে পারে।
‎পাইকগাছার স্বাস্থ্যসেবার বাস্তবতায় তাই শুধু একজন চিকিৎসকের দায়িত্ব বণ্টনের বিষয়টি নয়, সামগ্রিক সক্ষমতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। রোগীর চাপের তুলনায় চিকিৎসক ও নার্সের সংখ্যা, জরুরি চিকিৎসা, বিশেষজ্ঞ সেবা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ সরবরাহ এবং অস্ত্রোপচারসংশ্লিষ্ট জনবল—সবকিছুর পর্যাপ্ততা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
একটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স যখন স্থানীয় মানুষের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী এলাকার রোগীদেরও চিকিৎসার ভরসা হয়ে ওঠে, তখন সেই প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতাও সেই বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া জরুরি। বিশেষ করে জরুরি রোগীদের ক্ষেত্রে প্রয়োজনের সময়ে চিকিৎসা পাওয়া নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
‎এ বিষয়ে পাইকগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আহসানারা বিনতে আহমেদ-এর মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি খুলনায় জেলা পর্যায়ের একটি সভায় আছেন বলে জানান। পরে মুঠোফোনে খুদেবার্তার মাধ্যমে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানতে চাওয়া হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
‎অন্যদিকে ডা. জহিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, তিন উপজেলায় তাঁর দায়িত্ব পালন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অফিসিয়াল আদেশের ভিত্তিতে। ফলে ওই আদেশের পাশাপাশি হাসপাতালের ওটি রেজিস্টার, ডিউটি রোস্টার ও রোগী রেফারের তথ্য পর্যালোচনা করলে পাইকগাছার বর্তমান অস্ত্রোপচার সেবার বাস্তব চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।
পাইকগাছার মানুষের প্রত্যাশা খুব বেশি কিছু নয়—জরুরি মুহূর্তে কাছের সরকারি হাসপাতালেই যেন প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাওয়া যায়। তিন লক্ষাধিক মানুষের পাশাপাশি আশপাশের এলাকার রোগীদের চিকিৎসার চাপ সামলে সেই নিশ্চয়তা কতটা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। আর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে প্রয়োজন আরও জনবল, সমন্বিত দায়িত্ব বণ্টন এবং জরুরি চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা বাড়ানোর কার্যকর উদ্যোগ।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
ACP
লেখক / প্রতিবেদক

ACP

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।