ঘূর্ণিঝড় ‘রোয়ানু’ র আঘাতে লন্ডভন্ড উপকুল, নিহত ২১

বিশেষ প্রতিনিধিঃ ঘূর্ণিঝড় ‘রোয়ানু’ শেষ মুহূর্তে কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়লেও শুক্রবার রাতে ও গতকাল শনিবার এর আঘাতে উপকূলীয় এলাকা তছনছ হয়ে গেছে। গাছ, দেয়াল ও ঘর চাপা পড়ে, ইটের আঘাত ও ট্রলারের চাপায় উপকূলীয় কয়েকটি জেলায় নারী ও শিশুসহ অন্তত ২১ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে চট্টগ্রামে ১০ জন, কক্সবাজারে ৩ জন, ভোলায় ৩ জন, নোয়াখালীর হাতিয়ায় উপজেলায় ৩ জন ও পটুয়াখালীতে একজন রয়েছেন। আহত হয়েছেন শত শত মানুষ। নিখোঁজ রয়েছেন বেশ কয়েকজন।

ঝড়ে বিধ্বস্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কয়েক হাজার বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থা। টানা প্রবল বর্ষণ ও দমকা হাওয়ায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাস ও জোয়ারে তলিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ এলাকা, পুকুর ও মাছের ঘের। ঘূর্ণিঝড়ের কারণে সারা দেশের নৌযান চলাচল বন্ধ ও উপকূলের বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেয়া হয়। চট্টগ্রাম বন্দরসহ কয়েকটি বন্দরের কার্যক্রমও বন্ধ রয়েছে। জেটি থেকে সাগরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে জাহাজগুলোকে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে রাজধানীসহ সারা দেশেই বৃষ্টি হচ্ছে।

ভোলায় নিহত , আহত শতাধিক
ভোলা সংবাদদাতা জানান, ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর প্রভাবে ভোলায় তিনজন নিহত ও শতাধিক লোক আহত হয়েছেন। তলিয়ে গেছে ২৫ গ্রাম। জেলার তজুমদ্দিন উপজেলার শশীগঞ্জ বাজারের শতাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ পাঁচ শতাধিক ঘরবাড়ি লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। এ সময় ঘর চাপা পড়ে মফিজের ছেলে ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র আকরাম ও রেখা নামে এক গৃহবধূ নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন শতাধিক লোক। দৌলতখান উপজেলায় ঘরচাপা পড়ে রানু বিবি নামে এক মহিলা নিহত হয়েছেন। তিনি উপজেলার জয়নগর ইউনিয়নের বাসিন্দা ইসমাইল হোসেনের স্ত্রী।

ভোলা-তজুমদ্দিন-চরফ্যাসন সড়কের ওপর বিভিন্ন স্থানে গাছ পড়ে যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এর মধ্যে চরফ্যাসন উপজেলার পর্যটন এলাকা কুকরি মুকুরি ইউনিয়নে বেড়িবাঁধের স্লুইস গেট না থাকায় প্রায় ১০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। লালমোহনের লর্ড হার্ডিঞ্জ ইউনিয়নের উত্তর লর্ড হার্ডিঞ্জ পাটারি হাটের দক্ষিণ পাশে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধ ভেঙে সাতটি গ্রাম প্লাবিত হয়ে সহস্রাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়ে।

তজুমদ্দিন উপজেলার চেয়ারম্যান অহিদুল্লাহ জসিম জানান, রাত ৩টার দিকে প্রায় ২০ মিনিটের টর্নেডোর মতো ঘূর্ণিঝড়ে শশীগঞ্জ বাজার লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। তার বাড়ির পাশে ঘর চাপা পড়ে মফিজের ছেলে ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র আকরাম গুরুতর আহত হয়। রাতেই তাকে হাসপাতালে নেয়া হলে ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ছাড়া বাজারের অন্তত একশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বিধ্বস্ত হয়েছে। বিদ্যুতের অন্তত পাঁচ-সাতটি পিলার ভেঙে পড়েছে। অপর দিকে তজুমদ্দিনের চাঁদপুর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডে ঘর চাপা পড়ে নয়নের স্ত্রী রেখা (৩৫) নিহত হয়েছেন।

চরফ্যাসন উপজেলার কুকরি মুকরি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবুল হাসেম জানান, তার এলাকায় বেড়িবাঁধে ১২টি পয়েন্টে স্লুইস গেট না থাকায় অতি জোয়ারের পানিতে প্রায় ১০ হাজার লোক পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। একই অবস্থা সাগর মোহনার অপর ইউনিয়ন ঢাল চরে তিন-চার ফুট পানিতে প্লাবিত হয়েছে। সেখানেও প্রায় এক হাজার লোক পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। অন্য দিকে মনপুরা উপজেলার সাকুচিয়া ইউনিয়নে বেশ কয়েকটি বাড়িঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। এ ছাড়া পুরো জেলার ওপর দিয়ে সকাল থেকে ঝড়োবাতাস ও বৃষ্টি চলছে।

ভোলা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন জানান, তজুমদ্দিনে এক শিশু ঘর চাপা পড়ে মারা যাওয়ার খবর তিনি শুনেছেন। বিভিন্ন এলাকার ক্ষয়ক্ষতির খবর তিনি নিচ্ছেন।

এ দিকে বাতাসের তোড়ে ভোলার মেঘনা নদীতে বালুভর্তি দু’টি কার্গোডুবি হয়েছে। শনিবার বেলা ১১টার দিকে মেঘনা নদীর ভোলা সদরের ইলিশা এলাকায় তীরের কাছে কার্গো দু’টি ডুবে যায়। এতে ওই দুই কার্গোতে থাকা চার শ্রমিক নিখোঁজ রয়েছেন। ভোলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মীর খায়রুল কবির দুর্ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, কার্গো দু’টিতে ভোলা শহর রা বাঁধের জিওব্যাগের বালু আনা হচ্ছিল।

হাতিয়ায় মামেয়েসহ জন নিহত
নোয়াখালী ও হাতিয়া সংবাদদাতা জানান, হাতিয়া উপজেলায় প্রচণ্ড জোয়ার ও জলোচ্ছ্বাসে বেড়িবাঁধ ভেঙে ২০টি গ্রাম প্লাবিত হয়। ঝড়ে পাঁচ হাজারের বেশি বাড়িঘর বিধ্বস্ত হয়। এ সময় পানিতে ডুবে নলের চরের আদর্শ গ্রামের একই পরিবারের মা মিনারা বেগম (৩৫), মেয়ে মরিয়মের নেসা (১০) ও জাহাজমারা গ্রামের মাহমুদা বেগম (৫১) প্রাণ হারান।

বেলা ১টা থেকে প্রচণ্ড বেগে ঝড় বয়ে যায়। পাশাপাশি প্রবল সামুদ্রিক জোয়ারে চর ঈশ্বর, সোনাদিয়া, নলচিরা, সুখচর, তমরুদ্দি ও নিঝুম দ্বীপের ২০টি গ্রাম পানিতে তলিয়ে যায়। এসব এলাকার কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়ে। জোয়ারে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পাঁচ হাজারের বেশি কাঁচা বাড়িঘর বিধ্বস্ত হয়। ৩০ হাজার মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে আশ্রয় নেয়।
নিঝুম দ্বীপ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মেরাজ উদ্দিন জানান, সকাল ৯টা বেড়িবাঁধ ভেঙে পানি ঢুকে বাড়িঘর ও রাস্তাঘাট তলিয়ে যায়। অনেক

বাড়িঘর নদীতে ভেসে গেছে। এ অঞ্চলের চার হাজার মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুল হাসনাত মোহাম্মদ মঈনউদ্দিন বলেন, পানিতে ডুবে তিনজন মারা গেছেন। ৩০ হাজার মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে গেছেন। নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে ২০ হাজার টাকা প্রদান ও আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে চিঁড়া-মুড়িসহ শুকনো খাবার সরবরাহ হচ্ছে।

কক্সবাজারে নিহত
কক্সবাজার সংবাদদাতা জানান, ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু কক্সবাজার উপকূল অতিক্রম করেছে। তবে যেকুটু ঝড় বয়ে গেছে তাতেই ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সাগরদ্বীপ কুতুবদিয়ায় উত্তর ধুরুং ইউনিয়ন উপকূলীয় উত্তাল সাগরে দু’টি ট্রলারের চাপায় ফজলুল হক (৫৫) নামের এক জেলের মৃত্যু হয়েছে। তিনি উপজেলার কৈয়ারবিল গ্রামের বাসিন্দা। অন্য দিকে দুপুরে একই ইউনিয়নের ধুরুং গ্রামের ঝড়ের কারণে ঘরের মাটির দেয়াল চাপা পড়ে মারা গেছে আবদুর রহিমের ছেলে মো: ইকবাল (২৫)। বিকেলে পুলিশ আলী আকবর ডেইল সৈকত থেকে উদ্ধার করে ফকির আলম (৪৯) নামে এক জেলের লাশ। তিনি ওই ইউনিয়নের তাবলেরচর গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে স্রোতের টানে ভেসে তার মৃত্যু হয়।

এ ছাড়া জেলার বিভিন্ন স্থানে গাছচাপায় আহত হয়েছেন শতাধিক ব্যক্তি। উঁচু জলোচ্ছ্বাসে কুতুবদিয়া, মহেশখালী ও টেকনাফের শাহপরীরদ্বীপ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। অসংখ্য ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত ও পানিতে তলিয়ে গেছে। শত শত চিংড়ি ঘের ভেসে গেছে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে কুতুবদিয়ায়। এই উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা সালেহিন তানভির গাজী জানান, দেয়াল ও নৌকা চাপায় দুইজন নিহত ও পাঁচজন গুরুতর আহত হয়েছেন। উত্তরধুরুং ও আলী আকবর ডেইল ইউনিয়ন পানিতে তলিয়ে গেছে। তিনি জানান, তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করা সম্ভব নয়, তবে ক্ষতি মারাত্মক। উত্তরধুরুং ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আ স ম শাহরিয়ার চৌধুরী জানান, তার ইউনিয়ন পানির নিচে রয়েছে। ১৫ হাজার মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছে। প্রায় ৫ হাজার ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে। ১২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে।

আলী আকবর ডেইল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নুরুচ্ছফা জানান, বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বেড়িবাঁধ উপচে জোয়ারের পানি লোকালয়ে প্রবেশ করায় তার ইউনিয়নের ৩ হাজার ঘরবাড়ি তলিয়ে গেছে। প্রায় ১২ হাজার মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছে।

মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ি, ধলঘাট, কতুবজোম, কালারমারছড়া ও শাপলাপুর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এসব এলাকায় ভেসে গেছে অসংখ্য চিংড়িঘের। পানের বরজের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে পুরো উপজেলায়। মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো:আবুল কালাম জানান, উপজেলায় কাঁচাঘরবাড়ির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া কক্সবাজার সদর, পেকুয়া চকরিয়াসহ জেলার উপকূলীয় অঞ্চলে অসংখ্য ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। তলিয়ে গেছে মহেশখালী, কক্সবাজার সদর ও চকরিয়া উপজেলার শত শত চিংড়ি ঘের।

পটুয়াখালীতে একজন নিহত
পটুয়াখালী সংবাদদাতা জানান, গতকাল ভোর রাতের দিকে ঝড়ো বাতাসের তীব্রতা বাড়লে জেলার দশমিনা উপজেলার উত্তর লক্ষ্মীপুর গ্রামে ঘরচাপা পড়ে নয়া বিধি (৫২) নামে এক মহিলা প্রাণ হারান। এ ছাড়া জোয়ারের পানির তোড়ে জলার রাঙ্গাবালী উপজেলার চরমোন্তাজের বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে দু’টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ওই এলাকার মৎস্য ব্যবসায়ী আজাদ সাথী জানিয়েছেন চরমোন্তাজ বউ বাজার এলাকায় ৬০ ফুট এবং রুহুল সিকদারের বাড়ির সামনের ২০০ ফুট বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে ওই এলাকা তলিয়ে গেছে। কুয়াকাটা-ঢাকা মহাসড়কের লেবুখালী ফেরি চলাচল বন্ধ করে দেওয়ায় দুই পাশে শত শত গাড়ি আটকা পড়েছে। এতে যাত্রীরা চরম দুর্ভোগে পড়েন।

দুর্যোগ মোকাবেলায় জেলা প্রশাসন জরুরি সভা করেছে। গতকাল দ্বিতীয় দিনের মতো সব ধরনের লঞ্চ চলাচল বন্ধ ছিল। নদী ও সাগরে মাছ ধরার ট্রলারগুলো কলাপাড়া, কুয়াকাটা, রাঙ্গাবলীর উপকূলের তীরে নিরাপদ স্থানে রয়েছে।

জেলা প্রশাসক এ কে এম শামিমুল হক ছিদ্দিকী জানান, দুর্যোগ মোকাবেলায় জেলা প্রশাসন প্রস্তুত রয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে।

শরণখোলায় বাড়িঘর প্লাবিত
শরণখোলা (বাগেরহাট) সংবাদদাতা জানান, শরণখোলায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৩৫/১ পোল্ডারের বেড়িবাঁধে ধস ও দুই শতাধিক বাড়িঘর বলেশ্বরের জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে সহস্্রাধিক মানুষ আশ্রয় নিয়েছে।

ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে গত তিন দিন ধরে টানা বর্ষণে শরণখোলার জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। আতঙ্কিত মানুষ আশ্রয় কেন্দ্রে রাত যাপন করেন। বগী ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য রিয়াদুল পঞ্চায়েত জানান, যেকোনো সময় বেড়িবাঁধ ভেঙে এলাকা প্লাবিত হতে পারে।

সাউথখালী ইউপি চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হোসেন জানান, তার ইউনিয়নের তাফালবাড়ি, বগী এলাকায় পানিউন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধে ব্যাপক ফাটল দেখা দিয়েছে, যেকোনো সময় ভেঙে গ্রামাঞ্চল প্লাবিত হতে পারে। বলেশ্বর নদীর জলোচ্ছ্বাসে বেড়িবাঁধের বাইরে থাকা বগী, তাফালবাড়ি এলাকার দুই শতাধিক বাড়িঘর প্লাবিত হয়েছে।

রাঙ্গাবালীতে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত, ক্ষয়ক্ষতি
রাঙ্গাবালী (পটুয়াখালী) সংবাদদাতা জানান, ঝড়ে উপজেলার চরমোন্তাজসহ কয়েকটি ইউনিয়নে অর্ধশত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্লাবিত হয়েছে নিম্নাঞ্চল এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঘের-পুকুরের মাছ ভেসে গেছে, গাছপালা উপড়ে গেছে।

চরমোন্তাজ ইউপি চেয়ারম্যান হানিফ মিয়া বলেন, বেড়িবাঁধ ভেঙে তার ইউনিয়নের কয়েকটি এলাকা তলিয়ে গেছে এবং ঘের ও পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। বউ বাজার এলাকায় কয়েকটি দোকান বিধ্বস্ত হয়েছে।

রাঙ্গাবালী ইউপি চেয়ারম্যান সাইদুজ্জামান মামুন খান বলেন, তার ইউনিয়নের কিছু এলাকায় পানি ঢুকে ঘের ও পুকুরের মাছ ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। এতে লাখ লাখ টাকা ক্ষতির মুখে পড়েছেন মাছচাষিরা। বসতঘর ও গাছপালা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’

উপজেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যসচিব ও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা তপন কুমার ঘোষ বলেন, স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে বেশি পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় কিছু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এ ছাড়া প্রচণ্ড ঝড়ো হাওয়ায় প্রায় ১০০ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’

পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক এ কে এম শামীমুল হক সিদ্দিকী জানান, ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের কাজ চলছে। তবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সাহায্যের জন্য ইতোমধ্যে ১৮০ মেট্রিক টন চাল এবং দুই লাখ টাকা বিভিন্ন উপজেলায় বণ্টন করে দেয়া হয়েছে।

বাগেরহাটে ১১ হাজার লোক আশ্রয়কেন্দ্রে
বাগেরহাট সংবাদদাতা জানান, মংলা বন্দরে ৭ নম্বর বিপদ সঙ্কেত জারির পর জেলার মোড়েলগঞ্জ, শরণখোলা ও মংলা উপজেলার ৩৫টি আশ্রয় কেন্দ্রে ১১ হাজারের বেশি লোক সরিয়ে নেয়া হয়েছে। শনিবার বেলা ১১টার পর থেকে বৃষ্টির সাথে সাথে দমকা হাওয়া শুরু হয়েছে।

দুর্যোগ মোকাবেলায় জেলা প্রশাসন শনিবার বেলা ১১টায় সর্বশেষ জরুরি সভা করে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৮৪টি মেডিক্যাল টিম এবং ১০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুত রাখা হয়েছে। লোকজনকে সরিয়ে নিতে প্রশাসনের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবকেরাও কাজ করছেন।

জেলা প্রশাসক মো: জাহাঙ্গীর আলম জানান, ৭ নম্বর বিপদ সঙ্কেত জারির পর থেকে মংলার আটটি আশ্রয়কেন্দ্র থেকে ২ হাজার, মোড়েলগঞ্জের ১৬টি আশ্রয়কেন্দ্র থেকে ১৩ শ’ এবং শরণখোলার ১১টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৮ হাজার লোককে আনা হয়েছে।

মংলা বন্দরের চেয়ারম্যান রিয়াল অ্যাডমিরাল রিয়াজ উদ্দিন আহম্মেদ জানিয়েছেন, বন্দরে অবস্থানরত দেশী-বিদেশী জাহাজসহ সব ধরনের জলযান নিরাপদে রাখা হয়েছে। বন্দরে নিজস্ব সতর্কতা এলার্ট ৩ জারি করা হয়েছে।

সোনাগাজীতে জন নিহত
ফেনী অফিস জানায়, ফেনীর উপকূলীয় উপজেলা সোনাগাজীতে গতকাল শনিবার দুপুরে ঘূর্ণিঝড় ‘রোয়ানু’র আঘাতে ব্যাপক য়তি হয়েছে। উপজেলার চরছান্দিয়া এলাকায় একজন নিহত হয়েছে। উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে এবং ঝড়ে গাছপালা ভেঙে পড়েছে ও বসতবাড়ি লণ্ডভণ্ড হয়েছে। ভেসে গেছে পুকুর ও মৎস্য খামারের মাছ।

জানা গেছে, শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টার পর ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু সোনাগাজীর উপকূলীয় এলাকা অতিক্রম শুরু করে। এ সময় ঘূর্ণিঝড়ের গতিবেগ ছিল ৭০ থেকে ৮০ কিলোমিটার। প্রচণ্ড ঝড়ো হাওয়ার মধ্যে দুপুরে চরছান্দিয়া এলাকার চর থেকে মহিষ আনতে গিয়ে নূর আলম (৩৫) নামের এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। তিনি ভূঞার বাজার এলাকার বাসিন্দা বলে জানা গেছে। এ দিকে জোয়ারের পানিতে উপজেলার তিন ইউনিয়নের ১০ গ্রাম এবং ভারী বৃষ্টিতে জেলা শহরের বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়। সকাল থেকেই পুরো জেলায় বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ রাখা হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শরিফা হক জানান, ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর প্রভাবে জোয়ারের পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় বেশ কয়েকটি এলাকা প্লাবিত হয়েছে। সোনাগাজী পল্লী বিদ্যুতের ওয়্যারিং পরিদর্শক হেলাল উদ্দিন জানান, ঝড়ো হাওয়ায় ২০টি বৈদ্যুতিক খুঁটি ভেঙে গেছে। গতকাল বিকেলে তিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে যান ফেনী-২ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন হাজারী।

মনপুরায় জন নিখোঁজ
মনপুরা (ভোলা) সংবাদদাতা জানান, উপজেলার বিচ্ছিন্ন চরনিজাম ও কলাতলীর চরের হাজারো মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। কলাতলী চরের চেয়ারম্যান বাজারের পশ্চিম পাশে বেলালের স্ত্রী ছলেমা খাতুন (৪০) জোয়ারের পানিতে ভেসে গেছেন। তীব্র ঢেউয়ের আঘাতে বেড়িবাঁধ ভেঙে জোয়ারের পানি ঢুকছে। ঝড়ে বিভিন্ন ইউনিয়নে পাঁচ শতাধিক ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

সরেজমিন দেখা গেছে, জোয়ারের তীব্রতায় প্রধান শহর রক্ষাবাঁধ হুমকির মুখে। জোয়ারের পানি ভেতরে প্রবেশ করায় শহরের ব্যবসায়ীদের মাঝে আতঙ্ক দেখা দেয়। ফলে অনেকে তাড়াহুড়ো করে তাদের দোকানের মালামাল অন্যত্র উঁচু স্থানে সরিয়ে নিতে দেখা গেছে। বিচ্ছিন্ন চরনিজাম ও কলাতলী চরে বেড়িবাঁধ না থাকায় জোয়ারের পানিতে চরাঞ্চলের ঘরবাড়ি ডুবে যায়। এতে করে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

মনপুরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন হাওলাদার জানান, জোয়ারের পানিতে কলাতলী চরের ঘরবাড়ি তলিয়ে গেছে। এই চরের ছলেমা খাতুন জোয়ারের পানিতে ভেসে গেছেন। তার কোনো খবর পাওয়া যায়নি। উত্তর সাকুচিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো: জাকির হোসেন বলেন, বিচ্ছিন্ন চরনিজামে বেড়িবাঁধ ও কিল্লা না থাকায় জোয়ারের পানিতে ঘরবাড়ি ডুবে গেছে। মাছ ভেসে গিয়ে প্রায় দেড় কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে মনপুরা ফিশারিজের কর্ণধার আলহাজ শামস উদ্দিন বাচ্চু চৌধুরী জানান। মনপুরা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সেলিনা আকতার চৌধুরী বলেন, ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর প্রভাব সম্পর্কে স্থানীয় জনসাধারণকে সতর্ক করা হয়েছে।

শিমুলিয়াকাওড়াকান্দিতে নৌযান চলাচল বন্ধ
মুন্সীগঞ্জ ও শিবচর (মাদারীপুর) সংবাদদাতা জানান, শিমুলিয়া-কাওড়াকান্দি নৌরুটে ফেরিসহ সব ধরনের নৌযান চলাচল গতকাল সকাল ৭টা থেকে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এর আগে শুক্রবার সন্ধ্যা পৌনে ৬টা থেকে কর্তৃপ লঞ্চ, সি-বোট ও ট্রলারসহ সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ করে দেয়। একই সাথে ওই নৌরুটে ফেরি চলাচলও সীমিত করা হয়।

বিআইডব্লিউটিসির এজিএম খালেদ নেওয়াজ জানিয়েছেন, পদ্মায় প্রচুর উঁচু ঢেউ ও ঝড়ো হাওয়ায় ফেরি চলাচল কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সকাল থেকে বৃষ্টি হচ্ছে। তাই ঝুঁকি এড়াতে শনিবার সকাল ৭টা থেকে রো রো ফেরিসহ সব ধরনের ফেরি চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। এর আগে ছোট আকারের সাতটি ফেরি গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যার দিকে বন্ধ করে দেয়া হয়। এখন সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে।

বিআইডব্লিউটিএ’র মাওয়া নৌবন্দর কর্মকর্তা মো: মহিউদ্দিন জানিয়েছেন, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া ও পদ্মায় অতিরিক্ত ঢেউয়ের কারণে শুক্রবার সন্ধ্যা পৌনে ৬টা থেকে শিমুলিয়া-কাওড়াকান্দি নৌরুটে লঞ্চ, সি-বোট ও ট্রলারসহ সব নৌযান চলাচল বন্ধ করা হয়েছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দিনভর বৃষ্টি
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সংবাদদাতা জানান, জেলার সর্বত্র দিনভর বৃষ্টি ও মাঝে মধ্যে দমকা হাওয়া বয়ে গেছে। মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়। বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকে। তবে জেলায় বড় ধরনের কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।

আশুগঞ্জ নৌবন্দরে সতর্কতা জারি করে বিআইডব্লিউটিএ। এতে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত এই নৌবন্দর থেকে ছয়টি নৌরুটে সব যাত্রীবাহী নৌযান চলাচল বন্ধ ঘোষণা করা হয়। আশুগঞ্জ নৌবন্দরের পরির্দশক (পরিবহন) মো: শাহ আলম জানান, রোয়ানুর প্রভাব না কাটা পর্যন্ত নৌযান চলাচল বন্ধ থাকবে।

ঝালকাঠিতে বৃষ্টি দমকা হাওয়া
ঝালকাঠি সংবাদদাতা জানান, জেলায় দমকা হাওয়ার সাথে টানা বৃষ্টি হচ্ছে। নিম্নাঞ্চলের সহস্রাধিক পরিবার সাইকোন শেল্টারে আশ্রয় নিয়েছে। গত শুক্রবার রাত থেকে বাতাস ও মাঝারি ধরনের বৃষ্টিপাত চলছে। জেলায় বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ রয়েছে। ঘরবাড়িতে পানি প্রবেশ করায় মানুষ বিপাকে পড়েছে। দু’দিন ধরে সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে। জেলা সদরে একটি ও জেলার চারটি উপজেলায় একটি করে কন্ট্রোলরুম খোলা হয়েছে। কাঁঠালিয়া উপজেলার শৌলজালিয়া ইউনিয়নের রগুয়ারচর এলাকায় দুই কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ভেঙে ও রাস্তা ডুবে ১০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। প্রবল বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে জেলা সদরের নিম্নাঞ্চলসহ চার উপজেলায় ৫০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।

ঝালকাঠি পাউবো জানিয়েছে, সুগন্ধা ও বিষখালি নদীর পানি স্বাভাবিকের চেয়ে তিন থেকে চার ফুট বৃদ্ধি পেয়েছে। জেলা প্রশাসক মো: মিজানুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, দুর্গতদের জন্য চাল এবং নগদ অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে।

পাইকগাছা (খুলনা) জানায়, টানা বৃষ্টিপাতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। উপজেলা প্রশাসন বিশেষ সতর্কতামূলক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। খোলা হয়েছে কন্ট্রোল রুম। ইউপি চেয়ারম্যান রিপনকুমার মণ্ডল জানান, বৃহস্পতিবার এলাকার মসজিদ ও মন্দিরগুলোতে মাইকিং করে মানুষকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। ইউএনও নাজমুল হক ও উপজেলা চেয়ারম্যান জানান, ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।

ভাণ্ডারিয়ায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত
ভাণ্ডারিয়া (পিরোজপুর) সংবাদদাতা জানান, ভাণ্ডারিয়ায় দিনভর টানা বৃষ্টি ও নদ-নদীতে জোয়ারের পানিতে উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। আতঙ্কে উপজেলার কঁচা ও পোনা নদীতে কোনো ভারী নৌযান, মৎস্য ট্রলার চলাচল ও মৎস্য শিকারিদের দেখা যায়নি। নদীতীরে বসবাসকারীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো: রুহুল কুদ্দুস জানান, লোকজনকে সতর্ক করতে এলাকায় মাইকিংসহ ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। সাইকোন শেল্টারগুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

বরিশালে বিদ্যুৎব্যবস্থা বিপর্যস্ত
বরিশাল ব্যুরো জানায়, ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর প্রভাবে গত তিন দিনে অব্যাহত বর্ষণে জেলার অধিকাংশ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। প্রবল বর্ষণে মাঠের ফসল, পানবরজ, বীজতলা, সবজি তে, পুকুর ও ঘেরের মাছ, গাছপালা, কাঁচা-পাকা সড়ক এবং ঘরবাড়িসহ বৈদ্যুতিক লাইনের ব্যাপক তি হয়েছে। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ সূত্রে জানা গেছে, ঝড়ো বাতাসে গাছের ডালপালা ভেঙে বিদ্যুতের লাইনের ওপর পড়ায় শুক্রবার রাত থেকে জেলার অধিকাংশ উপজেলার বিদ্যুৎব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।

জেলা প্রশাসক ড. গাজী মো: সাইফুজ্জামান জানান, ঘূর্ণিঝড়ে তি কমিয়ে আনতে ও দুর্যোগকালে জনগণকে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে নিতে ঘূর্ণিঝড় নিয়ন্ত্রণ ক চালু করা হয়েছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, অব্যাহত বৃষ্টিতে জমির আউশের বীজতলা সম্পূর্ণ বিনষ্টসহ ঝড়ো বাতাসে পানবরজ মাটির সাথে মিশে গেছে। নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় সবজি তে ও ফসলের ব্যাপক তি হয়েছে। জেলার অধিকাংশ পুকুর ও ঘের তলিয়ে গেছে।

নদী বন্দর কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান জানান, বরিশাল নদীবন্দরের জন্য শুক্রবার বিকেলে ২ নম্বর সতর্ক সঙ্কেত থাকলেও ঢাকাগামী সব লঞ্চ চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। শনিবারও অভ্যন্তরীণ রুটে লঞ্চ চলাচল বন্ধ রয়েছে। সাগর উত্তাল থাকায় মাছধরা সব ট্রলারকে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বলা হয়েছে।

রামগতিকমলনগরে শতাধিক কাঁচাঘর বিধ্বস্ত
কমলনগর (লক্ষ্মীপুর) সংবাদদাতা জানান, ঝড়ো হাওয়ায় রামগতি ও কমলনগর উপজেলায় পাঁচ শতাধিক কাঁচাঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আরো কয়েক শ’ কাঁচাঘর। ঝড়ো হাওয়ায় নদীতে ডুবে গেছে মাছধরার অর্ধশত নৌকা। জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হয়েছে দুই উপজেলার মেঘনা তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল। এ ছাড়া ঝড়ে গাছ ভেঙে পল্লী বিদ্যুতের সঞ্চালন লাইন ছিঁড়ে যাওয়ায় দুই উপজেলায় বন্ধ রয়েছে বিদ্যুৎ সরবরাহ। এ দিকে ঝড়ে গাছ ভেঙে সঞ্চালন লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় শুক্রবার রাত থেকে এখন (শনিবার সন্ধ্যা) পর্যন্ত দুই উপজেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।
কমলনগর উপজেলার পাটারীরহাট ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মাস্টার মো: শাহজাহান জানান, অস্বাভাবিক জোয়ারে পানির চাপে এবং ঝড়ো হাওয়ায় তার এলাকার ১০টি কাঁচাঘর বিধ্বস্ত হয়েছে।

সাহেবেরহাট ইউপি চেয়ারম্যান মো: আবুল খায়ের জানান, তার ইউনিয়নে ২০টি কাঁচাঘর বিধ্বস্ত ও মাছধরার ২৫টি নৌকা নদীতে ডুবে গেছে। চরআব্দুল্লা ইউপি চেয়ারম্যান মো: বেল্লাল হোসেন জানান, জোয়ারের পানিতে তার ইউনিয়নের তেলিরচর ও চরগাসিয়া এলাকার কামাল বাজার, চেয়ারম্যান বাজার ও জনতা বাজারসহ চর দু’টি প্লাবিত হয়। দুই শতাধিক কাঁচাঘর বিধ্বস্ত এবং তিন শতাধিক কাঁচাঘর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

রামগতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম শফি কামাল জানান, জলোচ্ছ্বাস ও ঝড়ো হাওয়ায় বিভিন্ন ইউনিয়নে ৩০০ কাঁচাঘর বিধ্বস্তসহ প্রায় ৫০০ ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

লালমোহনে সহস্রাধিক পরিবার পানিবন্দী
লালমোহন (ভোলা) সংবাদদাতা জানান, লালমোহনে বেড়িবাঁধ ভেঙে পাঁচ শতাধিক ঘরবাড়ি তলিয়ে গেছে। পানিবন্দী হয়ে পড়েছে সহস্রাধিক পরিবার। মেঘনা কূলবর্তী উপজেলার লর্ডহার্ডিঞ্জ, ধলীগৌরনগর ও তেঁতুলিয়া নদীতীরবর্তী বদরপুর ইউনিয়নের পৃথক তিনটি স্থানে বেড়িবাঁধ ভেঙে পানি প্রবেশ করছে। এসব এলাকায় চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে পরিবারের লোকজন। পানির কারণে রান্না করে খাবার মতো কোনো অবস্থা নেই তাদের। ভোর থেকে ইউপি চেয়ারম্যান আবুল কাশেম ও হেদায়েতুল ইসলাম মিন্টু এবং উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তাৎক্ষণিক ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য চাল, টাকা, চিঁড়া ও গুড় বিতরণ করেন। লর্ডহার্ডিঞ্জ ইউপি চেয়ারম্যান আবুল কাশেম মিয়া জানান, বেড়িবাঁধ ভেঙে ৫০০ ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে গেছে। ধলীগৌরনগর ইউপি চেয়ারম্যান হেদায়েতুল ইসলাম মিন্টু জানান, ৭০০ পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। চরভূতা, রমাগঞ্জ ইউনিয়নেও একাধিক ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে বলে জানান আনোয়ার রাব্বী।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা অপূর্ব দাস জানান, ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ১০ টন চাল, ২৫ হাজার টাকা, চিড়া, গুড় এবং দিয়াশলাই বিতরণ করা হয়েছে।

মহেশখালীতে বাড়িঘর লণ্ডভণ্ড
মহেশখালী (কক্সবাজার) সংবাদদাতা জানান, মহেশখালীতে বাড়িঘর লণ্ডভণ্ড ও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে প্রায় ৫০০ পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়েছে। অসংখ্য বাড়িঘর, গাছপালা ভেঙে গেছে। প্রবল বৃষ্টির ফলে উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে পড়েছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবুল কালাম জানান, এখন পর্যন্ত হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। তবে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। প্লাবিত বাড়িঘরের লোকজনকে সহযোগিতা করা হয়েছে।

রাঙ্গামাটিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ
রাঙ্গামাটি সংবাদদাতা জানান, শনিবার দুপুরে রাঙ্গামাটিতে ভারী বৃষ্টিপাত ও সেই সাথে ঝড়ো হওয়ায় গাছপালা ভেঙে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। রাতে পুরো শহর অন্ধকারে ডুবে যায়। শহরের রাস্তাঘাটে যানবাহন ও লোকজনের চলাচল কমে গেছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া লোকজন ঘরের বাইরে বের হননি। ঘূর্ণিঝড়ের কারণে সব নৌচলাচল এখনো বন্ধ রয়েছে।

বান্দরবানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি
বান্দরবান সংবাদদাতা জানান, ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর প্রভাবে বান্দরবানে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ঝড়ে সুয়ালক, রেইছা ও চিম্বুক এলাকায় অর্ধশাতাধিক কাঁচা ঘরবাড়ি ভেঙে গেছে। প্রবল বর্ষণে পানির তোড়ে বান্দরবান রোয়াংছড়ি সড়কের খানসামা পাড়া এলাকায় খালের ওপর নির্মিত বিকল্প রাস্তাটি ভেঙে যাওয়ায় এই সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। শনিবার সকাল থেকেই বিদ্যুৎহীন অবস্থায় রয়েছে বান্দরবান। এ ছাড়া জেলার রুমা রোয়াংছড়ি বাঘমারা কোনো জায়গাইতেই বিদ্যুৎ নেই। সঞ্চালন লাইনের গাছ ভেঙে পড়ায় বিদ্যুৎব্যবস্থা বন্ধ রয়েছ বান্দরবানে। তবে ঝড়ে কোথাও কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

চাঁদপুরে শতাধিক লঞ্চযাত্রী আটকা : নিম্নাঞ্চল প্লাবিত
চাঁদপুর সংবাদদাতা জানান, ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে চাঁদপুরেও উত্তাল হয়ে উঠেছে মেঘনা নদী। শক্রবার বিকেল থেকে শনিবার বিকেল পর্যন্ত টানা বৃষ্টির পাশাপাশি দমকা হাওয়া অব্যাহত থাকায় লঞ্চ চলাচল বন্ধ ছিল। এতে বরিশাল, ভোলা ও ঢাকাগামী শতাধিক যাত্রী চাঁদপুরে আটকা পড়েন। শনিবার সন্ধ্যার পর লঞ্চ চলাচল শুরু হয়। দুর্ঘটনা এড়াতে শনিবার ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চাঁদপুর শহরসহ জেলাজুড়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ রাখা হয়েছে। চাঁদপুর শহরের অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ থাকায় জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে।

হাওরে ফুট উঁচু ঢেউ
কুলাউড়া (মৌলভীবাজার) সংবাদদাতা জানান, ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর প্রভাবে উত্তাল হয়ে উঠেছে দেশের বৃহত্তম হাওর হাকালুকি। শুক্রবার রাত ও শনিবার দিনব্যাপী ঝড়-বৃষ্টি ও ধমকা হাওয়ায় হাকালুকি হাওর পারের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। হাওরে সাত-আট ফুট উঁচু ঢেউয়ের কারণে শত শত জেলে শনিবার মাছ ধরতে হাওরে গিয়ে ফিরে এসেছেন। ভুকশিমইল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান মনির জানান, প্রচণ্ড ঢেউয়ের আঘাতে তার ইউনিয়নের প্রায় ১০টি রাস্তায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি উঠেছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার তাহসিনা বেগম জানান, ঘূর্ণিঝড়ের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সকলকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

আগৈলঝাড়ায় ফসল সড়কের ক্ষতি
আগৈলঝাড়া (বরিশাল) সংবাদদাতা জানান, উপজেলায় গত তিন দিনে অব্যাহত বর্ষণে নিম্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দেবীচন্দ ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে ও দুর্যোগকালে জনগণকে দ্রুত আশ্রয় কেন্দ্রে স্থানান্তরের জন্য নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু করেছেন।

উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সুভাষ মণ্ডল জানান, বৃষ্টিতে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় সবজি ক্ষেত ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। শুক্রবার রাত থেকে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।

পাটুরিয়াদৌলতদিয়া রুটে নৌযান চলাচল বন্ধ
শিবালয় (মানিকগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ও আরিচা-কাজিরহাট নৌরুটে শুক্রবার বিকাল ৫টা থেকে লঞ্চ ও ট্রলারসহ সব নৌযান চলাচল বন্ধ ঘোষণা করেছে বিআইডব্লিউটিএ। তবে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া রুটে ফেরি চলাচল স্বাভাাবিক রয়েছে। প্রচণ্ড ঢেউ ও স্রোতের কারণে ফেরি চলাচলে বিঘ্নিত হচ্ছে। এ কারণে উভয় ঘাটে দু’শতাধিক যানবাহন ফেরি পারের অপেক্ষায় আটকে পড়েছে।

বিআইডব্লিউটিএর আরিচা অঞ্চলের সহকারী ব্যবস্থাপক (নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক) ফরিদুর রহমান জানান, পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত নৌযানসমূহ বন্ধ থাকবে।

ট্যাগ আগৈলঝাড়ায় ফসল ও সড়কের ক্ষতিআহত শতাধিকএকনজরে ঘুর্ণিঝড়ের ক্ষতিকক্সবাজারে নিহত ৩ঘুর্ণিঝড় রোয়ানুর ক্ষতিঘূর্ণিঝড় ‘রোয়ানু’ র আঘাতে লন্ডভন্ড উপকুলঘূর্ণিঝড় রোয়ানু'র আঘাতচাঁদপুরে শতাধিক লঞ্চযাত্রী আটকাঝালকাঠিতে বৃষ্টি ও দমকা হাওয়াদেখুন ঘুর্ণিঝড়ের ক্ষতিনিম্নাঞ্চল প্লাবিতপটুয়াখালীতে একজন নিহতপাটুরিয়া-দৌলতদিয়া রুটে নৌযান চলাচল বন্ধবঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ‘রোয়ানু’বরিশালে বিদ্যুৎব্যবস্থা বিপর্যস্তবাগেরহাটে ১১ হাজার লোক আশ্রয়কেন্দ্রেবান্দরবানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিব্যপক ক্ষয়ক্ষতিব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দিনভর বৃষ্টিভাণ্ডারিয়ায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিতভোলায় নিহত ৩মনপুরায় ১ জন নিখোঁজমহেশখালীতে বাড়িঘর লণ্ডভণ্ডরাঙ্গাবালীতে নিম্নাঞ্চল প্লাবিতরাঙ্গামাটিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধরামগতি-কমলনগরে ৫ শতাধিক কাঁচাঘর বিধ্বস্তরোয়ানুর ক্ষতিলন্ডভন্ড উপকুললালমোহনে সহস্রাধিক পরিবার পানিবন্দীশরণখোলায় বাড়িঘর প্লাবিতশিমুলিয়া-কাওড়াকান্দিতে নৌযান চলাচল বন্ধসোনাগাজীতে ১ জন নিহতহাওরে ৭-৮ ফুট উঁচু ঢেউহাতিয়ায় মা-মেয়েসহ ৩ জন নিহত

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
admin
লেখক / প্রতিবেদক

admin

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।