বিশেষ প্রতিনিধিঃ বেসরকারি স্কুল ও কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি পদে থাকতে পারছেন না সংসদ সদস্যরা। একই সাথে এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিশেষ কমিটি গঠনের সুযোগ বাতিল করা হয়েছে। বেসরকারি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধানমালা-২০০৯ এর ৫(২) ও ৫০ ধারা অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করে বিচারপতি জিনাত আরা ও বিচারপতি এ কে এম জহিরুল হকের ডিভিশন বেঞ্চ আজ বুধবার এই রায় ঘোষণা করেন।
এদিকে বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বাধীন ভিকারুননিসা স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিশেষ কমিটিও বাতিল ঘোষণা করেছেন আদালত।
আদালত বলেছেন, এই বিশেষ কমিটি দ্রুত ভেঙে দিয়ে অ্যাডহক কমিটি গঠন করতে হবে। একই সাথে ছয় মাসের মধ্যে স্কুল ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচন সম্পন্ন করতে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
রায়ের পর ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ইশরাত জাহান সাংবাদিকদের বলেন, হাইকোর্টের রায়ের ফলে এখন ইচ্ছা করলেই কোনো প্রতিষ্ঠানে পদাধিকার বলে কোনো সংসদ সদস্য সভাপতি হতে পারবেন না। এখন যারা আছেন তারা মেয়াদ শেষ করতে পারবেন। এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হবে বলে জানান তিনি।
বেসরকারি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধানমালা-২০০৯ এর ৫(১) ধারায় বলা হয়েছে, ‘কোনো স্থানীয় নির্বাচিত সংসদ সদস্য তাহার নির্বাচনী এলাকায় অবস্থিত বোর্ড কর্তৃক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত এমন সংখ্যক উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডির সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করিতে পারিবেন যেন উক্ত এলাকায় অবস্থিত এই প্রবিধানমালার আওতাভুক্ত নহে এইরূপ অন্যান্য বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ তাহার এইরূপ দায়িত্ব গ্রহণকৃত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা চার এর অধিক না হয়।’
৫(২) ধারায় বলা হয়েছে, ‘উপ-প্রবিধান (১) এর অধীন সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণের জন্য স্থানীয় নির্বাচিত সংসদ সদস্য তাহার নির্বাচনী এলাকায় অবস্থিত যে সকল উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব গ্রহণ করিতে ইচ্ছুক তাহার উল্লে¬খসহ, লিখিতভাবে এই প্রবিধানমালার অধীন বোর্ডের চেয়ারম্যানের নিকট তাহার অভিপ্রায় ব্যক্ত করিবেন এবং উক্ত অভিপ্রায় পত্রসংশি¬ষ্ট বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা প্রতিষ্ঠানসূমহের সভাপতি হিসাবে তাহার মনোনয়নরূপে গণ্য হইবে।’
আর প্রবিধানমালার ৫০ ধারায় বলা হয়েছে, ‘প্রবিধান ৪, ৭ ও ৪৯ এ যাহা কিছুই থাকুক না কেন , বিশেস পরিস্থিতিতে, বোর্ড এবং সরকারের পূর্বানুমোদনক্রমে, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের কোন বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য বিশেষ ধরনের গভর্নিং বডি বা, ক্ষেত্রমত, ম্যানেজিং কমিটি গঠন করা যাইবে।’
প্রবিধানমালার এই দুটি ধারার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন দায়ের করেন আইনজীবী ড. ইউনূস আলী আকন্দ।
আবেদনে বলা হয়, সংসদ সদস্যের কাজ হচ্ছে আইন প্রণয়ন করা। কিন্তু এর বাইরেও তারা বিনা ভোটে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান পদে আসীন হচ্ছেন। বাকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য পছন্দসই লোকের জন্য ডিও লেটার দেন। এর ফলে এমপির ওইসব লোকজন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি থেকে শুরু করে সব ধরণের বাণিজ্য শুরু করেন।
আবেদনে আরো বলা হয়, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক অধ্যাদেশ, ১৯৬১ এর ৩৯(২) ধারায় আইন তৈরি করার ক্ষমতা বোর্ডকে প্রদান করা হয়েছে। তবে কি ধরনের আইন তৈরি করতে হবে তা ওই ধারায় ৬ষ্ঠ দফায় উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু এই দফায় বিশেষ কমিটি বা সংসদ সদস্যরা গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান হবেন এরূপ কোনো ক্ষমতা বোর্ডকে দেয়া হয়নি। ফলে প্রবিধানমালার ৫ ও ৫০ ধারা উক্ত অধ্যাদেশের সাথে সাংঘর্ষিক। এছাড়া এসব ধারা সংবিধানের প্রস্তাবনা এবং ৭, ২৬, ২৭, ২৮, ৩১, ৫৯, ৬০ ও ৬৫ অনুচ্ছেদের সাথে সাংঘর্ষিক।
এই আবেদনের ওপর প্রাথমিক শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট গত ১৩ এপিল রুল জারি করে। রুলে ৫ ও ৫০ ধারা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়। রুলের ওপর চূড়ান্ত শুনানি শেষে আজ হাইকোর্ট উপরোক্ত রায় দেয়।
আবেদনের পক্ষে আবেদনকারী নিজেই এবং রাষ্ট্রপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ইশরাত জাহান শুনানি করেন।
ইউনূস আলী বলেন, হাইকোর্টের রায়ের ফলে সংসদ সদস্যরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডির সভাপতি পদে থাকতে পারবেন না। তিনি বলেন, আদালত দুটি ধারা সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক উল্লেখ করে বাতিল করেছেন।