বঙ্গের হিন্দু হৃদয়সম্রাট শ্রী তপন ঘোষ এর ৬৯তম জন্মদিন

বঙ্গের হিন্দু হৃদয়সম্রাট শ্রী তপন ঘোষ এর ৬৯তম জন্মদিন

আজ ১১মে হিন্দু জাতীয়তাবাদী নেতা, হিন্দু সংহতির প্রতিষ্ঠাতা,পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুর অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ের রূপকার, বঙ্গের হিন্দু হৃদয়সম্রাট শ্রী তপন ঘোষ এর ৬৯তম জন্মদিন।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার সালার থানার অন্তর্গত দক্ষিণখণ্ড নামক একটি প্রত্যন্ত গ্রামে ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দের আজকের দিন অর্থাৎ ১১ মে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম শ্রী গঙ্গাধর ঘোষ এবং মাতার নাম শ্রীমতী অনিমা ঘোষ। তাঁরা দুই বোন এক ভাই। তিনি কখনও বিয়ে করেনি।

ছোট্ট বয়স থেকেই তপন ঘোষ লেখাপড়ার পাশাপাশি পারিবারিক ভাবে ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ওঠেন। ঠাকুরদার কাছে রামায়ণ, মহাভারত সহ বিভিন্ন শ্রেষ্ঠ আদর্শিক চরিত্রের সম্পর্কে তিনি বাল্যকালেই জানতে পারেন। প্রায় পাঁচ বছর বয়সেই রামায়ণ, মহাভারতের অনেক কাহিনী আত্মস্থ হয়ে যায়। এই শুদ্ধ, মানবিক এবং বিরত্বের কাহিনী উত্তরকালে তাঁর উপরে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। বাল্যকাল থেকে যৌবনকাল পর্যন্ত তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে ধর্মীয় আচার পালন করতেন। পরবর্তীতে তিনি ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালনের থেকে স্বধর্ম রক্ষায় বেশি মনোযোগী হন। বাল্যকালে তিনি নিজেই মাটির প্রতিমা তৈরি করে পূজা করতেন। যথাসম্ভব ধ্যান করতেন। ঈশ্বরকে কাছে পাওয়ার এক তীব্রতর প্রচেষ্টা তাঁর বাল্যকাল থেকেই ছিলো।

তিনি মাত্র ১৩ বছর বয়সে ভারতের একটি ডানপন্থী হিন্দু জাতীয়তাবাদী,আধাসামরিক ও বেসরকারী স্বেচ্ছা-সেবক সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) এর সাথে জড়িত হন। স্কুল শেষ করার পরে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়তে পড়তে যান এবং পরে পদার্থবিদ্যায় স্নাতক সম্পন্ন করেন। ছাত্রজীবনে তিনি এবিভিপির সদস্য হয়ে ছাত্র রাজনীতিতে প্রবেশ করেছিলেন। তিনি ‘বুদ্ধ অমরনাথ যাত্রা’-র (রাজৌরী) একটি বিশাল প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিতেন। দিল্লী, কাশ্মীর, পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসামসহ ভারতের বিভিন্ন স্থানে তিনি আরএসএস প্রচারক হিসাবে ভ্রমণ করেছিলেন।

তিনি হিন্দু সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করতে সকল প্রকারের প্রচলিত অশাস্ত্রীয় সামাজিক বিভাজনের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। তিনি বলতেন হিন্দু সমাজের এই অশাস্ত্রীয় সামাজিক বিভাজনের ছিদ্র দিয়েই যুগেযুগে যোগেন মণ্ডলদের জন্ম হবে। এই যোগেন মণ্ডলরা নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থে জ্ঞাত অথবা অজ্ঞাতসারে হিন্দু বিরোধী বৈদেশিক শক্তির ফাঁদে পা দিয়ে স্বজাতির সর্বোচ্চ ক্ষতি করবে। পরবর্তীতে হয়ত বুঝতে পারলেও তাদের আর কিছুই করার থাকবে না। তিনি আমৃত্যু সক্রিয় ছিলেন,সমাজে প্রচলিত সকল প্রকারের সামাজিক ব্যবধান দূর করার। ছোটকাল থেকেই তিনি সকলের সাথে প্রাণভরে মিলেমিশে বড় হয়েছেন। সমস্ত মানুষকেই তিনি আপন করে নিতে পেরেছিলেন। নিজেকে কখনও কোন ক্ষুদ্র গণ্ডীর মধ্যে আবদ্ধ করে রাখেননি। পরিচিত হোক অথবা অপরিচিত হোক তাতে কিছুই যায় আসে না; সকলের দুঃখই তাঁকে বিচলিত করতো। এভাবেই তিনি সকলের বড় আপনজন হয়ে গিয়েছিলেন।

তিনি ছিলেন বাংলার বালা সাহেব ঠাকরে। নিস্তেজ বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে তিনিই প্রথম একটি জোশ নিয়ে এসেছিলেন। তাঁর অসংখ্য বক্তব্য এবং লেখালেখিতে তিনি বিষয়টি খোলাখুলিভাবে বলেছেন। তিনি বাঙালিকে শিখিয়েছিলেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে অধর্মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ এবং প্রতিশোধ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেমন আধমরাদের ঘা দিয়ে বাঁচাতে বলেছিলেন, তেমনি তিনিও পশ্চিমবঙ্গের আত্মকেন্দ্রিক সাথেপাছে না থেকে শুধু নিজেরা সুবিধা নিয়ে নেয়া তথাকথিত সেকুলারদের একটা রাষ্ট্রবাদী চেতনার আঙ্গিকে একটা জুতসই জবাব দিতে পেরেছিলেন।হিন্দুদের অধিকার আদায়ের জন্যে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, ‘হিন্দু সংহতি’ নামে একটি অরাজনৈতিক অধিকার আদায়ের সংগঠন। সংগঠনটিতে তাঁর আদর্শ প্রতিফলিত।

নিজ সংগঠন সম্পর্কে তপনদা ৫ ফেব্রুয়ারি,২০১৮ তাঁর ফেসবুক টাইমলাইনে বলেন:
“অন্য সংগঠনের সাথে সঙ্গে হিন্দু সংহতির তফাৎ কোথায় জানেন? হিন্দু সংহতি হিন্দুর প্রত্যেকটি সমস্যা সোজাসুজি টেক আপ করে, এবং সেগুলি নিয়ে লড়াই করে সমাধানের চেষ্টা করে। শুধু উপদেশ বা জ্ঞান দেয় না। না, একটু ভুল হল। প্রত্যেকটি সমস্যা নয়। যে সমস্যাগুলি আমাদের আয়ত্বের মধ্যে বলে মনে হয় শুধু সেই সমস্যাগুলি আমরা টেক আপ করি। বাকিগুলো করি না। কারণ হিন্দু সংহতি প্রতিবাদ করার জন্য তৈরী হয় নি। প্রতিকার করার জন্য তৈরী হয়েছে।এই মুহূর্তে তিনটি লাভ জেহাদের কেস আমাদেরকে ডীল করতে হচ্ছে। একটি মেয়ে জলপাইগুড়ির, একটি মেয়ে হাওড়ার ডোমজুর এর এবং একটি মেয়ে নন্দীগ্রামের। ২ টি নাবালিকা ও একটি সাবালিকা। কাজ এগোচ্ছে।”

সংগঠনটি জয়ধ্বনি হিসেবে গ্রহণ করেন, ‘জয় মা কালী’। সকল প্রোগ্রামে স্টেজে মা কালীর ছবি শোভা পেত। তপনদা বুঝতে পেরেছিলেন বাঙালির সাথে মা কালীর সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। সারা ভারতে যেখানেই বাঙালি, সেখানেই কালীমন্দির। বাঙালির রাষ্ট্রবাদী বা হিন্দুত্ববাদী চিন্তায় বাঙালির নিজস্বতা থাকতেই হবে। কোন উত্তর, পশ্চিম বা দক্ষিণ ভারত থেকে আমদানি করা তত্ত্বে নয়। বাঙালির হিন্দুত্ববাদী চেতনায় থাকবে- রাজা শশাঙ্ক, শ্রীচৈতন্য, রাজা প্রতাপাদিত্য, স্বামী বিবেকানন্দ, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ভূদেব মুখোপাধ্যায়, স্বামী প্রণবানন্দ, বিজ্ঞানী প্রফুল্লচন্দ্র রায়, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, মাস্টারদা সূর্যসেন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, নেতাজী সুভাসচন্দ্র বসু প্রমুখ। তবেই এ তত্ত্ব সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছাতে পারবে।

শ্রী তপন ঘোষ মারণব্যাধি করোনায় আক্রান্ত হয়ে ২০২০ সালের ৪ জুলাই হাসপাতালে ভর্তি হয়। তিনি হয়ত বুঝতে পেরেছিলেন যে ভেন্টিলেশন থেকে আর ফিরে আসবেন না। তাই তাঁর আদর্শিক শিষ্য রাজা দেবনাথকে ফোন করে ঐদিন শনিবার হাসপাতালে ভেন্টিলেশনে যাবার শেষ মুহূর্তে ২:১৭ মিনিটে শেষ কথাগুলো বলেছিলেন। রাজা দেবনাথ তার মোবাইলে কথাগুলো রেকর্ডিং করে নেয়।

“মেডিকেল হসপিটালের ডাক্তার নার্সরা প্রচুর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু মনে হচ্ছে ঠাকুরের ইচ্ছা মা কালীর ইচ্ছা অন্যরকম। তাই আমি এখন স্বামী বিবেকানন্দ,ডাক্তারজী (আরএসএস প্রতিষ্ঠাতা), গুরুজী (আরএস এস এর দ্বিতীয় সঙ্ঘ চালক), শ্রী কে. এন. গোবিন্দ আচার্য এবং আমার মা ও বাবার আশীর্বাদ নিয়ে পৃথিবীর থেকে বিদায় নিতে চাই। কোন মৃত্যুভয় নেই। বার বার আসবো এই ভারত মায়ের কোলে ফিরে। ভারত মাতা কি জয়!”

মৃত্যুসজ্জায় এমন নির্ভীকচিত্তে জীবনকে স্রষ্টার কাছে সমর্পণ করে পুনরায় মাতৃভূমিতে জন্ম নেওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করা; একমাত্র দৃঢ়হৃদয় নির্ভীক চিত্তের মানবের পক্ষেই সম্ভব। সাধারণ মানুষের পক্ষে বিষয়টি কল্পনায় আসবে না। শ্রী তপন ঘোষ ২০২০ সালের ১২ জুলাই সন্ধ্যা ৭.২০ মিনিটে কোলকাতার এক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৭ বছর।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
Brinda Chowdhury
লেখক / প্রতিবেদক

Brinda Chowdhury

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।