চীন ভারত সম্পর্কের নেপথ্যে

চীন ভারত সম্পর্কের নেপথ্যে

ইউক্রেন ইস্যুতে জাতিসংঘের রাশিয়ার বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে ভারত। তাতে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক খারাপ হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। কিন্তু অর্ধ শতাব্দী স্থায়ী রুশ-ভারত কূটনৈতিক  অক্ষ বলয়ের একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটল। ইউক্রেন ইস্যুতে রাশিয়ার বিরুদ্ধে উত্থাপিত এই নিন্দা প্রস্তাবে – ভোটদানে বিরত ছিল চীন। বাংলাদেশ ভোটদানে বিরত থেকে চীনকে অনুসরণ করেছে, ভারতকে অনুসরণ করেনি।

১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রাক্কালে, তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে মৈত্রী চুক্তি করেছিল ভারত। এরপর পাকিস্তান সফরে আসা মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারকে গোপনে চীন সফরে নিয়ে গিয়েছিলেন জুলফিকার আলী ভুট্টো। দেখতে দেখতে রুশ-ভারত মৈত্রী বলয়ের বিপরীতে গড়ে ওঠে চীন-মার্কিন গভীর দোস্তি।

মাও সেতুং-এর মৃত্যুর পর,  মহান পরিকল্পনাবিদ দেং জিয়াও পিং জেল থেকে বের হয়ে এসে – চীনের দরজা-জানালা সব খুলে দেন। আমেরিকা ও তার মিত্রদের পুঁজি ও প্রযুক্তির সুবাতাস প্রবেশ করতে থাকে চীনের অর্থনীতিতে। ফলশ্রুতিতে চীন আজ ইকোনমিক সুপারপাওয়ার। ইতোমধ্যেই ইউরোপীয় ইউনিয়নকে টপকে গেছে চীন। ২০৩১ সাল নাগাদ চীনের জিডিপি আমেরিকার জিডিপিকে অতিক্রম করতে চলছে।

আমেরিকা কিন্তু চীনের এই মহা-উত্থান দেখতে চাইনি। আমেরিকা ও তার বিত্তবান মিত্ররা আন্তরিক ভাবে চেয়েছিল – বিশ্বমঞ্চে ভারত সুপারপাওয়ার হিসেবে উঠে আসুক। এজন্য তারা চেষ্টার কোন ত্রুটি করে নি।

গান্ধী-নেহেরু পরিবার শাসিত ভারত, প্রথমদিকে ‘একলা চলোরে’ নীতি নিয়েছিল; তারপরে ঝুঁকে পড়েছিল সমাজতান্ত্রিক ব্লকের দিকে। আধুনিক প্রযুক্তি ও পুঁজি প্রবেশের সমস্ত দরজা বন্ধ করে রেখে – ভারত নিজেই নিজেকে সান্ত্বনা দিয়েছে। একে একে দক্ষিন এশিয়ার বাজারগুলোতে চীনের কাছে শীর্ষস্থান হারিয়ে, ভারত নিজেই পরিণত হয়ে গেছে – চীনের একটি বৃহৎ বাজারে।

নরসিমা রাও – মনমোহন সিং জুটি, বিলম্বে হলেও ভারতের অর্থনীতির সংস্কার করেছিলেন। পশ্চিমা পুঁজি ও প্রযুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। এর সুফল ভারত ভোগ করছিল এবং আশানুরূপ না হলেও ভারতীয় অর্থনীতির যথেষ্ট সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল।

২০১৫ থেকে ২০১৭ সাল নাগাদ ভারতের অর্থনীতি হঠাৎ হোঁচট খায়। প্রবৃদ্ধি মুখ থুবড়ে পড়ে। রুপির দরপতন  অব্যাহত থাকে। বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে যায়। ব‍্যাপক মূল্যস্ফীতি দেখা দেয়। শেয়ারবাজার অতিমূল্যায়িত হয়ে যাওয়ার ফলে, মধ্যবিত্ত স্টক এক্সচেঞ্জ থেকে ছিটকে যায়। কর্পোরেট জায়ান্টগুলো অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে পরিস্থিতির সুযোগ গ্রহণ করে; ফলে ধন-বৈষম্য আরো প্রকট হয়ে ওঠে। ভারতীয় বিশেষজ্ঞরা এই আর্থিক ছন্দপতনের জন্য, বিজেপি সরকারের কয়েকটি অভূতপূর্ব সিদ্ধান্তকে দায়ী করে। যদিও এই সময়কালে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য হ্রাস পাওয়ায়, ভারতের রিজার্ভ যথেষ্ট স্ফীত হয়েছিল।

যে সমস্ত স্বনামধন্য আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ভারতকে সম্ভাব্য সুপার পাওয়ার হিসেবে তুলে ধরেছিল, তারা উল্টো গান গাইতে শুরু করে। গবেষণা সংস্থাগুলো জানিয়ে দেয় : ভারতের বেশকিছু গুরুতর অভ্যন্তরীণ সঙ্কট রয়েছে। ভারতের জনবিন্যাস বদলে যাচ্ছে। প্রবৃদ্ধির সমস্ত সুফল চলে যাচ্ছে বৃহৎ কর্পোরেট সংস্থাগুলোর পকেটে। লাগামহীন দুর্নীতি, বিদেশে অর্থ পাচার এবং সম্পদের মারাত্মক বৈষম্যপূর্ণ বন্টন সহ নানাবিধ কারণে, ভারতীয় অর্থনীতি মধ্য-আয়ে স্থবির হয়ে থাকবে। এমত অবস্থায় ভারতের পক্ষে কিছুতেই আমেরিকা বা চীনের বিকল্প বিশ্বশক্তি হিসেবে উঠে আসা সম্ভব নয়।

ভারতের অভ্যন্তরীণ আর্থ-সামাজিক সমস্যা উদ্ভূত নেতিবাচক ভাবমূর্তির কারণে হোক; অথবা চীনের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদীর অতিরিক্ত মাখামাখির কারণে হোক; কিংবা অন্য যে কারণেই হোক – হঠাৎ করে ভারতকে কিছুটা কম গুরুত্ব দিতে আরম্ভ করে আমেরিকা। আফগানিস্তান ইস্যুতে আমেরিকা একাধিক বৈঠকে চীন, রাশিয়া ও আরব মিত্রদের সঙ্গে শলা-পরামর্শ করেছে; কিন্তু ভারতকে ডাকেনি, ঠাণ্ডা মাথায় উপেক্ষা করেছে। অথচ ভারত বিশাল বিনিয়োগ করে রেখেছিল- আমেরিকা নিয়ন্ত্রিত আফগানিস্তানে। ন্যাটোর প্রস্থানে, ভারতের সমস্ত বিনিয়োগ আজ জলে যেতে বসেছে।

২০২০-২১ সালে করোনা মহামারী বিশ্ব অর্থনীতি তছনছ করে দিয়েছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের অক্লান্ত পরিশ্রমে করোনা ভাইরাস পরাজিত হতে না হতেই, ইউক্রেনে আগ্রাসন চালায় রাশিয়া। বিশ্ব রাজনীতি টালমাটাল। বৈশ্বিক মন্দার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে পশ্চিম ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ার সমৃদ্ধশালী অঞ্চলের বাইরের – সমস্ত অবস্থান থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে গেছে আমেরিকা। তাতে চীনের যে পোয়াবারো, সে কথা বলাই বাহুল্য।

ভারতের জায়গা দখল করে রেখেছে চীন। পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে চীন বহুবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ভারতকে চেপে ধরেছে। অথচ চীনের বিরুদ্ধে যখন প্রস্তাব আসে, রহস্যজনক কারণে ভারত সাধারণত চীনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় না। বেশিরভাগ সময় নিরপেক্ষ থাকে, মাঝে মধ্যে চীনকে সমর্থনও করে।

২০২১-২২ অর্থবছরে চীন ৯৪.১৬ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি করেছে ভারতের কাছে। অপরদিকে চীনের কাছে ভারতের রপ্তানি মাত্র ২১.২৫ বিলিয়ন ডলার। এই বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি ভারতের একটি শক্তিশালী বাণিজ্যিক অস্ত্র। কিন্তু আশ্চর্যজনক  ব্যাপার হচ্ছে, আন্তর্জাতিক ফোরামে চীনের হাতে এতবার নাজেহাল হয়েছে ভারত; তবুও ভারত এই অমোঘ বাণিজ্য অস্ত্রটি চীনের বিরুদ্ধে একবারও প্রয়োগ করে নি।

প্রশ্ন হচ্ছে, ভারতীয় শাসকদের চীনের প্রতি এত দুর্বলতার কারণ কী?

ভারতীয় বিশেষজ্ঞদের অভিমত : ঔষধ, ইলেকট্রনিক্স, কম্পিউটার হার্ডওয়ার প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পের কাঁচামালের জন্য চীনের উপর নির্ভরশীল ভারত। এই সমস্ত অপরিহার্য পণ্যের পর্যাপ্ত বিকল্প উৎস নেই। যার ফলে ইচ্ছা থাকলেও, চীনের বিরুদ্ধে শক্ত কোন ব‍্যবস্থা নিতে পারছে না ভারত।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
Brinda Chowdhury
লেখক / প্রতিবেদক

Brinda Chowdhury

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।