তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভায় রদবদল আনা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা জহির উদ্দিন স্বপনকে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় উপদেষ্টা করা হচ্ছে। আর নতুন তথ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেতে যাচ্ছেন শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই শেখ হেলালের কন্যার স্বামী বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ। তার মা শেখ রেবা রহমান ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমানের ভাইঝি এবং শেখ ফজলুল করিম সেলিমের বোন। বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে। স্বপনকে সরিয়ে পার্থ
জহির উদ্দিন স্বপন মাত্র কয়েক মাস তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম নিয়মতান্ত্রিক ও পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে পরিচালনার কথা বলেছিলেন। একই সময়ে সাংবাদিকতা পেশার স্বীকৃতি, প্রেস অ্যাক্রিডিটেশনসহ গণমাধ্যম-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে তিনি সক্রিয় ছিলেন।
এ কারণে সাংবাদিকদের একটি অংশের কাছে তার মন্ত্রণালয় পরিবর্তনের বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই আলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে গণমাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগ, সাংবাদিকদের পেশাগত স্বার্থ এবং তথ্যপ্রবাহের ক্ষেত্রে একজন মন্ত্রীর অবস্থান কতটা কার্যকর ছিল—তা নিয়েও মূল্যায়ন শুরু হয়েছে।
ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ যিনি একসময় পারিবারিক চিনি শিল্পে আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির মধ্য দিয়ে বিত্তবান হয়েছিলেন এবং গত ১৫–১৬ বছর ধরে আওয়ামী লীগের সুনাম, অর্জন ও আন্দোলনের ফসলকে পুঁজি করে বিশেষ পরিবারের জামাই পরিচয়ের ঢাল নিয়ে সক্রিয়ভাবে ক্ষমতার সুবিধা ভোগ করছিলেন। ২০০৮ সালের এপ্রিলে নাজিউর রহমান মঞ্জুর মৃত্যুর পর পার্থ বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর জাতীয় রাজনীতিতে তার অবস্থান আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোলা-১ আসনে চারদলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন আন্দালিব রহমান পার্থ। ওই নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী ইউসুফ হোসেন হুমায়ুনকে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সংসদ সদস্য হিসেবে ২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনি সংস্থাপন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন।
২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট নির্বাচন বর্জন করায় পার্থর দলও ওই নির্বাচনে অংশ নেয়নি।
২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে ঢাকা-১৭ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতি নেন। একই সময়ে তিনি ঢাকা-১৭ ও ভোলা-১ আসন থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন।
বংশপরিচয়ঃ আন্দালিব রহমান পার্থর পরিবার ভোলার বালিয়ার তালুকদার বংশ হিসেবে পরিচিত। পারিবারিক বর্ণনা অনুযায়ী, তার পূর্বপুরুষ মুঙ্গা খাঁ আঠারো শতকে আফগানিস্তানের গরমশির অঞ্চল থেকে বৃহত্তর বরিশালের সালুকা গ্রামে এসে বসতি স্থাপন করেন। পরবর্তী সময়ে তার বংশধররা ভোলার বালিয়া ও গজারিয়া এলাকায় খারিজা তালুক লাভ করে সেখানে বসতি স্থাপন করেন।
মুঙ্গা খাঁর ছেলে শেখ মহম্মদ মুঘল আমলে রাজস্ব প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে পারিবারিক সূত্রে উল্লেখ করা হয়। সে সময় তিনি ‘শিকদার’ উপাধি লাভ করেন বলে বংশীয় ইতিহাসে দাবি করা হয়েছে।
পার্থর নসবনামা অনুযায়ী—আন্দালিব রহমান পার্থ- ইবনে নাজিউর রহমান মঞ্জুর -ইবনে বজলুর রহমান তালুকদার- ইবনে আব্দুর রহমান তালুকদার -ইবনে আরব আলী শিকদার -ইবনে শেখ বাখর শিকদার -ইবনে শেখ দুবিল খাঁ -ইবনে শুকুর মহম্মদ শিকদার- ইবনে শেখ মহম্মদ শিকদার ও ইবনে মুঙ্গা খাঁ।
অপরদিকে জহির উদ্দিন স্বপনঃ বরিশাল জেলার গৌরনদী উপজেলার সরিকল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর করা মিডিয়া বান্ধব এই নেতার হাতে তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব আসায় সন্তোষ প্রকাশ করেছিল সংবাদ কর্মীসহ সাধারন মানুষ।
জহির উদ্দিন স্বপনের রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়েছিল ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। আশির দশকে বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রীর কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে রাজপথের লড়াকু সৈনিক হিসেবে তার ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। ১৯৯৩ সালে তিনি বিএনপিতে যোগ দেন।
পরবর্তীতে জহির উদ্দিন স্বপন ১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ ও ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রার্থী হিসেবে বরিশাল-১ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-১ আসন থেকে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে পরে ধানের শীষ প্রতীককে সমর্থন জানিয়ে সেই নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-১ আসন থেকে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি পরাজিত হন।
পরবর্তী সময়ে দলের মিডিয়া সেলের প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক, কেন্দ্রীয় তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক এবং বর্তমানে দলীয় চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। ফ্যাসিস্ট আওয়ামীলীগ সরকারের পতনের আন্দোলনে স্বপনের অগ্রণী ভূমিকা ছিল। ফ্যাসিস্ট সরকার পতনসহ বিভিন্ন আন্দোলন ও সংগ্রাম করতে গিয়ে তিনি কয়েকবার গ্রেফতার হয়ে কারাভোগ করেছেন।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-১ (গৌরনদী-আগৈলঝাড়া) আসনে ১২৯টি ভোটকেন্দ্রে বিএনপির মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী ও দুবারের সাবেক এমপি জহির উদ্দিন স্বপন ১ লাখ ৫৫২ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী মাওলনা কামরুল ইসলাম খান ৪৬ হাজার ২৬৩ ভোট পেয়েছেন।
জহির উদ্দিন স্বপন ৪৯ হাজার ২৯৫ ভোট বেশি পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এই জয়কে বরিশাল অঞ্চলে বিএনপির রাজনৈতিক পুনরুত্থানের বড় ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। তার বিজয়ের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ১৮ বছর পর আসনটি বিএনপির দখলে ফিরে আসে।
এটি জহির উদ্দিন স্বপনের তৃতীয়বার সংসদে যাওয়া। এর আগে সংসদ সদস্য থাকাকালীন তিনি পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি এবং সংস্থাপন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে সরকারি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কাজ করেছেন।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও তার সরব উপস্থিতি রয়েছে। তিনি দুবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এছাড়া বিশ্বব্যাপী আইনপ্রণেতাদের নেটওয়ার্ক ‘পার্লামেন্টারিয়ানস ফর গ্লোবাল অ্যাকশন (পিজিএ)’-এর এশিয়া অঞ্চলের সহ-সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে তার।
সরকারের একটি সূত্র জানিয়েছে, জহির উদ্দিন স্বপন তথ্যমন্ত্রীর পদ থেকে সরে গেলেও মন্ত্রীর পদমর্যাদায় উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। তবে তাকে কোন মন্ত্রণালয় বা বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হবে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।


